রাষ্ট্রনায়কদের জন্য গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা কেন গুরুত্বপূর্ণ

গৌতম বুদ্ধ

বুদ্ধপূর্ণিমা বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের অন্যতম পবিত্র দিন। গৌতম বুদ্ধের জীবনের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সঙ্গে দিনটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাঁর জন্ম, বোধিবৃক্ষের নিচে বোধিলাভ এবং পরিনির্বাণ বা চূড়ান্ত মুক্তি—এই তিন ঘটনাই একত্রে একজন মানুষের সাধারণ জীবন থেকে জাগরণ ও মুক্তির পূর্ণ আধ্যাত্মিক যাত্রাকে প্রতিফলিত করে।

বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে দিনটি গভীর শ্রদ্ধা ও আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে পালিত হয়। প্যাগোডা ও উপাসনালয়গুলো ভরে ওঠে উপাসকদের উপস্থিতিতে। ফুল, প্রদীপ ও ধূপ নিবেদন করে তাঁরা বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। অনেক ভক্ত উপবাস পালন করেন, ধ্যানচর্চায় অংশ নেন এবং বুদ্ধের করুণা, মননশীলতা ও নৈতিক শৃঙ্খলার শিক্ষার ওপর ধর্মদেশনা শোনেন। দান, ধ্যান ও পরোপকারমূলক কর্মকাণ্ডও এদিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বুদ্ধপূর্ণিমা বা বৈশাখী পূর্ণিমা শুধু ধর্মীয় নয়, সাংস্কৃতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে দিনটি সরকারি ছুটি হিসেবে পালিত হয় এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও নানা আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উদ্‌যাপিত হয়। ধর্মীয় তাৎপর্যের বাইরে এই দিন শান্তি, নৈতিকতা ও সহমর্মিতার মতো সর্বজনীন মূল্যবোধ নিয়ে ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ, যা আজকের বিশ্বেও বুদ্ধের শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা স্মরণ করিয়ে দেয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সাধারণত সামরিক, তত্ত্বাবধায়ক ও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বেসামরিক শাসনের একটি পরম্পরা দেখা যায়। তবে এ পরিবর্তনের আড়ালেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায়। বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত, নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য দুর্বল হওয়ার প্রবণতা বারবার ফিরে এসেছে।

১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত নানা মডেলের সামরিক শাসন, ২০০৭-২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং ২০০৯-২০২৪ সালের নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের সময়কাল—সব ক্ষেত্রেই ক্ষমতা প্রয়োগের মৌলিক ধরনে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। শাসনব্যবস্থার বাহ্যিক কাঠামো বদলালেও অন্তর্নিহিত প্রবণতা ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত, নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি এবং বিরোধী মতের দমন।

সামরিক শাসনামলে ক্ষমতা সরাসরি সামরিক নেতৃত্বের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সেই শাসনকে বৈধতা দেওয়া হয়। রাজনৈতিক বিরোধীদের গ্রেপ্তার, নিষেধাজ্ঞা ও আইনি বিধিনিষেধের মাধ্যমে দমন করা হয়। ফলে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়ে। প্রতিবাদ ও সমালোচনা প্রায়ই বলপ্রয়োগে দমন করা হতো, যা সমাজে একধরনের ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল।

ওই সময় দুর্নীতি ও পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক রাজনীতি গভীরভাবে প্রোথিত হয়। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ জনকল্যাণের পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্য সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, যেখানে শাসনব্যবস্থা জনসেবার পরিবর্তে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার উপকরণে পরিণত হয়—যার প্রভাব পরবর্তী বেসামরিক সরকারগুলোর ওপরও পড়ে।

সামরিক শাসনের পরবর্তীকালে গণতান্ত্রিক কাঠামো বজায় থাকলেও এর কার্যকারিতা ক্রমে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে। নির্বাহী বিভাগে ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত বাড়ে এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রতিষ্ঠানগুলো—যেমন আদালত, নির্বাচন কমিশন ও আমলাতন্ত্র—রাজনৈতিক প্রভাবাধীন হয়ে পড়ে। নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ ও বর্জনের ঘটনা এর বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ন করে। একই সঙ্গে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) মতো নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ জনমনে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে এবং রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত করে দেয়।

গণতান্ত্রিক ও অগণতান্ত্রিক—উভয় শাসনামলেই একটি অভিন্ন চিত্র দেখা যায়: প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের অবক্ষয়, ভিন্নমতের দমন এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা। ফলে কাঠামোগতভাবে গণতন্ত্র বিদ্যমান থাকলেও বাস্তবে তা ক্রমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও এ প্রবণতাগুলো পুরোপুরি দূর হয়নি।

এ প্রেক্ষাপটে আমাদের ফিরে তাকাতে হয় এক প্রাচীন রাজনৈতিক দর্শনের দিকে, যা প্রশ্ন তোলে—কে শাসন করছেন, তা নিয়ে নয়; বরং কীভাবে শাসন করা হচ্ছে, তা নিয়ে।

প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে রাষ্ট্রনায়কদের জন্য গৌতম বুদ্ধ ‘দশ রাজধর্ম’ নামের একটি নৈতিক কাঠামো উপস্থাপন করেছিলেন। এটি প্রাচীন ভারতের রাজতান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে উদ্ভূত হলেও, এর নীতিগুলো আধুনিক রাজনীতিতেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ। এই দর্শনের মূল কথা হলো নেতৃত্ব মানে আধিপত্য নয়, বরং এক গভীর নৈতিক দায়িত্ব।

বুদ্ধের রাষ্ট্রদর্শনে ‘দশ রাজধর্ম’ একজন আদর্শ শাসকের দশটি গুণ বা কর্তব্যকে নির্দেশ করে, যা যেকোনো রাষ্ট্রনায়কের জন্য প্রযোজ্য। গুণগুলো হলো—

১. দান: জনকল্যাণে উদারভাবে রাষ্ট্রের সম্পদ ব্যবহার করা।

২. শীল: নৈতিকতা বজায় রাখা এবং সততার সঙ্গে আচরণ করা।

৩. পরিত্যাগ: জনগণের স্বার্থে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগের মানসিকতা রাখা।

৪. সততা: সত্যবাদিতা, স্বচ্ছতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করা।

৫. কোমলতা: নম্র, অহংকারমুক্ত, মৃদুভাষী ও সহানুভূতিশীল হওয়া।

৬. তপস্যা: আত্মসংযম চর্চা করা, বিলাসিতা পরিহার করা এবং রাষ্ট্র ও জনগণের দায়িত্বে নিষ্ঠ থাকা।

৭. অক্রোধ: ক্রোধ ও বিদ্বেষ থেকে মুক্ত থেকে শান্তভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

৮. অবিহিংসা: অহিংসা পালন করা, কারও ক্ষতি না করা এবং রাজনৈতিকভাবে প্রতিশোধপরায়ণ না হওয়া।

৯. ক্ষান্তি: ধৈর্য: সহনশীলতা ও সহনশীল মনোভাব বজায় রাখা।

১০. অবিরোধ: জনমতকে সম্মান করা, পক্ষপাত এড়িয়ে চলা এবং ন্যায় ও আইনের পক্ষে থাকা।

এই নীতিমালা আমাদের শেখায়, প্রকৃত নেতৃত্ব শক্তি প্রদর্শনের মধ্যে নেই; বরং তা নৈতিকতা, সংযম ও জনকল্যাণে প্রতিশ্রুতির মধ্যেই নিহিত। এগুলো রাষ্ট্রনায়কদের জন্য এমন একটি নৈতিক মানদণ্ড স্থাপন করে, যেখানে জনকল্যাণ, স্বচ্ছতা, সংযম, সহমর্মিতা ও জবাবদিহিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় যেখানে ক্ষমতা প্রায়ই নিয়ন্ত্রণ, দমন ও স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতির মাধ্যমে পরিচালিত হয়; সেখানে বুদ্ধের এই নীতিমালা আস্থা, সেবা ও নৈতিকতার ভিত্তিতে শাসনের একটি বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। আমাদের অভিজ্ঞতা দেখায়—শাসনব্যবস্থার সংকটের মূল কারণ কেবল দুর্বল প্রতিষ্ঠান নয়, বরং ক্ষমতা প্রয়োগে নৈতিকতার অভাব। জবাবদিহিহীন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে, জন–আস্থা নষ্ট করে এবং সমাজে সংঘাত বাড়ায়।

বিষয়টি শুধু দার্শনিক চিন্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর গভীর বাস্তব তাৎপর্য রয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় আইন ও প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেগুলোর কার্যকারিতা নির্ভর করে পরিচালনাকারীদের মূল্যবোধের ওপর। নৈতিক ভিত্তি না থাকলে উন্নত শাসনব্যবস্থাও একসময় দমন-পীড়নের যন্ত্রে পরিণত হতে পারে।

অতএব বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য কেবল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নৈতিক পুনর্জাগরণ। প্রশ্ন শুধু কে ক্ষমতায় আছেন সেটি নয়, ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, তা-ও বিবেচ্য। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বুদ্ধের শিক্ষা আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ, টেকসই শাসনব্যবস্থা বলপ্রয়োগের ওপর নয়; বরং নৈতিকতা ও চরিত্রের ওপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশ যদি অবিশ্বাস ও অস্থিতিশীলতার চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, তবে রাষ্ট্রনায়কদের নৈতিকতাকেই শাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দিতে হবে। টেকসই গণতন্ত্র কখনো নিয়ন্ত্রণের ওপর নয়, দায়িত্ববোধের ওপরই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

মিলিন্দ মারমা: আদিবাসী লেখক ও অধিকারকর্মী

ইমেইল: [email protected]