উন্নয়নের দায় শুধু সরকারের নয়, নাগরিকেরও

বাংলাদেশে উন্নয়ন নিয়ে কথা উঠলেই আমরা প্রায় স্বভাবগতভাবে সরকারের দিকে তাকাই। রাস্তা ভাঙা, সরকারের ব্যর্থতা। শহর নোংরা, সিটি করপোরেশনের ব্যর্থতা। ট্রাফিক বিশৃঙ্খলা, পুলিশের ব্যর্থতা। হাসপাতাল অগোছালো, প্রশাসনের ব্যর্থতা। নিশ্চয়ই সরকারের দায়িত্ব আছে এবং সে দায়িত্ব এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।

রাষ্ট্রের সম্পদ, নীতি, আইন, অবকাঠামো, সেবা ও জবাবদিহির প্রধান দায়িত্ব সরকারেরই। কিন্তু একটি দেশ কি শুধু সরকার দিয়ে উন্নত হয়? একটি শহর কি শুধু মেয়রের নির্দেশে পরিষ্কার থাকে?

একটি সমাজ কি শুধু পুলিশের বাঁশি শুনে শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়? উন্নয়ন যদি কেবল সেতু, রাস্তা, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, রপ্তানি আয় বা মাথাপিছু আয়ের হিসাব হতো, তাহলে নাগরিকের চরিত্র নিয়ে কথা বলার দরকার ছিল না। কিন্তু উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত মানুষের আচরণে, সামাজিক অভ্যাসে, দায়িত্ববোধে এবং প্রতিদিনের নৈতিকতায় পরিমাপ হয়।

উন্নত দেশগুলো শুধু ভালো সরকার দিয়ে উন্নত হয়নি; তারা উন্নত হয়েছে কারণ নাগরিকেরা নিজেদেরও রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে দেখেছে। জাপানে স্কুলের শিশুরা নিজেদের শ্রেণিকক্ষ নিজেরাই পরিষ্কার করে। অনেক স্থানে খেলার মাঠ, উৎসব, স্টেডিয়াম, ট্রেন স্টেশন বা জনসমাগমের জায়গায় মানুষ নিজের ব্যবহৃত জায়গা নিজেই পরিষ্কার রাখে।

বিশ্বকাপ ফুটবলে জাপানি দর্শকদের গ্যালারি পরিষ্কার করার ছবি আমরা দেখেছি। কিন্তু এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ‘ভালো মানুষের’ গল্প নয়; এগুলো একটি সামাজিক শিক্ষা। সেখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ নয়, নাগরিক চরিত্রের অংশ। এই জায়গাটিই আমাদের শেখার।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশের শহর, বাজার, বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট, রেলস্টেশন, হাসপাতাল, স্কুল, সরকারি অফিস—সব জায়গায় আমরা নাগরিক আচরণের পরীক্ষা দিই। দুর্ভাগ্য হলো, পরীক্ষার ফল খুব ভালো নয়। বাসস্ট্যান্ডে আমরা লাইনে দাঁড়াতে চাই না। বাসে উঠে নারী, শিশু, বৃদ্ধ বা প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য আসন ছাড়তে অনীহা দেখি।

ট্রেনে টিকিট কেটে ভ্রমণ করা এখনো অনেকের কাছে বোকামি মনে হয়। প্ল্যাটফর্মে ময়লা ফেলি, টয়লেট নোংরা করি, জানালা দিয়ে প্লাস্টিক ছুড়ে দিই, পাবলিক সম্পদকে ব্যক্তিগত অবহেলার জায়গা বানাই। অথচ আমরা যদি নিজেরা একটু শৃঙ্খলা মেনে চলি, সরকারকে ব্যবস্থাপনার পেছনে এত টাকা, জনবল, নজরদারি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ব্যয় করতে হবে না।

সুশাসন চাইলে নাগরিককেও সুশৃঙ্খল হতে হয়। আমরা প্রায়ই বলি, দেশে আইন নেই। আসলে আইন অনেক আছে; আইন মানার সংস্কৃতি দুর্বল। ট্রাফিক সিগন্যাল লাল হলেও রাস্তা ফাঁকা দেখলে আমরা পার হয়ে যাই। পদচারী–সেতু থাকলেও নিচ দিয়ে দৌড়ে রাস্তা পার হই। হাসপাতালের নিয়ম মানি না, স্কুলের নিয়ম মানি না, অফিসের সময় মানি না, পরীক্ষার হলে নকলকে অপরাধের বদলে সুযোগ ভাবি।

আবার রাষ্ট্রের কাছে চাই—দক্ষতা, শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার। প্রশ্ন হলো নাগরিক যদি নিয়মকে সম্মান না করে, তাহলে রাষ্ট্রের নিয়ম কীভাবে শক্তিশালী হবে? আইন শুধু ভয়ের বিষয় নয়; আইন হলো সামাজিক আস্থার ভিত্তি। আমি নিয়ম মানব, কারণ অন্যরাও মানবে—এই বিশ্বাসের ওপর সভ্যতা দাঁড়িয়ে থাকে।

উন্নয়ন হলো রাষ্ট্র ও নাগরিকের যৌথ চুক্তি। সরকার অবকাঠামো দেবে, নাগরিক সেটি রক্ষা করবে। সরকার আইন করবে, নাগরিক তা মানবে। সরকার সেবা দেবে, নাগরিক সেবা নেওয়ার শৃঙ্খলা বজায় রাখবে। সরকার পরিকল্পনা করবে, নাগরিক সহযোগিতা করবে। এই পারস্পরিক দায়িত্ব ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না।

বাংলাদেশের উন্নয়নের আরেকটি শর্ত হলো সামাজিক সম্মানবোধ। আমরা যেন দ্রুত একধরনের রূঢ় সমাজে পরিণত হচ্ছি। বাসে, রাস্তায়, দোকানে, সরকারি অফিসে, অনলাইনে—ভাষার ভদ্রতা কমছে। ছোটকে অপমান, বড়কে অবজ্ঞা, নারীকে তুচ্ছ করা, ভিন্নমতকে গালি দেওয়া, শ্রমজীবী মানুষকে অসম্মান করা—এসব আমাদের সামাজিক পুঁজিকে নষ্ট করছে। একটি সমাজে অর্থনৈতিক পুঁজি যেমন দরকার, তেমনি দরকার সামাজিক পুঁজি—বিশ্বাস, শালীনতা, পারস্পরিক সম্মান, সহনশীলতা ও সহযোগিতা।

উন্নয়নকে নাগরিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত করতে হলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন দরকার। শুধু নম্বর, চাকরি, বিদেশযাত্রা বা পেশাগত সাফল্য দিয়ে শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না। স্কুলে শিশুদের শেখাতে হবে, নিজের ডেস্ক নিজে পরিষ্কার করা, পানির অপচয় না করা, ময়লা ডাস্টবিনে ফেলা, লাইনে দাঁড়ানো, গণপরিবহনে শালীন আচরণ করা, বয়স্কদের সাহায্য করা, মিথ্যা না বলা, সরকারি সম্পদ নষ্ট না করা।

বিশ্ববিদ্যালয়েও নাগরিক শিক্ষা থাকা দরকার। আমরা ডিগ্রিধারী মানুষ তৈরি করছি, কিন্তু নাগরিক তৈরি করছি কি? একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ যদি রাস্তার মাঝখানে গাড়ি পার্ক করেন, দুর্বলকে অপমান করেন, ঘুষ দিয়ে কাজ করাকে বুদ্ধিমত্তা ভাবেন, তাহলে তাঁর শিক্ষা সমাজকে উন্নত করে না; বরং উন্নয়নের মুখোশ তৈরি করে।

সরকারি কাজ সম্পন্ন করতে নাগরিক সহযোগিতা অপরিহার্য। রাস্তা মেরামত, ড্রেন পরিষ্কার, টিকাদান কর্মসূচি, বৃক্ষরোপণ, বন্যা মোকাবিলা, স্কুল উন্নয়ন, বাজার ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, পাড়া-মহল্লার নিরাপত্তা—এসব কাজে জনগণ সহযোগিতা না করলে প্রশাসনের কাজ বহুগুণ কঠিন হয়। আমরা অনেক সময় সরকারি প্রকল্পকে নিজের চোখের সামনে ব্যর্থ হতে দিই। কারণ, ভাবি, ‘এটা আমার কাজ নয়।’ রাষ্ট্রের সম্পদ আসলে জনগণের সম্পদ—এই সহজ কথাটি আমরা যত দিন হৃদয়ে নেব না, তত দিন উন্নয়ন ভঙ্গুর থাকবে।

আরও পড়ুন

নাগরিক দায়িত্ব মানে শুধু বড় কাজ নয়; ছোট কাজের ধারাবাহিকতা। যেমন রাস্তায় থুতু না ফেলা, যেখানে-সেখানে প্রস্রাব না করা, প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো, শব্দদূষণ না করা, মসজিদ-মন্দির-স্কুল-হাসপাতালের আশপাশে শৃঙ্খলা রাখা, যানবাহনে ভাড়া নিয়ে অযথা ঝগড়া না করা, অনলাইনে মিথ্যা তথ্য না ছড়ানো, ভোটের সময় অর্থ বা পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বিবেকের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া। উন্নত নাগরিকত্বের শুরু এখানেই। যে মানুষ নিজের আশপাশের দশ হাত জায়গা পরিষ্কার রাখে না, সে দেশের উন্নয়ন নিয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা দিলে তা কেমন শোনায়।

এখানে অবশ্য সতর্কতা দরকার। নাগরিক দায়িত্বের কথা বলার অর্থ সরকারের ব্যর্থতা ঢেকে দেওয়া নয়। সরকারকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে, দুর্নীতি কমাতে হবে, সেবা দিতে হবে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে, শিক্ষার মান বাড়াতে হবে, স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করতে হবে। কিন্তু নাগরিকেরা যদি নিজেদের দায়িত্ব পুরোপুরি অস্বীকার করে শুধু সরকারকে দোষ দেয়, তাহলে উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থাকবে।

উন্নয়ন হলো রাষ্ট্র ও নাগরিকের যৌথ চুক্তি। সরকার অবকাঠামো দেবে, নাগরিক সেটি রক্ষা করবে। সরকার আইন করবে, নাগরিক তা মানবে। সরকার সেবা দেবে, নাগরিক সেবা নেওয়ার শৃঙ্খলা বজায় রাখবে। সরকার পরিকল্পনা করবে, নাগরিক সহযোগিতা করবে। এই পারস্পরিক দায়িত্ব ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না।

বাংলাদেশের সামনে বড় সম্ভাবনা আছে। আমাদের তরুণ জনসংখ্যা আছে, প্রবাসী শক্তি আছে, উদ্যোক্তা আছে, কৃষকের শ্রম আছে, নারীর অগ্রযাত্রা আছে, প্রযুক্তির বিস্তার আছে, সাংস্কৃতিক শক্তি আছে। কিন্তু সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে আমাদের নাগরিক চরিত্রও উন্নত হতে হবে।

আমরা যদি শুধু আয় বাড়াই কিন্তু আচরণ না বদলাই, তাহলে উন্নয়ন হবে অসম্পূর্ণ। আমরা যদি শুধু শহর বড় করি কিন্তু নাগরিক বোধ না বাড়াই, তাহলে শহর হবে কংক্রিটের বিশৃঙ্খলা। আমরা যদি শুধু সেতু বানাই কিন্তু মানুষকে সংযুক্ত করতে না পারি, তাহলে উন্নয়ন হবে বাহ্যিক।

দরকার এক নতুন নাগরিক অঙ্গীকার: দেশ আমার, রাস্তা আমার, নদী আমার, স্কুল আমার, হাসপাতাল আমার, পার্ক আমার, আইন আমার, ভবিষ্যৎ আমার। তাই এগুলো রক্ষা করাও আমার দায়িত্ব। বাংলাদেশকে উন্নত করতে সরকারকে বদলাতে হবে—সেটি সত্য। কিন্তু নাগরিককেও বদলাতে হবে, এটিও সমান সত্য।

  • ড. এ কে এম আহসান উল্লাহ অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক, নিরাপত্তা এবং অভিবাসন। ইউনিভার্সিটি অব ব্রুনেই দারুসসালাম, ব্রুনেই

  • [email protected]

  • মতামত লেখকের নিজস্ব