অভিযোগের তদন্ত প্রয়োজন, সে কথা স্বীকার করতে চাননি। তদন্ত কেন প্রয়োজন, তা মানবাধিকার পরিষদে দেওয়া সরকারের বক্তব্যে কিছুটা হলেও উঠে এসেছে। যখন বলা হচ্ছে, ‘দুষ্কৃতকারীরা’ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে ‘অপহরণ’-এর মতো অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে বলে একটি প্রবণতা সরকার লক্ষ করছে, তখন এ তদন্ত অপরিহার্য। সবটাই তো আর পরিচয় ব্যবহার করা নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ ধরনের অপরাধ করছে না, তা প্রমাণ করতে হলেও তদন্ত প্রয়োজন।

এ তদন্তই সবার চাওয়া। তবে তদন্তটা বিশ্বাসযোগ্য ও সবার কাছে গ্রহণীয় হওয়ার জন্য তা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থায় হওয়া চাই। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি সেটাই। গুমের শিকার পরিবারগুলোও তা-ই চায়।

জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার সদ্য বিদায় নেওয়া প্রধান মিশেল ব্যাশেলেতও স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের সুপারিশ করে তাতে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব করে গেছেন। শুধু গুম তো নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে যেকোনো অভিযোগ, তা সে হোক নির্যাতন-নিপীড়ন, হেফাজতে মৃত্যু কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যা—এসব অভিযোগের তদন্তে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি নতুন কিছু নয়।

পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশমালায় এ সুপারিশ রয়েছে। কিন্তু পুলিশ রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও আনুগত্যের সুবাদে ওই সুপারিশ বাস্তবায়ন ঠেকিয়ে রেখেছে প্রায় দেড় দশক ধরে। নিজেদের অপরাধের তদন্ত নিজেরা করার নামে এক অদ্ভুত সুবিধা ভোগ করে চলেছে।

ঠিক সে সময়েই গুমের শিকার পরিবারগুলোর সদস্যদের হয়রানি ও ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ কমিটিকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করাকে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ ও ‘সরকারবিরোধী’ অভিহিত করে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন অধিকারের রেজিস্ট্রেশন নবায়নের আবেদনও প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এগুলো কি সহযোগিতার ঠিক উল্টো বার্তাই দেয় না?

গুমের অভিযোগ সম্পর্কেও এক অদ্ভুত যুক্তি হাজির করা হচ্ছে। অভিযোগ করলেই হবে না, সেটা প্রমাণের দায়িত্বও অভিযোগকারীর। অভিযোগ যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে, তখন একজন সাধারণ নাগরিক তা প্রমাণ করবে কীভাবে? গুমের জন্য অপহরণের সময় যেসব কৌশল অনুসরণের অভিযোগ আছে, তা প্রায় একই রকম।

তাঁরা আসেন সাধারণ পোশাকে, ব্যবহার করেন কালো কাচে ঢাকা গাড়ি, যার নম্বরপ্লেটও আড়াল করা থাকে। যেখান থেকে তুলে নেওয়া হয়, সেখানকার সিসিটিভি হয় ভেঙে দেওয়া হয়, নয়তো ফুটেজ জব্দ করে ফেলা হয়। যাঁরা ফিরে আসেন, তাঁরা এতটাই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন যে মুখ খোলার সাহস থাকে না। আবার অনেকের বেলায় দেখা যায়, দীর্ঘ বিরতির পর তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে।

অথচ নিখোঁজ হওয়ার সময় থেকে গ্রেপ্তার দেখানোর মধ্যবর্তী সময়, যা কয়েক দিন থেকে কয়েক মাসও হয়ে থাকে, সে সময়টুকুর হিসাব মেলে না। পরিবার ও পড়শিরা তাঁকে তুলে নেওয়ার সাক্ষ্য দিলেও বলা হয় পলাতক অবস্থায় তাঁকে আটক করা হয়েছে। এসব ভাষ্য গুমের লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গুমের প্রায় সব অভিযোগের তথ্য জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ কমিটিকে দেওয়া হয়েছে। জেনেভায় চলমান মানবাধিকার পরিষদের ৫১তম অধিবেশনে গুমবিষয়ক বিশেষজ্ঞ কমিটি, ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এনফোর্সড অর ইনভলান্টারি ডিজঅ্যাপিয়ারেন্সের সর্বসাম্প্রতিক প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এ বক্তব্য দেওয়া হয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, কবে, কতজন বা কয়টি অভিযোগের বিষয়ে তথ্য দেওয়া হয়েছে? কেননা, বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতিবেদনটি গত মে মাস পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি এবং তাতে বলা হয়েছে, সরকার আটজনের বিষয়ে তথ্য দিয়েছে। কমিটির কাছে বিবেচ্য অভিযোগ জমা পড়েছিল ৮৮টি, যার মধ্যে এখনো ৮১টির কোনো সুরাহা হয়নি বা অনিষ্পন্ন অবস্থায় আছে।

তাহলে কি যে আটজনের তথ্য দেওয়া হয়েছে, তাতেও অসম্পূর্ণতা আছে? আমরা এগুলোর কিছুই জানি না, অভিযোগকারী অথবা ভুক্তভোগীদের স্বজনেরাও জানেন না। অথচ এসব তথ্য জানা স্বজনদের অধিকার। আর সাধারণ মানুষ তথ্যগুলো পেলে কোন অভিযোগ সত্য আর কোনটি সরকারি ভাষ্যমতে ভিত্তিহীন, সে সিদ্ধান্ত নেওয়া সবার জন্য সহজ হবে। সরকারি ব্যাখ্যা ও আশ্বাসের পরও বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান ব্যাশেলেতের সুপারিশ মেনে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ কমিটির কাছে যেসব অভিযোগ গেছে, সেগুলোই সব নয়। দেশীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবে গত এক দশকের কিছুটা বেশি সময়ে গুমের ঘটনা ঘটেছে ছয় শতাধিক।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত ঘটনাগুলোর ভিত্তিতেই তাদের এ পরিসংখ্যান। এর যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন করতে গিয়ে সরকার নাম-ঠিকানা দেওয়ার জন্য সময় বেঁধে দিয়ে এসব সংগঠনকে চিঠি দিয়েছে। কিন্তু ইত্যবসরে হংকংভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। ৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত তালিকায় তারা ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে ৬২৩ জনের গুম হওয়ার কথা বলেছে।

তাদের হিসাবে, এখনো কোনো সন্ধান মেলেনি ১৫৩ জনের এবং জীবিত আছেন ৩৮৩ জন, যাঁদের কেউ বাড়ি ফিরেছেন, আর বাকিরা আছেন জেলে। গুম হওয়ার পর মরদেহ মিলেছে ৮৪ জনের। বাকি তিনজনের কোনো হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়নি। গুমের অভিযোগ নিয়ে যে বিতর্ক ও সমালোচনা, তার সমাধানে এর প্রতিটির সত্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

গুমের অভিযোগ ওঠার পর যাঁরা ফিরে এসেছেন, তাঁদের পরিবার আর কোনো মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ নিতে চাইবে না, সেটাই স্বাভাবিক। তাই তাঁরা তাঁদের দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করেন না। কিন্তু তাঁদের মধ্যেও দু-একজন যে অভিযোগ করেননি, তা-ও নয়। যেমন রাজনীতিবিদ মাহমুদুর রহমান বলেছেন, তাঁকেও উঠিয়ে নেওয়া হয়েছিল এবং তিনি গুম থেকে ফিরে এসেছেন। তাঁর গুমজীবনের সময় এবং তখন যা ঘটেছে, এর কি কোনো জবাবদিহির প্রয়োজন নেই? সেটা কেবল স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের কাঠামোতেই সম্ভব।

সরকারের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে নিখোঁজের সব ঘটনাকে ‘গুম’ হিসেবে অভিহিত করা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর একটি প্রবণতায় পরিণত হয়েছে—এমন দাবি যুক্তিসংগত প্রমাণ ছাড়া কারও কাছেই গ্রহণীয় নয়।

অভিযোগগুলো কতটা তথ্যভিত্তিক, তার প্রমাণ যাচাইয়ের জন্য জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতি আহ্বান জানানোর আগে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি মেনে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা আমাদের সরকারকেই করতে হবে। কূটনৈতিক লবিং আর রাজনৈতিক বক্তৃতা এর বিকল্প নয়।

জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে সদস্য পদে আগামী ১৪ অক্টোবরের নির্বাচনে বাংলাদেশ বিজয়ী হলেই এসব অভিযোগ কেউ বিস্মৃত হবে না। বাংলাদেশ এর আগেও ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত এক মেয়াদে মানবাধিকার পরিষদে সদস্য ছিল, কিন্তু প্রশ্নগুলো তখনো উঠেছে।

বাংলাদেশ মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা থেকে কখনোই সরে যায়নি উল্লেখ করে মানবাধিকার পরিষদের আলোচনায় সরকারের প্রতিনিধি বলেছেন, ওয়ার্কিং গ্রুপের সঙ্গে সরকার গঠনমূলকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

অথচ ঠিক সে সময়েই গুমের শিকার পরিবারগুলোর সদস্যদের হয়রানি ও ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ কমিটিকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করাকে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ ও ‘সরকারবিরোধী’ অভিহিত করে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন অধিকারের রেজিস্ট্রেশন নবায়নের আবেদনও প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এগুলো কি সহযোগিতার ঠিক উল্টো বার্তাই দেয় না?

  •  কামাল আহমেদ সাংবাদিক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন