গত দেড় দশকে বাংলাদেশে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে নানা সফটওয়্যার, তথ্যভান্ডার, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ডিজিটাল সেবা। কিন্তু এসব উদ্যোগের অধিকাংশই গড়ে উঠেছে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে।
ডিজিটালাইজেশন মানে একের পর এক অ্যাপ্লিকেশন, ওয়েবসাইট বা সফটওয়্যার তৈরি করা নয়। একটি প্রকল্প শেষ হওয়ার পর যদি তার তথ্য অন্য প্রকল্পের সঙ্গে বিনিময় করা না যায়, নতুন ব্যবস্থা আগের বিনিয়োগের ওপর দাঁড়াতে না পারে এবং প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে ব্যবস্থাটিও কার্যকারিতা হারায়, তাহলে সেটিকে টেকসই ডিজিটাল রূপান্তর বলা যায় না। সরকারি অর্থে একই ধরনের কাজের জন্য বারবার নতুন ব্যবস্থা তৈরি করা শুধু অর্থের অপচয় নয়; এটি একটি কার্যকর ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে ওঠার পথেও বড় বাধা।
বাংলাদেশ ডিজিটাল স্বাস্থ্যকৌশল ২০২৩-২৭ এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসার একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপরেখা দিয়েছে। এতে ডিজিটাল অবকাঠামো, ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড, টেলিহেলথ, ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিচয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মানবসম্পদের দক্ষতা, তথ্যের গোপনীয়তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং জাতীয় স্বাস্থ্য তথ্য বিনিময়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কৌশলপত্রের একটি মৌলিক দুর্বলতা হলো, ‘কী করা হবে’ তার বিস্তারিত রূপরেখা থাকলেও ‘কে নেতৃত্ব দেবে, কে সমন্বয় করবে এবং কে জবাবদিহি নিশ্চিত করবে’, এই গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর নেই।
পাকিস্তানের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাও এ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। ডিজিটাল নেশন পাকিস্তান আইন, ২০২৫-এর অধীনে দেশটি পাকিস্তান ডিজিটাল অথরিটি (পিডিএ) প্রতিষ্ঠা করেছে। এটি দেশের ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ও আইনগতভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হিসেবে কাজ করছে।
পিডিএর প্রধান দায়িত্ব তিনটি ক্ষেত্রে বিস্তৃত—প্রথমত, তথ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় তথ্য সুরক্ষা আইন ও গোপনীয়তার মানদণ্ড বাস্তবায়ন ও প্রয়োগ করা; দ্বিতীয়ত, নাগরিক সেবা ও অভিজ্ঞতা কার্যালয় হিসেবে সরকারি ডিজিটাল সেবাকে নাগরিককেন্দ্রিক, সহজপ্রাপ্য, ব্যবহারবান্ধব ও দক্ষ করে তোলা; এবং তৃতীয়ত, ডিজিটাল রূপান্তর কর্তৃপক্ষ হিসেবে প্রযুক্তির মাধ্যমে সরকারি কার্যক্রম, অর্থনীতি ও সমাজের উদ্ভাবন, আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল রূপান্তরকে এগিয়ে নেওয়া।
এর পাশাপাশি জাতীয় ডিজিটাল মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন, তথ্য ব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন ডিজিটাল ব্যবস্থার আন্তসংযোগ, অভিন্ন মানদণ্ড নির্ধারণ এবং সরকারি ডিজিটাল উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয় সাধনও পিডিএর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অর্থাৎ, ডিজিটাল রূপান্তরকে বিচ্ছিন্ন মন্ত্রণালয় বা প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল না রেখে একটি কেন্দ্রীয়, সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অধীনে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতের ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য এ ধরনের একটি শক্তিশালী জাতীয় কাঠামো বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে।
ডিজিটাল স্বাস্থ্য কোনো পাঁচ বছরের প্রকল্প নয়; এটি ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যব্যবস্থার মেরুদণ্ড। তাই এর জন্য প্রকল্পভিত্তিক চিন্তা থেকে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক চিন্তায় যেতে হবে। সরকারের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে।
এখানেই অন্য দেশের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিতে পারে। ভারতে ২০২১ সালে ‘আয়ুষ্মান ভারত ডিজিটাল মিশন’ চালু করা হয়। এর বাস্তবায়নে জাতীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ভারতের উদ্যোগের বিশেষত্ব হলো, সরকার দেশের প্রতিটি হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্রকে একটি নির্দিষ্ট সফটওয়্যার ব্যবহারে বাধ্য করার পথে যায়নি। বরং একটি অভিন্ন ডিজিটাল অবকাঠামো, তথ্যের মানদণ্ড এবং আন্তসংযোগের কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিচয়, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের নিবন্ধন এবং সম্মতিভিত্তিক স্বাস্থ্যতথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে একটি সমন্বিত ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশের জন্য ভারতের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো: প্রথমে অভিন্ন কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব; পরে প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ও অ্যাপ্লিকেশন।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা খুব স্পষ্ট। ডিজিটাল স্বাস্থ্যকে শুধু হাসপাতালকে অনলাইনে আনা বা একটি নতুন অ্যাপ তৈরির বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একই সঙ্গে তথ্য ব্যবস্থাপনা, নাগরিকের তথ্যের অধিকার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সাইবার নিরাপত্তা, অভিন্ন মানদণ্ড, আন্তসংযোগ এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য বিনিময়ের বিষয়। তাই ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যার কাজ হবে শুধু সফটওয়্যার তৈরি করা নয়; বরং পুরো ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্থপতি, নিয়ন্ত্রক ও সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করা।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় তাই একটি স্বতন্ত্র জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি এখন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। এটি কোনো প্রকল্প বা ছোট তথ্যপ্রযুক্তি ইউনিট হওয়া উচিত নয়। আইন দিয়ে প্রতিষ্ঠিত, পেশাদার জনবলসম্পন্ন এবং যথেষ্ট প্রশাসনিক ও কারিগরি স্বায়ত্তশাসনসম্পন্ন একটি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। এর নেতৃত্বে দক্ষ পেশাজীবী থাকবে এবং পরিচালনায় স্বাস্থ্য, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, জনস্বাস্থ্য, সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য সুরক্ষা, বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও একাডেমিয়ার প্রতিনিধিত্ব থাকবে।
এই কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হতে পারে জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্য স্থাপত্য নির্ধারণ, ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিচয় পরিচালনা, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জাতীয় নিবন্ধন, অভিন্ন তথ্য-মানদণ্ড নির্ধারণ, স্বাস্থ্যতথ্য বিনিময়, তথ্যের গোপনীয়তা ও সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সরকারি-বেসরকারি ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার মধ্যে আন্তসংযোগ তৈরি করা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি হওয়া উচিত ডিজিটাল বিনিয়োগের সমন্বয় ও অনুমোদন। কোনো মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর বা প্রকল্প নতুন স্বাস্থ্য সফটওয়্যার তৈরি করতে চাইলে আগে দেখাতে হবে—এর প্রয়োজন কেন, একই ধরনের ব্যবস্থা ইতিমধ্যে আছে কি না, বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গে এটি যুক্ত করা যাবে কি না এবং প্রকল্প শেষ হওয়ার পর এর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার।
একটি কঠোর নীতি গ্রহণ করা যেতে পারে: জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্য স্থাপত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য ছাড়া সরকারি অর্থে কোনো নতুন বিচ্ছিন্ন ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্রকল্প নয়।
এর অর্থ এই নয় যে সরকার সব সফটওয়্যার নিজেই তৈরি করবে। বরং সরকার তৈরি করবে অভিন্ন অবকাঠামো, মানদণ্ড, নিরাপত্তাকাঠামো ও সংযোগের নিয়ম। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী উদ্ভাবনী অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করবে এবং নির্ধারিত মান মেনে জাতীয় ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হবে। এতে উদ্ভাবনও থাকবে, আবার একই কাজের জন্য বারবার সরকারি অর্থ ব্যয়ের প্রবণতাও কমবে।
জাতীয় ই-হেলথ প্ল্যাটফর্ম তৈরির বর্তমান উদ্যোগ তাই বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ। এবার যদি আমরা অতীতের মতো আরেকটি বিচ্ছিন্ন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করি, তাহলে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রথমে প্রয়োজন দেশের বিদ্যমান সব ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র তৈরি করা, কোথায় কী আছে, কত অর্থ ব্যয় হয়েছে, কত মানুষ ব্যবহার করছে, কোন ব্যবস্থার সঙ্গে কোনটির পুনরাবৃত্তি রয়েছে এবং কোনগুলো কার্যকর। এরপর নির্ধারণ করতে হবে জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্য স্থাপত্য, অভিন্ন মানদণ্ড এবং দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান।
ডিজিটাল স্বাস্থ্য কোনো পাঁচ বছরের প্রকল্প নয়; এটি ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যব্যবস্থার মেরুদণ্ড। তাই এর জন্য প্রকল্পভিত্তিক চিন্তা থেকে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক চিন্তায় যেতে হবে। সরকারের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। নতুন করে আরেকটি অ্যাপ্লিকেশন বা ওয়েব পোর্টাল নয়, এবার প্রয়োজন এমন একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, যা সরকার পরিবর্তন হলেও আগামী ১৫-২০ বছর দেশের ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার ধারাবাহিকতা, আন্তসংযোগ, তথ্যের নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে পারে।
ডিজিটাল স্বাস্থ্য গড়ার কাজ তাই প্রযুক্তি দিয়ে নয়, প্রতিষ্ঠান দিয়ে শুরু করতে হবে। প্রথমে প্রতিষ্ঠান, তারপর জাতীয় কাঠামো, অভিন্ন মানদণ্ড ও অবকাঠামো, এর ওপর দাঁড়াবে প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ও উদ্ভাবন। এই ধারাবাহিকতাই হতে পারে বাংলাদেশের টেকসই ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি।
ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
