প্যারেন্টিং শিক্ষায় বিনিয়োগ প্রয়োজন

শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করি বলে অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ হয়। তাঁদের অনেককেই সন্তান বড় করা নিয়ে সংকটে পড়তে দেখি। সম্প্রতি গাইবান্ধায় ১০-১২ জন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলছিলাম। একজন বললেন, সপ্তম শ্রেণিতে পড়া ছেলেকে মুঠোফোন কিনে দিয়েছেন। এখন পড়াশোনায় তার একেবারেই মনোযোগ নেই। জানতে চাইলাম, এত অল্প বয়সে মুঠোফোন দিলেন কেন? তিনি বললেন, মুঠোফোন না দিলে সে স্কুলে যাবে না বলে জেদ করছিল। এ ধরনের ঘটনা অনেক পরিবারেই ঘটছে। 

সন্তান চাইলেই কি তাকে সবকিছু দিতে হবে? যেসব সিদ্ধান্ত শিশুর জীবনকে প্রভাবিত করে, সেসব বিষয়ে মতামত প্রকাশ করা তার অধিকার। কিন্তু তার কথা শোনার অর্থ সব চাওয়া মেনে নেওয়া নয়। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের একটি মূলনীতি হলো ‘শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ’। কোনো কাজে শিশুর ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে বড়দের দায়িত্ব তাকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া। তার মতামত শোনার পরও কেন সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না, তা বুঝিয়ে বলতে হবে। 

আরও পড়ুন

প্রয়োজন ভালোবাসা ও দিকনির্দেশনা

এই ভারসাম্য বজায় রাখতেই অনেক মা-বাবা হিমশিম খান। কেউ সন্তানের জন্য কোনটি ভালো, তা বিবেচনা না করেই সব আবদারে ‘হ্যাঁ’ বলেন। আবার কেউ তার মতামত অগ্রাহ্য করে নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন এবং প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ করতে চান। কোনোটিই কার্যকর প্যারেন্টিং নয়।

সন্তান পালনের ওপর গত প্রায় ৪০ বছরে সম্পাদিত শতাধিক গবেষণার সারাংশ থেকে দুটি বিষয় উঠে আসে—শিশুর সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন ভালোবাসা ও উষ্ণতায় ঘেরা পরিবেশ এবং শেখার যথাযথ কাঠামো। উষ্ণতা বলতে বোঝায় শিশুর প্রতি আস্থা ও সম্মান দেখানো এবং যোগাযোগ রাখা। আর শেখার কাঠামোর মধ্যে রয়েছে তথ্য, নির্দেশনা ও শিক্ষা দেওয়া। এটি শাস্তি বা নিয়ন্ত্রণনির্ভর কঠোর সন্তান পালনের পদ্ধতি থেকে আলাদা।

এই দিকনির্দেশনা দিতে শিশুর বিকাশের বিভিন্ন পর্যায় সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। বয়সের সঙ্গে শিশুর চিন্তাভাবনা ও অনুভূতি বদলায়। তাই সন্তানের মেজাজ ও আচরণ বোঝার পাশাপাশি নিজেদের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কেও মা-বাবার সচেতন হওয়া দরকার। যথাযথ যত্ন ও দিকনির্দেশনার অভাবে শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সম্ভাবনার বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সে নেতিবাচক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়তে পারে, যার প্রভাব পড়ে সমাজে।

তবে প্রয়োজনীয় কৌশল শেখার সুযোগ পেলে মা-বাবা পরিবর্তন আনতে পারেন। বাংলাদেশ, লাইবেরিয়া ও পাপুয়া নিউগিনিতে কাজের সূত্রে দেখেছি, প্রশিক্ষণের পর অনেক মা-বাবা সন্তানের সঙ্গে নিজেদের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছেন।

কৈশোর নিয়ে উদ্বেগ

বয়সভিত্তিক দিকনির্দেশনার প্রয়োজন বিশেষভাবে স্পষ্ট হয় কৈশোরে। এ সময় সন্তানকে নিয়ে অনেক অভিভাবক উদ্বিগ্ন থাকেন এবং বাড়তি নজরদারির প্রয়োজন অনুভব করেন। বাংলাদেশে বর্তমানে এই উদ্বেগ বেড়েছে। ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরা স্বাধীনভাবে চলতে ও নিজের সিদ্ধান্ত নিতে চায়। বন্ধু ও সমবয়সীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতাও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অথচ তাদের মস্তিষ্কের বিকাশ তখনো সম্পূর্ণ হয় না। ফলে সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য ঝুঁকি তারা সব সময় বুঝে উঠতে পারে না।

এ অবস্থায় তত্ত্বাবধান প্রয়োজন, কিন্তু সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখলে তারা খোলামেলা আলোচনা করতে দ্বিধা বোধ করতে পারে। একে অতিরিক্ত খবরদারি মনে করে মা-বাবার পরামর্শও অগ্রাহ্য করতে পারে। তত্ত্বাবধান সম্মানজনক হলে সন্তান কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে এবং পরামর্শকে গুরুত্ব দেয়। তাই কৈশোরে উষ্ণ, স্থিতিশীল ও ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্ক ধরে রাখা জরুরি।

আরও পড়ুন

ডিজিটাল যুগে প্যারেন্টিং

এই আস্থার সম্পর্ক প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন। অনেক মা-বাবা মনে করেন, প্রযুক্তি সম্পর্কে সন্তানেরা তাঁদের চেয়ে বেশি জানে। ফলে দিকনির্দেশনা দিতে গিয়ে তাঁরা অসহায় বোধ করেন। কিন্তু সন্তানকে দায়িত্বশীল ডিজিটাল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে প্রযুক্তিবিদ হতে হয় না। প্রয়োজন নিয়মিত কথা বলা, আগ্রহ নিয়ে তার জীবনের গল্প শোনা এবং প্রযুক্তির ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন করা।

রাষ্ট্রকে প্যারেন্টিং শিক্ষায় বিনিয়োগ করতে হবে

এসব অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, সন্তান জন্ম দিলেই কার্যকর প্যারেন্টিংয়ের দক্ষতা তৈরি হয় না। শিশুর বয়স অনুযায়ী প্রয়োজন বোঝা, তার কথা শোনা, শাস্তি ছাড়া সীমারেখা তৈরি, রাগ বা হতাশার সময়ে আচরণ সামলানো এবং কৈশোরে আস্থা ধরে রাখা—এসব শিখতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে সেই সুযোগ কতটুকু?

প্যারেন্টিং শিক্ষাকে শুধু মা-বাবার ব্যক্তিগত আগ্রহ বা সামর্থ্যের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। বিভিন্ন দেশে স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবার সঙ্গে এই শিক্ষা যুক্ত করা হয়েছে। কাজাখস্তান ও থাইল্যান্ডের মতো দেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে শিশুর বিকাশ, ইতিবাচক যোগাযোগ, খেলাধুলা, পুষ্টি ও নিরাপদ পারিবারিক পরিবেশ সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।

বাংলাদেশেও স্বাস্থ্যব্যবস্থা হতে পারে কার্যকর মাধ্যম। গর্ভকালীন সেবা, শিশুর টিকাদান, পুষ্টি ও বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণের সময় মা-বাবার সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীদের যোগাযোগ হয়। কমিউনিটি ক্লিনিক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবায় বয়সভিত্তিক প্যারেন্টিং পরামর্শ যুক্ত করলে পরিবারগুলোর কাছে এসব বার্তা পৌঁছানো সম্ভব।

এ জন্য একেবারে নতুন করে শুরু করারও প্রয়োজন নেই। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন অংশীজনের অংশগ্রহণে ২০২৩ সালে শূন্য থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুদের মা-বাবা ও যত্নকারীদের জন্য সমন্বিত প্যারেন্টিং এডুকেশন প্যাকেজ তৈরি হয়। ২০২৪ সালে সরকার সেটি অনুমোদন করে। এর বহু খাতভিত্তিক বাস্তবায়ন পরিকল্পনাও তৈরি হয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে প্যারেন্টিং সহায়তা দেওয়ার কিছু পরীক্ষিত অভিজ্ঞতাও রয়েছে। এখন প্রয়োজন স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষাসহ বিদ্যমান সরকারি সেবার মাধ্যমে প্যাকেজটির কার্যকর বাস্তবায়ন ও দেশব্যাপী সম্প্রসারণ। পাশাপাশি স্কুল, গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকেও কাজে লাগাতে হবে।

আমরা শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক কথা বলি। সেই ভবিষ্যতের ভিত তৈরি হয় পরিবারে—প্রতিদিনের আচরণ, কথোপকথন ও সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। তাই মা-বাবাকে কার্যকর প্যারেন্টিং শেখার সুযোগ দেওয়া বিলাসিতা নয়। শিশুর অধিকার ও পরিপূর্ণ বিকাশ নিশ্চিত করতে, সহিংসতা প্রতিরোধে এবং সুস্থ সমাজ গঠনে এটি রাষ্ট্রের জরুরি বিনিয়োগ।

● লায়লা খন্দকার উন্নয়নকর্মী