ছেলেরা এত বেশি ফেল করছে কেন

নগর থেকে যতই মফস্‌সল ও গ্রামে যাওয়া যাবে, কিছু বিরল–ব্যতিক্রম ছাড়া পরীক্ষার ফলাফল ততই খারাপ হতে থাকবে।ছবি: প্রথম আলো

এবার এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সাধারণ, কারিগরি ও মাদ্রাসা মিলিয়ে গড় পাস করেছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। এর অর্থ, প্রায় ৩৮ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। সব মিলিয়ে ৬ লাখ ৯০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এ বছর ফেল করেছে। আবার ১৮ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ–৩ দশমিক ৫ থেকে আরও কম জিপিএ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২৫ শতাংশ। কম জিপিএ পাওয়া এসব শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনেও ভুগতে হবে।

শিক্ষা–বিশ্লেষকেরা এবারের ফল বিপর্যয়ের পেছনে গণিত ও ইংরেজির দুর্বলতাকে দায়ী করেছেন। এ ছাড়া মানবিক বিভাগের খারাপ ফলাফল সামগ্রিক ফলাফলে ভূমিকা রেখেছে। ফলাফল প্রকাশের দিন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক একটু রূপকের মতো করে বলেন, ‘মন খুলে গান গাওয়া যায়, পরীক্ষার খাতায় নাম্বার দেওয়া যায় না।’ প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন অবশ্য সরাসরি বলেছেন, ‘এবারে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল নির্মোহভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।’

গত কয়েক দিনে ঢাকা, কুষ্টিয়া ও কিশোরগঞ্জের তিনটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বললে তাঁরা চব্বিশের অভ্যুত্থানের পরে শিক্ষার্থীদের চিন্তা ও আচরণে পরিবর্তনের বিষয়টির কথা উল্লেখ করেন। অনেক ছাত্রের মধ্যে একটা ‘থোড়াই কেয়ার’ মনোভাব তৈরি হয়েছে। শিক্ষকদের কথা না শোনা, শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ না দেওয়ার বিষয়টিও বেড়েছে। এ রকম বাস্তবতায় শিক্ষকদের পক্ষে ক্লাস নেওয়া অনেক কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে।

শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা উপদেষ্টার বক্তব্য থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার, আওয়ামী লীগের সময়ে পাসের হার ও জিপিএ-৫–এর যে সুনামি চলছিল, সেখান থেকে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলকে বের করে আনতে চেয়েছে বিএনপি সরকার। এই প্রচেষ্টা অবশ্য শুরু হয়েছিল অন্তর্বর্তী আমলেই। গতবারের পরীক্ষার পর শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরারও নির্মোহভাবে পরীক্ষার ফলাফল মূল্যায়নের কথা বলেছিলেন। সেবারে অবশ্য পাসের হার এবারের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ বেশি ছিল।

বাংলাদেশে শিক্ষা ও কারিকুলাম নিয়ে পরীক্ষার শেষ নেই। একটা সময় পর্যন্ত পুরোটাই লিখিত পরীক্ষা ছিল। সে সময়ে পাসের হার ৩০ থেকে ৪০–এর ঘরে ওঠানামা করত। ১৯৯০-এর দশকে এমসিকিউ চালুর পর পাসের হারে বড় উল্লম্ফন ঘটে। আওয়ামী লীগ আমলে পাসের হার ৮০-এর ঘরে পৌঁছায়, কোনো কোনোবার সেটা ৯০ শতাংশের ঘরও পেরিয়ে যায়।

পাবলিক পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বোর্ড থেকেই হাতখুলে নম্বর দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হতো। সেটার ব্যত্যয় হলে অনেক ক্ষেত্রেই পরীক্ষকদের জবাবদিহি করা লাগত। এই ঝক্কি এড়াতেই শিক্ষকদের হাতখুলে নম্বর দেওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছিল। এ নিয়ে অভিভাবক, শিক্ষাবিদ, শিক্ষক—সবার মধ্যেই ক্ষোভ ছিল। এই বাড়িয়ে দেখানো ফলাফলের বৃত্ত থেকে পাবলিক পরীক্ষাকে বের করে আনা জরুরি। তবে শিক্ষাকে শুধু পাস-ফেলের লেন্স থেকে দেখার বিপদ অনেক।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসএসসি, এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষার খারাপ ফল করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা বাড়ছে। আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, এবারে এসএসসি পরীক্ষার ফল ঘোষণার এক সপ্তাহের মধ্যে ১০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এর মধ্যে ৭ জন ছাত্রী ও ৩ জন ছাত্র।

আরও পড়ুন

পাস-ফেলের লেন্স থেকে শিক্ষাকে দেখা হলে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া হয়, সেটা হলো পরীক্ষায় ফেলের দায় কি শুধুই শিক্ষার্থীদের। সব শিক্ষার্থীর জন্য সরকার কি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করেছে? ফলাফলের দিক একটু তাকানো যাক। ঢাকা মহানগরে পাসের হার ৮৪, চট্টগ্রাম মহানগরে ৭৪। ঢাকার আশপাশের জেলা গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ও নরসিংদীতে পাসের হার ৭২ থেকে ৮৩ পর্যন্ত। অন্যদিকে খাগড়াছড়িতে পাসের হার ৩৫ শতাংশ। জিপিএ-৫-এর ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, সাড়ে পাঁচ ভাগের এক ভাগই এসেছে ঢাকা মহানগর থেকে।

বৈষম্য পরিমাপের মাপকাঠি জিনি সহগ বলছে, চরম বৈষম্যমূলক দেশের একবারে প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। জিডিপি, বাজেট ও প্রবৃদ্ধি যত বড় হচ্ছে বৈষম্যের ব্যবধানটা ততই বড় হচ্ছে। শিক্ষা খাতেও এই অর্থনৈতিক বৈষম্যের ধাক্কাটা তীব্রভাবেই এসে লেগেছে। বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে, এমনকি শিক্ষার বনিয়াদি স্তরেও রাষ্ট্রীয়ভাবেই স্বীকৃত ‘বর্ণপ্রথা’ চালু রয়েছে।

ধনী ও উচ্চমধ্যবিত্তের জন্য ইংলিশ মিডিয়াম, মধ্য–মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নমধ্যবিত্তদের জন্য সাধারণ বিদ্যালয়, নিম্নবিত্তের জন্য মাদ্রাসা। এর বাইরেও সাধারণ শিক্ষার ইংরেজি ভার্সন, ক্যাডেট, ইংরেজি মিডিয়াম মাদ্রাসাসহ আরও কয়েক ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা রয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থায় এই বৈষম্যের কারণে কে কোন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ছে, তার ওপরই অনেকটা তার ভবিষ্যৎ কর্মজীবন লেখা হয়ে যাচ্ছে।

পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার পর কয়েক দিন গণমাধ্যমের পাতা ভরে ওঠে চা-বাগানের শ্রমিক কিংবা দিনমজুরের কোনো সন্তানের ভালো ফলের গল্পে। এসব ঘটনা সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়। কারণ, সেগুলো বিরল, ব্যতিক্রম।

আরও পড়ুন
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এগিয়ে থাকছে।
ছবি : প্রথম আলো

বাস্তবতা হলো, নগর থেকে যতই মফস্‌সল ও গ্রামে যাওয়া যাবে, কিছু বিরল–ব্যতিক্রম ছাড়া পরীক্ষার ফলাফল ততই খারাপ হতে থাকবে। গত কয়েক দশকে শিক্ষাকে ক্লাসরুমের বাইরে বের করে এনে কোচিং, প্রাইভেট টিউশন ও গাইড বই-নির্ভর করে তোলা হয়েছে, তার প্রতিফলনও ফলাফলে ঘটছে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাও এখন অনেক বেশি ব্যয়বহুল। ফলে যেসব অভিভাবক সন্তানদের ভালো স্কুলে, ভালো কোচিংয়ে, ভালো শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়ানোর সামর্থ্য রাখেন না, তাঁদের সন্তানদের পরীক্ষার ফল ভালো করার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

শুধু এবারে নয়, গ্রাম-মফস্‌সলের শিক্ষার্থীরা গণিত, ইংরেজির মতো বিষয়গুলোয় দুর্বল থেকে যাচ্ছে। মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের ঘাটতি বহু বছরের। বাধ্য হয়েই হয়তো হিসাববিজ্ঞান কিংবা বাংলার শিক্ষককে ইংরেজি আর অঙ্ক পড়াতে হয়। আবার যেসব স্কুলে ইংরেজি, অঙ্কের শিক্ষক আছেন, তাঁরাও হয়তো ক্লাসরুমে আগ্রহী, মনোযোগী নন; ব্যাচ পড়াতে, কোচিং করাতে মনোযোগী তাঁরা। ফলে যেসব অভিভাবকের তাঁদের সন্তানদের টাকা দিয়ে পড়ানোর সামর্থ্য নেই, স্বাভাবিকভাবেই তারা পিছিয়ে পড়ছে।

পাবলিক পরীক্ষায় বড় আরেকটি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে ছাত্রদের ফেলের হার। এ বছরে ছেলেদের পাসের হার ৫৭ দশমিক ৮৬। বিপরীতে মেয়েদের পাসের হার ৬৬ দশমিক ৬৮। এর অর্থ হলো, পাসের হারে ছেলেরা মেয়েদের তুলনায় ৮ দশমিক ৮২ শতাংশীয় পয়েন্ট পিছিয়ে। ২০২৫ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হারে মেয়েদের তুলনায় ছেলেরা ৫ দশমিক ১৫ শতাংশীয় পয়েন্টে পিছিয়ে ছিল।

২০২৪ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায়ও মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় ভালো ফল করেছিল। কিন্তু ব্যবধানটা এত বেশি ছিল না। ছেলেদের পাসের হার
৮১ দশমিক ৫৭ ছিল, মেয়েদের পাসের হার ছিল সেখানে ৮৪ দশমিক ৪৭।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এগিয়ে থাকছে। কিন্তু ব্যবধানটা যখন ৫ কিংবা ৮ শতাংশের বেশি হয়ে যায়, তখন বিষয়টা অনেক বেশি উদ্বেগের জন্ম দেয়। গত কয়েক বছরের যে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা–অস্থিরতা, তার প্রভাব পড়েছে পড়াশোনায়।

গত কয়েক দিনে ঢাকা, কুষ্টিয়া ও কিশোরগঞ্জের তিনটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বললে তাঁরা চব্বিশের অভ্যুত্থানের পরে শিক্ষার্থীদের চিন্তা ও আচরণে পরিবর্তনের বিষয়টির কথা উল্লেখ করেন। অনেক ছাত্রের মধ্যে একটা ‘থোড়াই কেয়ার’ মনোভাব তৈরি হয়েছে। শিক্ষকদের কথা না শোনা, শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ না দেওয়ার বিষয়টিও বেড়েছে। এ রকম বাস্তবতায় শিক্ষকদের পক্ষে ক্লাস নেওয়া অনেক কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে সামনে ছেলেদের ফেলের হার আরও বাড়তে পারে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করেন তাঁরা।

আমাদের ছেলেরা কেন এত বেশি ফেল করছে, সেই প্রশ্নের উত্তর কি খোঁজার চেষ্টা করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়? শতাংশের হিসাবে ৫ বা ৮ হলেও সংখ্যাটা কিন্তু বিরাট।

  • মনোজ দে প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী

  • [email protected]