আরব দেশগুলো নিরাপত্তার নামে যেভাবে প্রতারিত হলো

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মোহাম্মদ বিন সালমান।ফাইল ছবি

নব্বইয়ের দশক ও ২০০০ সালের শুরুতে কাতারের রাজধানী দোহায় বড় হয়ে ওঠার সময় একটি দৃশ্য বারবার চোখে পড়ত। সেটি হলো, আমেরিকান সেনাদের উপস্থিতি। শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার মধ্যে তারা যেন একধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি করত। কাতার সব সময়ই নানা দেশের মানুষের মিশ্রণে গড়ে ওঠা একটি সমাজ ছিল, যেখানে মানুষ আসত, যেত, আর ধীরে ধীরে পরিবেশের সঙ্গে মিশে যেত। কিন্তু আমেরিকান সেনারা কখনো সেভাবে মিশে যেতে পারেনি। 

মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি ছিল স্পষ্ট, আলাদা করে চোখে পড়ার মতো। শপিং মল, সুপারমার্কেট—সব জায়গায় তাদের দেখা যেত। কুঁচকে থাকা শার্টের হাতা গুটিয়ে রাখা, হাতে বড় ট্যাটু, মাথায় টুপি আর তার ওপর রাখা সানগ্লাস—এই চেহারা যেন তাদের একধরনের আলাদা পরিচয় বহন করত। 

শৈশবে এই দৃশ্যের অর্থ পুরোপুরি বোঝা যায়নি। ঠিক কখন প্রথম বুঝলাম আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি কী বা তাদের ভূমিকা কী—তা মনে নেই। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই মনে হতো, এদের উপস্থিতি যেন স্বাভাবিক কিছু নয়, বরং কিছুটা অভিনয়ের মতো। তারা জনসমাগমে এমনভাবে চলাফেরা করত, যেন সেই জায়গার ওপর তাদের একধরনের অধিকার আছে।

পরে বুঝতে পারি, এটি কোনো আকস্মিক বিষয় নয়। এটি ছিল একটি বৃহত্তর বিশ্বাসব্যবস্থার অংশ—যেখানে ধারণা ছিল, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা হয়েছে বাইরের শক্তির মাধ্যমে। 

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত উপসাগরীয় অঞ্চলের বিশেষত্ব বা ব্যতিক্রমধর্মী অবস্থানকে এমনভাবে দেখা হতো, যেন এই অঞ্চল যুদ্ধ, অস্থিরতা বা অভ্যন্তরীণ সংঘাত থেকে স্বাভাবিকভাবেই সুরক্ষিত। আশপাশের দেশগুলো যখন সংকটে জর্জরিত, তখন উপসাগরীয় দেশগুলো যেন তার বাইরে।

আরও পড়ুন

উপসাগরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা আমেরিকান সামরিক ঘাঁটিগুলো আরবদের নিরাপত্তাবোধকে জোরদার করেছিল। এতে একধরনের বিশ্বাস তৈরি হয়েছিল—কোনো প্রতিপক্ষ এখানে আক্রমণ করার আগে বহুবার ভাববে। কিন্তু আজ সেই ধারণা ভেঙে পড়েছে। বাস্তবতা হলো, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন এমন এক যুদ্ধে ক্ষতির শিকার, যা তারা এড়াতে চেয়েছিল।

এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে এক কঠিন সত্য। এখন বোঝা যাচ্ছে—কোনো আমেরিকান বা পশ্চিমা নেতা তাদের রক্ষা করতে এগিয়ে আসবেন না। অথচ এই নেতারাই একসময় উপসাগরে এসে অভূতপূর্ব আতিথেয়তা পেয়েছেন, আর উপসাগরীয় দেশগুলো বছরের পর বছর ওয়াশিংটনের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে বিনিয়োগ করেছেন। 

উপসাগরীয় সরকারগুলো অভিযোগ করেছে, ওয়াশিংটন তাদের আগে থেকে সতর্ক করেনি। যদি সময়মতো সতর্কতা দেওয়া হতো, তাহলে তারা নিজেদের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি নিতে পারত। যুদ্ধ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমেরিকান সামরিক ও কূটনৈতিক কর্মীরা অঞ্চল ছেড়ে চলে যেতে শুরু করেন। আর তখনই উপসাগরীয় দেশগুলো পড়ে যায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে। এই পরিস্থিতি জোটের অসমতা স্পষ্ট করে দিয়েছে।

আজ সেই পশ্চিমা নীরবতা চোখে পড়ার মতো। যারা আগে থেকেই এই জোটের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দিহান ছিল, তাদের কাছে এই মুহূর্ত একটি সত্যকে স্পষ্ট করেছে। তা হলো ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা মানেই নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়।

এই প্রেক্ষাপটে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ব্যবসায়িক মানসিকতার, স্পষ্ট লেনদেনভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী এই নেতাকে উপসাগরে যে জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিল, তা ছিল নজরকাড়া। কিন্তু সেই সম্পর্কের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পায় ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখে যখন আমেরিকা ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালায়। 

উপসাগরীয় সরকারগুলো অভিযোগ করেছে, ওয়াশিংটন তাদের আগে থেকে সতর্ক করেনি। যদি সময়মতো সতর্কতা দেওয়া হতো, তাহলে তারা নিজেদের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি নিতে পারত। যুদ্ধ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমেরিকান সামরিক ও কূটনৈতিক কর্মীরা অঞ্চল ছেড়ে চলে যেতে শুরু করেন। আর তখনই উপসাগরীয় দেশগুলো পড়ে যায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে। এই পরিস্থিতি জোটের অসমতা স্পষ্ট করে দিয়েছে। এক পক্ষ এই সম্পর্ককে ব্যবহার করে নিজেদের প্রভাব বাড়ায়। অন্য পক্ষ তার জন্য বিশাল মূল্য দেয়। 

আরও পড়ুন

এখন উপসাগরীয় সমাজে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে সমালোচনা। কাতারের শিক্ষাবিদ নাইয়েফ বিন নাহার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ট্রাম্প উপসাগরীয় দেশগুলোকে ‘নিজেদের ভাগ্যের মুখে ফেলে রেখেছেন।’

তাঁর মতে, ট্রাম্পের চোখে এই সমাজগুলোর মূল্য ‘এক ব্যারেল তেলের চেয়েও কম।’ এই মন্তব্য নতুন কোনো সত্য উদ্‌ঘাটন করে না, বরং দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত সমস্যাকে সামনে আনে। এখানে মানুষের জীবনযাপন, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা চাপা পড়ে গেছে তেল, অর্থনীতি ও কৌশলগত অবস্থানের আলোচনায়। 

এই সমস্যাকে মোকাবিলা করতে উপসাগরীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে সফট পাওয়ারে বিনিয়োগ করেছে। পশ্চিমা দুনিয়ায় নিজেদের নতুনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে, যাতে তেলসমৃদ্ধ মরুভূমি বা সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত প্রথাগত ভাষ্য ভেঙে দেওয়া যায়। তারা দেখাতে চেয়েছে, এই অঞ্চলের সমাজগুলো কতটা বৈচিত্র্যময় ও প্রাণবন্ত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে, এই প্রচেষ্টারও সীমা আছে। 

ইরানের মতো ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের তুলনায় উপসাগরের পরিস্থিতি কম গুরুতর হলেও, এখানকার মানুষের কষ্টও বাস্তব। কিন্তু সেই কষ্ট আন্তর্জাতিক সহানুভূতি পায় না। কোনো যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে উপসাগরের পতাকা দেখা যায় না, কিংবা তাদের রক্ষার জন্য কোনো জোরালো দাবি ওঠে না। বরং তারা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও সমালোচনার বিষয়। 

বামপন্থী কিছু মহল সামাজিক মাধ্যমে ইরানের চালানো হামলার দৃশ্য দেখে আনন্দ প্রকাশ করেছে। তারা উপসাগরীয় দেশগুলোকে আমেরিকার ‘অনুগত রাষ্ট্র’ বলে উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে ডানপন্থীরা ভিন্ন ধরনের সমালোচনা করেছে। তারা বলেছে, উপসাগরীয় দেশগুলো শুধু প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থেকে ভুল করছে।

সব মিলিয়ে ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখের পরের ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিয়েছে, উপসাগরের নিরাপত্তা নিয়ে যে বিশেষত্বের ধারণা ছিল, তা আসলে ভঙ্গুর এক মায়া। আরবদের বুঝতে হবে, আসলে বাইরের সুরক্ষার মিথ ভেঙে গেছে। 

হিন্দ আল আনসারি জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমসাময়িক আরব অধ্যয়ন কেন্দ্রের ভিজিটিং গবেষক এবং গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের ফেলো

মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত