নাম আবুল বাশার। পৈতৃক বাড়ি ছিল লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার সাহেবের হাট ইউনিয়নের চর জগবন্ধুতে। মেঘনার ভাঙনে দুই-দুইবার ঘরবাড়ি হারিয়েছেন তাঁরা। পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার বড় আবুল বাশার। স্ত্রী, মেয়ে ও দুই ছেলেকে নিয়ে হাজারীবাগ বাজারের কাছে এক বাসায় থাকেন। মেয়েটি স্থানীয় একটি স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। বড় ছেলেটির এবার হাতেখড়ি হয়েছে। ছোটটির এখনো খুদে শিক্ষার্থী হওয়ার বয়স হয়নি।

আবুল বাশার জানালেন, আগে ভ্যানে করে ফলমূল বিক্রি করতেন। করোনার দুই বছরে চালান ভাঙতে তো হয়েছেই, উপরন্তু ঋণও করতে হয়েছে কিছু। শুরুতে কমলনগরেই ঘুরে ঘুরে ফল বিক্রি করতেন। পরে চট্টগ্রামেও ছিলেন বছরখানেক। কোথাও সুবিধা করতে না পেরে সপরিবার ঢাকায় এসেছেন ৮-৯ মাস আগে। বললেন, রিকশা চালিয়ে দিনে গড়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় হয়। ঘরভাড়া ৩ হাজার ৭০০। মেয়ের স্কুলের বেতন ৫০০ টাকা। চারজনের খাওয়া, চিকিৎসা, কাপড়চোপড়। আর প্রতি মাসে কিছু কিছু করে ঋণের টাকা দিতে হয়। পেরে উঠছেন না।

রিকশাচালক, দিনমজুর, নিরাপত্তাকর্মী, ফুটপাতের খুদে ব্যবসায়ী, ভ্যানের সবজি বিক্রেতা, গৃহকর্মী, হকারদের জন্য ঢাকায় থাকা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। খরচ যেমন বাড়ছে, তেমনি কর্মস্থল থেকে তাঁদের অনেককেই থাকতে হচ্ছে দূরে। না পারছেন যানবাহনে যাতায়াত করতে, না এত দূরের পথ হেঁটে কুলাতে পারছেন।

মোটাদাগে দিনে ৭০০ টাকা ধরে মাসে ২১ হাজার টাকার হিসাব দিলে আবুল বাশার একটু হাসলেন। হাসতে হাসতেই বললেন, ‘আম্নে (আপনি) তো পুরা তিরিশ দিনের হিসাব করলেন। তিরিশ দিন কি রিকশা চালান যায়? সপ্তাহে পাঁচ দিনের বেশি পারন যায় না। তাইলে ধরেন মাসে ২০-২২ দিন। কত অয় (হয়), এবার কন?’ উত্তর দেওয়ার আগে নিজেই বললেন, ‘১৪-১৫ হাজার টিঁয়া (টাকা)। কিন্তু এহানেও অ্যাকখান ফাঁক আছে। রিকশা চালাইতে অনেক খাওন লাগে; দেড়-দুই ঘণ্টা চালানোর পর কিছু না খাইলে অয় না। তাইলে কন কত টিঁয়া থাহে? আর জিনিসপত্রের দাম আম্নেরে আর কী কমু? আম্নেও জানেন, আঁইও জানি।’

ধানমন্ডি ৮ নম্বর সড়কের মাথা থেকে মিরপুর সড়কের যানজট পেরিয়ে ততক্ষণে কলাবাগানের দ্বিতীয় গলিতে ঢুকে পড়েছে রিকশা। গাড়ি–ঘোড়ার অকারণ হর্নের অত্যাচার থেকে কিছুটা মুক্তি মিলেছে। এবার আবুল বাশারের কথা অনেকটা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। কথা বলতে বলতে বারবার আধেক পিছু ফিরছিলেন তিনি, রিকশার আসনে বসে তাঁর মুখের ডান পাশটা দেখা যাচ্ছিল। কথায় সঙ্গত রাখার এ এক নিপুণ কৌশল! কিন্তু তাই বলে রিকশা চালনায় এতটুকু এদিক-সেদিক হচ্ছিল না। দরকারে ঠিকই বেল বাজাচ্ছিলেন, জায়গা করে দিচ্ছিলেন অন্য যানকে।

আবুল বাশারের সঙ্গে যেদিন কথা হচ্ছিল, সেদিনই (২৭ জুলাই) বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদন বলছে, দেশে একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে যাচ্ছে। ২০১১ সালে পরিবারের (খানা বা এক চুলা ব্যবহারকারী) সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ২১ লাখ ৭৩ হাজার। এখন সংখ্যাটি বেড়ে ৪ কোটি ১০ লাখ পেরিয়েছে। তবে পরিবারের সংখ্যা বাড়লেও আকার কমেছে।

আবুশ বাশার ও তাঁর চার ভাই আগে একই বাড়িতে থাকতেন। নদীতে বাড়ি-জমি খুইয়ে তাঁরা হন যুগপৎ উদ্বাস্তু ও ভূমিহীন (এবং অন্নহীনও)। যে যাঁর সুবিধামতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়েন।

বিবিএস ২০১৪ সালে দেশে বস্তিতে বসবাসকারীদের নিয়ে একটি জরিপ করেছিল। তখন বস্তিতে বসবাসকারীর সংখ্যা ছিল ২২ লাখ। এবারের জনশুমারিতে দেখা গেছে, বস্তিতে ১৮ লাখ মানুষের বসবাস।

সাদাচোখেই দেখা যায়, ঢাকায় বস্তি কমছে। সারি সারি টিনের একচালা ঘরের জায়গায় উঠছে বড় বড় দরদালান। আবুল বাশার জানালেন, তিনি যে বাসায় থাকেন, সেটি তিনতলা, নিচতলার এক কক্ষে থাকে তাঁর পরিবার। বস্তির এক কামরায় থাকলে তাঁর দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা লাগত, এখানে গুনতে হচ্ছে প্রায় চার হাজার টাকা।

তাই বস্তির সংখ্যা কমার মধ্যে দৃশ্যমান যে ‘উন্নয়ন’, তার অন্তরালে অন্য গল্প।

রিকশাচালক, দিনমজুর, নিরাপত্তাকর্মী, ফুটপাতের খুদে ব্যবসায়ী, ভ্যানের সবজি বিক্রেতা, গৃহকর্মী, হকারদের জন্য ঢাকায় থাকা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। খরচ যেমন বাড়ছে, তেমনি কর্মস্থল থেকে তাঁদের অনেককেই থাকতে হচ্ছে দূরে। না পারছেন যানবাহনে যাতায়াত করতে, না এত দূরের পথ হেঁটে কুলাতে পারছেন।

তবে স্বল্প আয়ের এসব ম্লান মানুষের সংসার বরাবরের মতো এক কামরাতেই সীমাবদ্ধ। গ্রামের জীর্ণ কুটির থেকে ঢাকার বস্তি কিংবা অনভিজাত এলাকার মাথা গোঁজার ঠাঁই—এক ঘরেই কেটে যাচ্ছে তাদের গোটা জীবন।

  • হাসান ইমাম প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন