এক যুগ ধরেই ইউরোপের রাজনীতিতে ডানপন্থীরা একটু একটু করে জায়গা নিচ্ছে। চরম অভিবাসন বিরোধী মনোভাব, রক্ষণশীল অর্থনীতি, বাজার সংকোচন নীতি, স্থানীয়দের জন্য সুবিধা সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডানপন্থীদলগুলো ভোটারদের আকৃষ্ট করছে। গত সেপ্টেম্বরে জার্মানিতে কট্টর ডানপন্থী অলটারনেটিভ ফর ডয়েচল্যান্ড ১০ শতাংশ ভোট নিয়ে আইনসভায় প্রবেশ করে। চলতি বছরের এপ্রিলে ফ্রান্সে ন্যাশনাল র‌্যালি পার্টির মেরি লি পেন ৪১ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। জুনে ফ্রান্সের সংসদীয় নির্বাচনে মেরি লি পেনের দল ৮৯টি আসন পেয়েছে। ভিক্টর ওরবান চতুর্থ মেয়াদে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রীর পদে বসেছেন।

সাম্প্রতিক নির্বাচনী পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, সুইডেন, হাঙ্গেরি, স্পেন, ইতালিতে জাতীয়তাবাদী ডানপন্থীদের উত্থান ঘটছে। ইউরোপের এই নব্য ডানপন্থীরা অন্যান্য রক্ষণশীল ডানপন্থীদের থেকে আলাদা। প্রচলিত ডানপন্থীরা সাংস্কৃতিক পরিচয় বা বৈশিষ্ট্য আলোচনা বা সংলাপের মাধ্যমে সংরক্ষণ করতে চায়। কিন্তু নব্য ডানপন্থীরা বর্ণবাদী ও জোনোফোবিয়ার বিস্তার করছে। ব্রেক্সিটের পর ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে এই আচরণ ক্রমেই বাড়ছে। তাদের বেশির ভাগই ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরোধী। ডানপন্থীদের এ ধরনের ক্রমাগত উত্থান ইউরোপীয় ইউনিয়নের পতন ডেকে আনতে পারে।

ডানপন্থী দলগুলো প্রচার করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সামরিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না। ২০০৮ সালের পর থেকে রাশিয়া একের পর এক প্রতিবেশী দেশগুলোয় হামলা করে বিভিন্ন অঞ্চল দখল করছে। কিন্তু ইইউ কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। ২০০৮ সালে রাশিয়া জর্জিয়ায় হামলা করে দক্ষিণ ওশেটিয়া বা আবখাজিয়া দখল করে নেয়। এরপর ইউক্রেনের ক্রিমিয়া দখল করে। সবশেষ আবারও ইউক্রেনে প্রবেশ করে বিস্তীর্ণ এলাকা দখলে নিয়েছে। এসব কারণে ইইউ বিভিন্ন সময় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা রাশিয়াকে দমাতে পারেনি।

এর পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস, বেকারত্ব বৃদ্ধি, বৈষম্য বৃদ্ধির মতো বিষয় ডানপন্থীরা জনসাধারণের কাছে নিয়ে যাচ্ছে। সংরক্ষণবাদী ভাবনা থেকে অভিবাসী ও উদ্বাস্তুদের অর্থনৈতিক দুর্দশার কারণ বলে উল্লেখ করছে। বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষার সুবিধা সংকুচিত হওয়ায় জনসাধারণ কট্টর ডানপন্থীদের এসব যুক্তিকে গ্রহণ করছে।

বেকারত্ব, ধনী দরিদ্রের বৈষম্য বৃদ্ধি, দৈনন্দিন জীবনের ব্যয় বৃদ্ধি—এ সমস্যাগুলো লাতিন আমেরিকার দেশগুলোয়ও প্রকট। সেখানে দারিদ্র্যের হার ইউরোপের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য যেখানে ইউরোপ কট্টর ডানপন্থার দিকে ঝুঁকছে লাতিন আমেরিকা সেখানে উদার বামপন্থাকেই মুক্তির পাথেয় বলে বিবেচনা করছে। ব্রাজিলে লুলা দা সিলভার জয় এর সবশেষ উদাহরণ। লাতিন আমেরিকাজুড়ে বামপন্থার এই উত্থানকে গোলাপি জোয়ার বলা হচ্ছে। গত কয়েক বছরে মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, পেরু ও হন্ডুরাসে মধ্যবাম বা বামপন্থীরা ক্ষমতায় এসেছে। গত বছর চিলিতে বামপন্থী তরুণ নেতা গ্যাব্রিয়েল বরিচ ক্ষমতায় এসেছেন। এ বছরের জুনে কলম্বিয়ায় গোস্তাভো পেত্রো নির্বাচিত হয়েছেন। কলম্বিয়ার ইতিহাসে তিনিই প্রথম বামপন্থী হিসেবে নির্বাচিত হলেন।

লাতিন আমেরিকান দেশগুলোর মধ্যে যেকোনো ধরনের অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক জোট গঠন হবে বড় ধরনের চমক। অনেকেই আশঙ্কা করছেন ২০২৪ সালের নির্বাচনে ইইউ কট্টর ডানদের হাতে চলে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ইইউ নিয়ে অনিশ্চয়তা ও ডানপন্থীদের উত্থানের বিপরীতে লাতিন অঞ্চলে বামদের উত্থান ও আঞ্চলিক জোট গঠন বিশ্বরাজনীতির নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

১৯৯০ সালের সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এই প্রথম বিশ্বের কোনো অঞ্চলে বেশ কয়েকটি দেশে বামপন্থীরা নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করল। এই বামপন্থীরা গত শতকের বামপন্থীদের থেকে ভিন্ন। অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক সংহতি লাতিন বামদের প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, বর্ণবাদ ও লৈঙ্গিক সমতাকেও তারা গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রলেতারিয়েতদের পাশাপাশি প্রেকারিয়েতদের কথাও লাতিন বাম দলগুলো গুরুত্ব দিয়ে শুনছে।

লুলা দা সিলভার জয় শুধু ব্রাজিলেই নয়, সারা বিশ্বে গণতান্ত্রিক ও উদারপন্থী রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কট্টর ডানদের উত্থানের বিপরীতে লাতিন দেশগুলো উদার রাজনীতিকে তুলে ধরছে। সেখানে উদারবাদী বাম রাজনীতির নেতৃত্বে আসতে পারেন লুলা দা সিলভা। ব্রাজিলের বাজার, অর্থনীতির আকার, জনসংখ্যা, প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ ব্রাজিলকে দক্ষিণ আমেরিকার চালকের আসনে বসিয়ে দিতে পারে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর লাতিনে উদার বামধারার গোড়াপত্তন করেছিলেন লুলা। লুলা দা সিলভা গত শতকের প্রচলিত বামপন্থী নেতাদের একজন। কিন্তু তিনি লাতিনের নব্যধারার বাম রাজনীতিকে নিজের কণ্ঠে ধারণ করেছেন। কঠোর অনুশাসনে রীতিমতো দরজা–জানালা বন্ধ করে পরিচালিত সোভিয়েত বা চীনের কর্তৃত্ববাদী বামধারা থেকে সরে এসে লাতিন বামরা নতুন ধরনের রাজনীতির কথা বলছে বা উত্তর কোরিয়ার মতো দুর্ভেদ্য অজানা দেশে পরিণত করেনি। তিনি গত শতকের বামধারা ও লাতিন বামধারার মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করছেন।

হালের লাতিন বামপন্থীরা কিউবা, ভেনেজুয়েলা ও নিকারাগুয়ার মতো স্বৈরতন্ত্র থেকে বরাবরই দূরে অবস্থান করেছে। তাদের সবাই গণতান্ত্রিক পন্থায় নির্বাচিত। নির্বাচিত হয়ে দেশে সবার জন্য মৌলিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। বিরোধী মত দমনে মনোযোগী হয়নি। আমাজনসহ প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের ওপর নিজস্ব অধিকার নিশ্চিত করে বাজার অর্থনীতিকে প্রয়োগের মাধ্যমে একধরনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত উদার অর্থনীতিকে গ্রহণ করেছে। তারা পুঁজির বিকাশকে অস্বীকার করছে না। আবার পুরোপুরি নিজেদের পুঁজিবাদের হাতে সঁপেও দেয়নি। ব্যক্তিমালিকানা ও বিদেশি বিনিয়োগকে লাতিনের নতুন প্রজন্মের বামরা স্বাগত জানিয়েছে।

তবে চিত্তাকর্ষক ও জনমুখী কর্মসূচির কথা বললেও লাতিন বামদের যুক্তরাষ্ট্র ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর রাজনীতি ও রক্তচক্ষুকে মোকাবিলা করেই টিকে থাকতে হবে। নির্বাচনে জনমত পক্ষে এলেও তাদের রাজনীতি ও অর্থনীতির নানা সংকটের সমাধান করতে হবে। এসব সমস্যার সমাধান করতে না পারলে সেখানকার বামদের গোলাপি জোয়ার বেশি দিন টিকতে না–ও পারে। তবে এর মধ্যেই লাতিনের বামপন্থী নেতারা আঞ্চলিক সমন্বয় ও সংহতির কথা বলেছেন। আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার কথাও বিভিন্ন সময় উল্লেখ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ঘাড়ের ওপর বসে তাঁরা লাতিন ঐক্য গঠনের কথা বলছেন। এখনো তাঁরা লাতিন আমেরিকান ইউনিয়ন গঠনের কথা সরাসরি বলেননি। তবে লাতিন আমেরিকান ইউনিয়ন গঠন বামদের ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে। এতে তাঁরা সম্মিলিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিপরীতে নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা করতে সমর্থ হবেন। এ ক্ষেত্রে চীনের মতো দানবীয় অর্থনৈতিক শক্তিতেও তাঁরা পাশে পেতে পারেন।

লাতিন আমেরিকান দেশগুলোর মধ্যে যেকোনো ধরনের অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক জোট গঠন হবে বড় ধরনের চমক। অনেকেই আশঙ্কা করছেন ২০২৪ সালের নির্বাচনে ইইউ কট্টর ডানদের হাতে চলে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ইইউ নিয়ে অনিশ্চয়তা ও ডানপন্থীদের উত্থানের বিপরীতে লাতিন অঞ্চলে বামদের উত্থান ও আঞ্চলিক জোট গঠন বিশ্বরাজনীতির নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ, বামদের এই জোট সোভিয়েত বা চীন ধারার বাম থেকে পৃথক হবে। আর আন্তরাষ্ট্রীয় বা ট্রান্সন্যাশনাল সংস্থা হিসেবে ইইউয়ের থেকেও পৃথক হবে। ব্রাজিলে লুলার জয় কী সেই নতুন ভোরের শুরু, যা বৈশ্বিক রাজনীতির ভারসাম্যকে বদলে দেবে?

  • ড. মারুফ মল্লিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক