পারমাণবিক ভবিষ্যৎ: এসএমআর না বড় রিঅ্যাক্টর

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পফাইল ছবি

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ যখন শেষ পর্যায়ে, তখন নীতিনির্ধারকদের মধ্যে একটি নতুন আলোচনা জোরালো হচ্ছে—রূপপুর ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিট হিসেবে অথবা দেশের অন্য কোনো স্থানে স্মল মডিউলার রিঅ্যাক্টর (এসএমআর) স্থাপনের সম্ভাবনা। বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা–২০১৬ অনুযায়ী জ্বালানি নিরাপত্তা টেকসই করতে ভবিষ্যতে আরও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। 

বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট হলেও প্রকৃত বিদ্যুৎ উৎপাদনসক্ষমতা ১৫ হাজার থেকে ১৭ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। ভূরাজনৈতিক কারণ, জ্বালানি অনুসন্ধানে জাতীয় সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ও বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভের টানাপোড়েনের কারণে আমদানিনির্ভর জ্বালানির পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে বিদ্যুতের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে এসএমআর কি আদৌ এই মুহূর্তের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত? 

এসএমআর হলো সর্বোচ্চ ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ছোট আকারের পারমাণবিক চুল্লি। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের ১৮টি দেশে মোট ৭২টি বিভিন্ন মডেলের এসএমআর ডিজাইন তৈরি হয়েছে। এসএমআর শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকে না, হাইড্রোজেন জ্বালানি উৎপাদন ও সমুদ্রের লোনাপানি বিশুদ্ধকরণেও ব্যবহার করা যাবে। বড় চুল্লির তুলনায় এসএমআর অনেক বেশি নিরাপদ ও দুর্ঘটনার আশঙ্কা অনেক কম। ফলে দ্বীপ, উপকূল ও ডেটা সেন্টারের মতো বিভিন্ন স্থানে ভাসমান কিংবা স্থলভিত্তিকভাবে এসএমআর স্থাপন করা যাবে।

বাংলাদেশের জ্বালানি–সংকটের মূলে রয়েছে তিনটি সমস্যা। তেল, তরলীকৃত গ্যাস ও কয়লার ওপর বর্তমানে ৬২.৫ শতাংশ জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা এবং ভবিষ্যতে আরও অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হওয়ার আশঙ্কা।

দ্বিতীয়ত, বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি—বর্তমানে ভারত থেকে ২ হাজার ৬৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে, যা মোট উৎপাদনক্ষমতার প্রায় ১১ শতাংশ। তৃতীয়ত, নবায়নযোগ্য শক্তির সীমাবদ্ধতা—সৌরশক্তি জাতীয় গ্রিডে মাত্র ২.৩ শতাংশ অবদান রাখছে এবং ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে বড় আকারের সৌর প্রকল্পের জন্য জমির তীব্র সংকট রয়েছে। তা ছাড়া নবায়নযোগ্য শক্তির অনিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনকে অস্থিতিশীল করে তোলে।

দেশের বিশাল বিদ্যুৎ চাহিদা, বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা এবং অর্থনীতির স্কেল বিবেচনায় রূপপুর ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিট হিসেবে বড় আকারের রিঅ্যাক্টর স্থাপন করাই যুক্তিযুক্ত হবে।

এই বাস্তবতায় এসএমআর একটি আকর্ষণীয় বিকল্প। এসএমআর কারখানায় তৈরি করে সরাসরি স্থানে বসানো যায়, ফলে নির্মাণ সময় (৩ থেকে ৫ বছর) ও প্রাথমিক বিনিয়োগ উভয়ই বড় আকারের চুল্লির তুলনায় কম। এটি সপ্তাহের সাত দিন চব্বিশ ঘণ্টা নির্ভরযোগ্য বেসলোড বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে, যা সৌর বা বায়ুশক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়াম ব্যবহারের কারণে এটি কার্বন নির্গমন শূন্যের কাছাকাছি রাখে এবং প্রতি ১০ থেকে ২০ বছরে মাত্র একবার জ্বালানি পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়, ফলে জীবাশ্ম জ্বালানির মতো প্রতিনিয়ত আমদানির ঝামেলা নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি ও কলোরাডো স্কুল অব মাইনসের একটি যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, প্রযুক্তিগত দিক থেকে ১ থেকে ৫০ মেগাওয়াটের রিঅ্যাক্টর উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিদ্যুৎবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭১ শতাংশকে সেবা দিতে পারবে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে সর্বোচ্চ ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম মাইক্রো- মডিউলার রিঅ্যাক্টরগুলো বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ডিজাইন পর্যায়ে রয়েছে। এটি এসএমআরের তুলনায় আরও ছোট আকারের রিঅ্যাক্টর।

তবে এত সম্ভাবনার পরেও রূপপুর ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিট অথবা দেশের অন্য কোনো স্থানে এখনই এসএমআর স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া বেশ কয়েকটি কারণে ঝুঁকিপূর্ণ।

প্রথমত, অভিজ্ঞতার সংকট। রূপপুর ১ ও ২ আমাদের প্রথম দুটি পারমাণবিক চুল্লি, যা এখনো চালু হয়নি। একটি পারমাণবিক প্রকল্প পরিচালনার যে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা, দক্ষ জনবল ও ব্যবস্থাপনাগত পরিপক্বতা দরকার, তা এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। আইএইএর মতে, এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা অর্জনে কমপক্ষে এক প্রজন্মের প্রচেষ্টা লাগে।

দ্বিতীয়ত, দুর্বল নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থা গঠিত হলেও এসএমআরের মতো নতুন প্রযুক্তির জন্য আলাদা লাইসেন্সিং কাঠামো, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং স্বাধীনভাবে পরিদর্শনের সক্ষমতা এখনো তৈরি হয়নি। একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা ছাড়া পারমাণবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

তৃতীয়ত, প্রযুক্তির অপরিপক্বতা। বিশ্বে বর্তমানে ৭২টির বেশি বিভিন্ন ধরনের এসএমআর মডেল তৈরি হলেও বাণিজ্যিকভাবে চালু রয়েছে কেবল রাশিয়া ও চীনে ২টি এবং নির্মাণাধীন রয়েছে রাশিয়া, চীন ও আর্জেন্টিনাসহ মোট ৪টি চুল্লি। বেশির ভাগ মডেল এখনো নকশা বা অনুমোদনের পর্যায়ে রয়েছে। 

চতুর্থত, সরবরাহশৃঙ্খল ও বিক্রেতা নির্বাচনের জটিলতা। কোন দেশের কোন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এসএমআর কেনা হবে? জ্বালানি সরবরাহ কীভাবে নিশ্চিত হবে? তেজস্ক্রিয় বর্জ্য কোথায় যাবে? এসব প্রশ্নের কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর এখন পাওয়া দুষ্কর। পারমাণবিক প্রযুক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের আয়ুষ্কাল দীর্ঘমেয়াদি হয় এবং একক দেশের ওপর প্রযুক্তিগত সহায়তা, ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি সরবরাহের নির্ভরশীলতা ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে, বিশেষত বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে। 

আইএইএর মাইলস্টোন–পদ্ধতি অনুযায়ী একটি নতুন পারমাণবিক কর্মসূচি পরিপক্ব হতে কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ বছর সময় লাগে। বাংলাদেশের উচিত রূপপুর ১ ও ২ নম্বর ইউনিট সফলভাবে চালু করা এবং কমপক্ষে ৩ থেকে ৫ বছর পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করা। একই সঙ্গে পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে শক্তিশালী করা এবং দক্ষ পারমাণবিক প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীদের পরবর্তী প্রজন্ম তৈরি করা।

দেশের বিশাল বিদ্যুৎ চাহিদা, বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা এবং অর্থনীতির স্কেল বিবেচনায় রূপপুর ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিট হিসেবে বড় আকারের রিঅ্যাক্টর স্থাপন করাই যুক্তিযুক্ত হবে। 

ড. মো. শফিকুল ইসলাম অধ্যাপক, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক ভিজিটিং প্রফেসর, নিউক্লিয়ার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, এমআইটি, যুক্তরাষ্ট্র 

[email protected]