এক বিদঘুটে স্বপ্ন দেখেছেন রাজা হবুচন্দ্র ভূপ। ‘অর্থ তার ভাবি ভাবি গবুচন্দ্র চুপ’। রাজদরবারের সভাপরিষদ, পণ্ডিত, উপদেষ্টা, মন্ত্রী কেউ-ই এই স্বপ্নের অর্থ বের করতে পারলেন না। সবাই শুধু ‘থেকে থেকে হেঁকে ওঠেন “হিং টিং ছট্”।’ বিদেশ থেকেও পণ্ডিত ডাকা হলো, তাঁরাও স্বপ্নের কোনো অর্থ খুঁজে পেলেন না।
রাজার এই স্বপ্নবিভ্রাট নিয়ে সারা রাজ্যে এক বড় সংকটের সৃষ্টি হলো। ‘ছেলেরা ভুলেছে খেলা, পণ্ডিতেরা পাঠ,/ মেয়েরা করেছে চুপ—এতই বিভ্রাট।’
রবীন্দ্রনাথের সোনারতরী কাব্যগ্রন্থের ‘স্বপ্নমঙ্গল’ কবিতাটি যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা জানেন রাজা, বাদশাহ এবং শাসকদের মতো ক্ষমতাধর মানুষেরাও মাঝেমধ্যে কত যে অসহায় হয়ে পড়েন! তাঁদের বড় বড় উপদেষ্টা এবং মন্ত্রীরাও সময়ে–সময়ে ব্যর্থ হন তাঁদের সাহায্য করতে।
শুধু হবুচন্দ্রের দেশে নয়, আধুনিক রাষ্ট্রেও শাসকেরা অনেক সময় জটিল পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে এক অবাস্তব জগতে চলে যান। তখন অনেক সময় ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টাদের বাইরেও খুঁজতে থাকেন পরামর্শদাতা, যাঁরা দিতে পারবেন ‘হিং টিং ছট্’-এর মতো কঠিন সমস্যার সমাধান।
ডাক পড়ে আধ্যাত্মিক গুরু, পীর সাহেব কিংবা জ্যোতিষীদের—যে শাসকের যাঁকে পছন্দ। শুধু সংকটের সময় যে তাঁদের পরামর্শ নেওয়া হয় তা নয়, অনেকেই স্বাভাবিক সময়েও দোয়া ও আশীর্বাদ কামনা এবং শুভক্ষণ যাচাই বাছাইয়ের জন্য তাঁদের শরণাপন্ন হন।
ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যে সাম্প্রতিক নির্বাচনে মুখ্য মন্ত্রিত্ব পেয়েই চন্দ্রশেখর জোসেফ বিজয় তাঁর উপদেষ্টা নিয়োগ করেন পণ্ডিত ভেট্রিভেল নামের এক জ্যোতিষীকে। বিধানসভা নির্বাচনে বিজয় বড় ধরনের জয় পাবেন, জ্যোতিষী সেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।
সমালোচনার মুখে জ্যোতিষীকে আনুষ্ঠানিক পদ থেকে অপসারণ করা হয়। তবে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে বিজয় যে জ্যোতিষী পণ্ডিত ভেট্রিভেলের শলা-পরামর্শ নেবেন, তা এখনই বলে দেওয়া যায়।
পৃথিবীর নানা দেশেই রাজনীতিবিদেরা বিভিন্ন সংকটের সময়ে ধর্মীয় গুরু, পীর সাহেব কিংবা জ্যোতিষীদের পরামর্শ নিয়েছেন, এমন উদাহরণ ভূরি ভূরি আছে। কেউ পরামর্শ নিয়েছেন নির্বাচিত হতে, আবার কেউ নির্বাচিত হওয়ার পর পরামর্শ নিয়েছেন রাষ্ট্র পরিচালনায় সাহায্য নিতে, আবার কেউবা অন্য কোনো কারণে।
আবার কিছু রাজনীতিবিদ নিজেরাই পীর কিংবা ধর্মগুরু। যেমন চরমোনাই পীর সৈয়দ ফজলুল করীম, তাঁর রয়েছে নিজস্ব রাজনৈতিক দল—বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলন। ভারতের উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ একজন পুরোহিত ও ধর্মগুরু হিসেবেও পরিচিত।
মাওলানা ভাসানীর বর্ণাঢ্য জীবনে তাঁর ছিল নানান পরিচয়। তিনি ছিলেন বিপুলসংখ্যক জনগণের ধর্মীয় পীর; আবার তাঁর রাজনৈতিক অনুসারীর সংখ্যাও ছিল প্রচুর, তাঁদের অনেকেই তাঁকে রাজনৈতিক গুরু মানতেন।
তবে আশ্চর্যজনকভাবে, তিনি এই দুই পরিচয়ের মধ্যে একটা বিভাজন বজায় রাখতেন। যাঁরা রাজনীতি করতেন, তিনি তাঁদের ধর্মীয় পীর ছিলেন না। আবার তাঁর মুরিদদের তিনি কখনো তাঁর দলীয় রাজনীতিতে জড়াতেন না।
তাঁর সম্বন্ধে তাঁর জীবদ্দশায় একটি কথা প্রচলিত ছিল যে তিনি সকালের সময়টা মুরিদদের জন্য বরাদ্দ রাখতেন এবং বিকেলটা কাটাতেন রাজনৈতিক অনুসারীদের সঙ্গে।
শেখ মুজিবুর রহমান কখনো কোনো পীরের ভক্ত ছিলেন বলে জানা যায়নি। তবে তাঁর সঙ্গে মাওলানা ভাসানীর ছিল বহুমাত্রিক সম্পর্ক। ভাসানী এক সময়ে ছিলেন মুজিবের রাজনৈতিক গুরু, পরে ছিলেন রাজনৈতিক সমালোচক।
রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও শেখ মুজিবুর রহমান মাওলানা ভাসানীকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। তিনি ভাসানীকে ডাকতেন ‘হুজুর’ এবং যখনই দেখা হয়েছে, গুরুর মর্যাদা দিয়েছেন।
অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের বই বাংলাদেশ: আ লিগ্যাসি অব ব্লাড-এ বর্ণনা করা হয়েছে যে চট্টগ্রামের এক দৃষ্টিহীন বিহারি ধর্মগুরু, যিনি ‘আন্ধা হাফিজ’ নামে পরিচিত ছিলেন, শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার ঘটনায় তাঁর প্রবল প্রভাব ছিল।
তৎকালীন মেজর ফারুক রহমান যখন মুজিবের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি হালিশহরে গিয়ে অন্ধ হাফিজের আশীর্বাদ গ্রহণ করেন।
বলা হয় যে অন্ধ হাফিজ ফারুককে অভ্যুত্থানের সময় এবং ঠিক কী কী করলে সফল হতে পারবেন, সে বিষয়ে অনেকগুলো পরামর্শ দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশে পীর সাহেবদের যেসব দরবার রাজনীতিকদের কাছে প্রিয়, তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো পিরোজপুর জেলার শর্ষিনা পীরের দরবার।
শর্ষিনা পীরের দরবারের সঙ্গে রাজনীতিবিদদের যোগাযোগ ছিল সেই পাকিস্তানের সময়ে আইয়ুব খানের আমল থেকেই। ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমানেও শর্ষিনা পীরের দরবারের আধ্যাত্মিক শিষ্য ও ভক্তদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় পর্যায়ের বেশ কয়জন রাজনীতিবিদ।
ফরিদপুরের আটরশি পীরের কথাও বলতে হয়। প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে সম্ভবত ফরিদপুরের আটরশি পীরের সরাসরি শিষ্য বলা যাবে না, তবে তাঁকে বলা যায় আটরশির একজন ভক্ত। তাঁর শাসনামলে আশির দশকে, আটরশির পীর প্রভূত প্রভাব বিস্তার করেছিলেন এবং সরকারের বিভিন্ন স্তরে একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে ভূমিকা পালন করেছিলেন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এরশাদ আটরশির পীরকে বিশেষভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন এবং রাজনৈতিক সমর্থন এবং অন্যান্য সুবিধা আদায়ে তিনি এই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের আরেকজন পীর ভুট্টো পরিবারের সদস্যদের পরামর্শ দিয়ে বিখ্যাত হয়েছিলেন। ১৯৭০-এর দশকে, জুলফিকার আলী ভুট্টো যখন পিপলস পার্টির রাজনীতি প্রচারে ব্যস্ত ছিলেন, সেই সময়েই তিনি জয়পুরহাট জেলার পীর মুজিবুর রহমান চিশতীর সান্নিধ্যে আসেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর কন্যা বেনজির ভুট্টোও বিভিন্ন সময়ে এই পীর সাহেবের পরামর্শ নেওয়া অব্যাহত রেখেছিলেন।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিবেটিং ক্লাবের সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং পরবর্তীকালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোও তাঁর বাবার মতো পীরদের প্রতি গভীর আস্থাশীল ছিলেন।
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে থেকেই আইয়ুব খানের সঙ্গে পাঞ্জাবের দেওয়াল শরিফ এলাকার পীর আবদুল মাজিদের সরাসরি যোগাযোগ ছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অফিসারদের পাশাপাশি আমলাতন্ত্র ও বিচার বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধে৵ও মাজিদ অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন।
আইয়ুব খানের ব্যক্তিগত দিনলিপি বা ডায়েরিতে আবদুল মাজিদের নাম বিশেষভাব উল্লিখিত হয়েছে।
ভারত হলো সাধু, সন্ন্যাসী ও জ্যোতিষীদের দেশ। ভারতের বেশির ভাগ রাজনৈতিক নেতাই বিভিন্ন সময়ে তাঁদের পরামর্শ নিয়ে থাকেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আধ্যাত্মিক গুরু ছিলেন স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী। তাঁর জীবদ্দশায় মোদি প্রায়ই ঋষিকেশে তাঁর আশ্রমে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করতেন। তাঁর মৃত্যুর পর মোদি তাঁকে পদ্মভূষণ উপাধিতে ভূষিত করেন।
ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ‘ইয়োগা’ শিক্ষক ও আধ্যাত্মিক গুরু ছিলেন ধীরেন্দ্র ব্রহ্মচারী। ধীরে ধীরে ইন্দিরা গান্ধীর প্রশাসনে তাঁর প্রভাব অনেকভাবে বিস্তার লাভ করেছিল।
জরুরি অবস্থার সময় যখন ইন্দিরা গান্ধীর অনেক রাজনৈতিক সহচর ও উপদেষ্টা তাঁকে পরিত্যাগ করেন, তখন ধীরেন্দ্র ব্রহ্মচারী ইন্দিরার নিকটতম রাজনৈতিক পরামর্শক হিসেবেও পরিচিত হয়ে ওঠেন, যার জন্য তিনি ‘ভারতীয় রাসপুতিন’ উপাধিতে পরিচিত হয়েছিলেন।
দক্ষিণ এশিয়ার পীর, ধর্মগুরু ও জ্যোতিষী বলয়ের বাইরে, অপ্রথাগত পরামর্শের ওপর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নির্ভরতা প্রকাশ পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট রিগ্যানের হোয়াইট হাউসে।
নিউইয়র্ক পোস্ট–এর এক নিবন্ধে লেখা হয়েছে, ১৯৮১ সালের ৩০ মার্চ প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের দেহে গুলিবিদ্ধ হওয়ার কয়েক দিন পর, তাঁর শোকার্ত স্ত্রী ন্যান্সি রিগ্যান হলিউডের দীর্ঘদিনের বন্ধু মার্ভ গ্রিফিনের কাছ থেকে একটি ফোন পেলেন।
তিনি ফার্স্ট লেডিকে জানালেন, তাঁদের উভয়ের পরিচিত সান ফ্রান্সিসকোর জ্যোতিষী জোয়ান কুইগলি কর্তৃক প্রস্তুতকৃত রাশিচক্রে ৩০ মার্চ দিনটিকে তাঁর স্বামীর জন্য একটি বিপজ্জনক দিন হিসেবে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ‘ওহ, হে ঈশ্বর!’ ন্যান্সি বিস্ময়ে রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠলেন, ‘আমি যদি আগে রাশিচক্রটা দেখতাম, তাহলে এই আক্রমণ আটকাতে পারতাম!’
তারপর থেকে ন্যান্সি জোয়ান কুইগলির জ্যোতিষী পরামর্শের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেলেন। ন্যান্সি নিরাপত্তার নিয়ম লঙ্ঘন করে কুইগলিকে প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবিত সময়সূচিগুলো তুলে দিতেন এবং সেই জ্যোতিষী ভ্রমণ ও জনসমাবেশের জন্য শুভ ও অশুভ দিনগুলো নির্ধারণ করে দিতেন।
আস্তে আস্তে কুইগলি রাজনৈতিক বিষয়গুলোতেও নিজের পরামর্শ দিতে শুরু করলেন। বিষয়টা রিগ্যানের বিশ্বস্ত সহকারীরা সবাই জানতেন; কিন্তু ন্যান্সি রিগ্যানের ওপরে কথা বলার লোক তখন হোয়াইট হাউসে কেউ ছিলেন না। সবাই এটাকে ‘একজন স্ত্রীর তাঁর স্বামীকে রক্ষা করার অধিকার’ হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন।
পরবর্তী সময়ে এক বক্তৃতায় ন্যান্সি বলেছিলেন, ‘আমি এমন একজন নারী, যিনি তাঁর স্বামীকে ভালোবাসেন। আমাকে আমার স্বামীর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য যা করতে হয়েছে, তার কোনো কৈফিয়ত আমি দিই না।’
এখানে যেসব রাজনৈতিক চরিত্রকে নিয়ে লেখা হয়েছে, তার বাইরেও অনেক শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ বিভিন্ন সময়ে আধ্যাত্মিক বা জ্যোতিষের পরামর্শ নিয়েছেন। আবার অনেক রাজনীতিবিদই এসব সযত্নে এড়িয়ে গেছেন, ‘হিং টিং ছট্’ সংকটগুলো তাঁরা হয়তো অন্যভাবে সমাধান করেছেন।
অনেকে জানতে চাইবেন, শেষতক রাজা হবুচন্দ্রের ‘হিং টিং ছট্’ স্বপ্নের রহস্যভেদ হয়েছিল কীভাবে? সেটিও সমাধান করেছিলেন গৌড় দেশীয় এক বাঙালি আধ্যাত্মিক সাধু।
সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ই-মেইল: [email protected]
*মতামত লেখকের নিজস্ব।