ট্রাম্প যতই চাক ভেনেজুয়েলা কখনো পানামা হবে না

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোরয়টার্স ফাইল ছবি

আমেরিকার কোনো প্রেসিডেন্ট শেষবার যখন লাতিনের কোনো শক্তিশালী শাসককে ধরে আনার জন্য সেনা পাঠিয়েছিলেন, তখন আমি ছিলাম এক তরুণ সাংবাদিক। পৃথিবীর আরেক প্রান্তে বসে বড়সড় একটি টেলিভিশনে ‘অপারেশন জাস্ট কজ’-এর ঝাপসা দৃশ্য দেখছিলাম।

১৯৮৯ সালে পানামায় যুক্তরাষ্ট্রের সেই হামলার ফল ছিল প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নরিয়েগার গ্রেপ্তার ও পরে মাদক পাচারের মামলায় বিচার। ওয়াশিংটনে এ অভিযানকে আজও ‘আদর্শ হস্তক্ষেপ’ হিসেবে দেখা হয়।

এ কারণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলায় কথিত বড় পরিসরের হামলার পরিকল্পনাকারীরা পানামার সঙ্গে তুলনা টানছেন। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। উপস্থাপনাটাও প্রায় একই রকম। একজন দুর্নীতিগ্রস্ত মাদকনির্ভর স্বৈরশাসক, একটি নিখুঁত সামরিক অভিযান এবং তাঁকে ধরে এনে আমেরিকার আদালতের মুখোমুখি করা।

শনিবার সকালে কারাকাসের আকাশে যখন ধোঁয়া উড়ছে এবং ভেনেজুয়েলার মানুষ অন্ধকার রাস্তায় দৌড়াচ্ছে, ট্রাম্প সেটিকে বলেছেন এক চমৎকার অভিযান। তিনি গর্ব করে বলেন, দুর্দান্ত সেনাদের মাধ্যমে এই সাফল্য এসেছে। তাঁর ঘোষণায় বলা হয়, নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে দেশ থেকে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
কিন্তু ভেনেজুয়েলা পানামা নয়। আর ট্রাম্প প্রশাসন যদি ভাবে—তারা অপারেশন জাস্ট কজের সাফল্য সহজে অনুকরণ করতে পারবে, তাহলে তাদের সামনে কঠিন বাস্তবতা অপেক্ষা করছে।

আরও পড়ুন

সবচেয়ে স্পষ্ট পার্থক্যটি শুরুতেই সামনে আসছে। তা হলো ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি। জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ যখন পানামায় হামলার নির্দেশ দেন, তখন সেখানে ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ১০ হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন ছিল।

দক্ষিণ কমান্ডের সদর দপ্তর ছিল পানামার মাটিতেই। ক্যারিবিয়ান সাগর পেরিয়ে শক্তি প্রদর্শনের দরকার পড়েনি। তারা আগেই সেখানে প্রস্তুত ছিল সরকার পরিবর্তন নিশ্চিত করতে এবং গিলার্মো এন্দারাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বসাতে। তারা পানামা ডিফেন্স ফোর্সকে পুরোপুরি ভেঙে দিতে পেরেছিল।

তবে ভেনেজুয়েলা একেবারেই ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড কিংবা ইও জিমা অ্যামফিবিয়াস রেডি গ্রুপ নিঃসন্দেহে শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ, কিন্তু সেগুলো ভেনেজুয়েলার উপকূলের বাইরে ভাসছে, দেশের ভেতরে নয়। হঠাৎ আঘাত করে কাউকে ধরে আনার মতো অভিযান একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে সরাতে পারে। কিন্তু শুধু এটুকু দিয়ে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ মানুষের একটি দেশ শাসন করা যায় না।

আমি বহু বছর ইরাক যুদ্ধে সংবাদ সংগ্রহ করে বুঝেছি, একজন স্বৈরশাসককে সরানোই সবচেয়ে সহজ কাজ। কঠিন কাজটি শুরু হয় তার পরে। আর সেই কাজই ঠিক করে দেয় কোনো হস্তক্ষেপ সফল হবে, না ব্যর্থ হবে।

আরও বড় প্রশ্ন হচ্ছে, মাদুরোর জায়গায় আসবে কে? পানামা ছিল ছোট্ট একটি দেশ, যা প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে ছিল। ভেনেজুয়েলার নিজস্ব ও জটিল রাজনৈতিক পরিবেশ আছে, যেখানে শক্তিশালী শাসক সরে গেলেই সবকিছু স্বাভাবিকভাবে বিরোধীদের হাতে চলে যায় না। বলিভারিয়ান সশস্ত্র বাহিনী, যাকে ফ্যানবি বলা হয়, এখনো অক্ষত রয়েছে।

এই ফ্যানবি পানামা ডিফেন্স ফোর্সের মতো নয়। চাভেজ ও মাদুরো—দুজনের আমলেই একে পরিকল্পিতভাবে এমনভাবে পুনর্গঠন করা হয়েছে, যেন অভ্যুত্থানের ঝুঁকি কমে। কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা খণ্ডিত করা হয়েছে, রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে ভেতরে-ভেতরে প্রতিযোগিতা উসকে দেওয়া হয়েছে। যারা ক্ষমতাসীন ব্যবস্থার জন্য হুমকি হতে পারে বলে মনে হয়েছে, তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বেসামরিক কর্তৃপক্ষ ও সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের সম্পর্ক আরও শক্ত হয়েছে অবৈধ অর্থনীতির মুনাফার মাধ্যমে, যা দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তা ও জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাদের সমানভাবে লাভবান করেছে।

আরও পড়ুন

এমন চিত্র আমরা আগেও দেখেছি। ২০১৯ সালে ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলায় হুয়ান গুইদোকে জোরালোভাবে সমর্থন দিয়েছিল এই আশায় যে যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান দেখলে শাসকগোষ্ঠীর ভেতরে ফাটল ধরবে, কিন্তু তা হয়নি। সেনাবাহিনী এককাট্টা ছিল। শনিবারের অভিযানে এমন কিছু ঘটেনি, যা এই বাস্তবতা বদলে দিতে পারে। এখানে তেলের বিষয়টিও আছে।

পানামার ছিল খাল, আর ভেনেজুয়েলার আছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেলভান্ডার। ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে অভিযোগ—তারা এই সম্পদ দখল করতে চায়। অভিযোগটি সত্য হোক বা না হোক, এই কথা সহজেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে।

এর মানে এই নয় যে মাদুরোর ক্ষমতায় থাকা উচিত ছিল। প্রায় নিশ্চিতভাবেই তিনি ২০২৪ সালের জুলাইয়ের নির্বাচনে জয়ী হননি, আর তাঁর সরকারের মানবাধিকার পরিস্থিতি ভয়াবহ। প্রশ্নটি তিনি বৈধ নেতা ছিলেন কি না, তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, এই অভিযান ভেনেজুয়েলার মানুষের জন্য সত্যিই ভালো কোনো ফল বয়ে আনবে, নাকি শুধু আরও বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে?

আমি বহু বছর ইরাক যুদ্ধে সংবাদ সংগ্রহ করে বুঝেছি, একজন স্বৈরশাসককে সরানোই সবচেয়ে সহজ কাজ। কঠিন কাজটি শুরু হয় তার পরে। আর সেই কাজই ঠিক করে দেয় কোনো হস্তক্ষেপ সফল হবে, না ব্যর্থ হবে।

  • ববি ঘোষ টাইম ম্যাগাজিনের সাবেক আন্তর্জাতিক সম্পাদক ও ভূরাজনীতি বিশ্লেষক
    টাইম থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত