ইরানকে কেন বশে আনতে পারছে না আমেরিকা

তেহরানে সাধারণ ইরানিদের যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিক্ষোভছবি : রয়টার্স

বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশটি কেন একটি তুলনামূলক ছোট, দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর নিজের ইচ্ছা পুরোপুরি চাপিয়ে দিতে পারছে না, সে প্রশ্ন আজ অনেকের মনেই ঘুরপাক খাচ্ছে। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক হামলায় বহুবার ক্ষতবিক্ষত হওয়া সত্ত্বেও ইরান কীভাবে টিকে আছে, তার ব্যাখ্যা খুঁজতে গেলে একটি সহজ ধারণা কাজে লাগে। সেটি হলো গেম থিওরি বা কৌশলগত খেলাতত্ত্ব।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মূলত ইরানের সঙ্গে এমন একটি খেলা খেলতে চেয়েছিলেন, যাকে বলা যায় ‘চিকেন গেম’। কল্পনা করা যাক, দুটি গাড়ি সোজাসুজি একে অপরের দিকে ছুটে আসছে। যে আগে সরে যাবে, সে হেরে যাবে। যদি একজন চালকের জন্য এই লড়াই জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়, মানে সে মনে করে ‘আমি হারলে সব শেষ’, তাহলে সে সাধারণত পিছু হটতে চায় না। কারণ, তার কাছে হারার পরিণতি এতটাই ভয়াবহ যে ঝুঁকি নেওয়াটাই ভালো মনে হয়।

অন্যদিকে যদি আরেকজন চালকের জন্য বিষয়টা ততটা গুরুতর না হয়, মানে যদি সে ভাবে ‘আমি হারলেও খুব বেশি ক্ষতি হবে না’, তাহলে সে শেষ পর্যন্ত সরে যেতে পারে। কারণ, তার কাছে বেঁচে থাকা বা ক্ষতি এড়ানোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ইরানের ক্ষেত্রে হার মানে শুধু পরাজয় নয়; বরং শাসনব্যবস্থার পতন, এমনকি নেতাদের জীবনহানির ঝুঁকি। অন্যদিকে ট্রাম্পের জন্য এর পরিণতি হতে পারে নিজের ‘বাগানবাড়ি’ মার-এ-লাগো রিসোর্টে একটি বাজে সপ্তাহান্ত কাটানোর মতো ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বা ভাবমূর্তির ক্ষতি। ফলে কেন এই খেলায় ইরান বেশি মরিয়া, তা বোঝা কঠিন নয়।

তবে বিষয়টি শুধু ট্রাম্প বা সাম্প্রতিক যুদ্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আমেরিকার জন্য ইরানকে মোকাবিলা করা কঠিন হওয়ার পেছনে আরও গভীর একটি কারণ রয়েছে। সেটি হলো, ইরানে ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আমেরিকার মনোভাব দ্বিধাগ্রস্ত।

একদিকে আমেরিকা জিম্মিদের ফেরত আনা বা ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে সংকুচিত করার মতো কিছু নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান চায়। অন্যদিকে তাদের একটি বড় অংশ পুরো শাসনব্যবস্থাই বদলে দিতে চায়। এই দুই অবস্থানের মধ্যে টানাপোড়েন প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির ভেতরে কাজ করে যাচ্ছে। প্রশ্নটি তাই স্পষ্ট—ওয়াশিংটন কি ইরানের কিছু নীতি বদলাতে চায়, না পুরো ইরানকেই বদলে দিতে চায়?

বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে, ট্রাম্প একটি চুক্তি করতে চান। কিন্তু সেই চুক্তি করতে গিয়ে তিনি হয়তো ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে এমন একটি স্বীকৃতি দিয়ে বসবেন, যা তারা প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে পেতে চেয়েছে।

যদি আমেরিকা তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় বসে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সেখানে ‘দেওয়া-নেওয়া’ থাকবে, উভয় পক্ষই কিছু ছাড় দেবে। এতে উত্তেজনা কিছুটা কমবে। কিন্তু এর ফলে একটি বড় পরিবর্তন ঘটবে। এটি হলে আমেরিকা কার্যত ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে একটি বৈধ রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে এবং দেশটিকে আলোচনার উপযুক্ত অংশীদার হিসেবে গ্রহণ করবে।

বিষয়টি আমেরিকার অনেক নীতিনির্ধারকের কাছে অস্বস্তিকর। তাঁদের মতে, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা অবৈধ, এর অস্তিত্ব থাকা উচিত নয় এবং আমেরিকার একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত এই সরকারকে উৎখাত করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমেরিকার এমন কিছু প্রয়োজন আছে, যা শুধু ইরানই দিতে পারে।

এ দ্বন্দ্ব নতুন নয়। প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের সময়েও দেখা গেছে, প্রকাশ্যে ইরানের কঠোর সমালোচনা করা হলেও গোপনে তাদের সঙ্গে আলোচনা চালানো হয়েছে।

ট্রাম্পের ইরান নীতিতে এ দ্বৈততা প্রতিদিনই চোখে পড়ে। কখনো তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানের সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে বলেন, তিনি চার দশকের ‘অসৎ’ শাসনের অবসান ঘটাবেন। আবার সেই একই দিনে তিনি ইরানের সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতির কথাও বলেন।

একদিকে তিনি আলোচনায় বসে চুক্তির আশাবাদ ব্যক্ত করেন। আবার আলোচনার মধ্যেই তিনি তেহরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন এবং ইরানের জনগণকে তাদের সরকার উৎখাতের আহ্বান জানান। কয়েক দিনের মধ্যেই আবার বলেন, তাঁর শর্ত মেনে নিলে ইরানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।

এ ধরনের দ্বৈত আচরণ আমেরিকার ইতিহাসে নতুন নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষেত্রেও একই ধরনের মনোভাব দেখা গিয়েছিল।

১৯১৭ সালে রাশিয়ায় কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় আসার পর আমেরিকা তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং কিছুটা হলেও সেই শাসনব্যবস্থা উৎখাতের চেষ্টা করে। প্রায় ১৬ বছর পর প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডেলানো রুজভেল্ট সেই রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেন এবং মস্কোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এ দ্বন্দ্ব আবার সামনে আসে। সত্তরের দশকে হেনরি কিসিঞ্জারের সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনা নীতি আমেরিকার ডানপন্থী মহলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। তাদের মতে, এতে একটি ‘অশুভ সাম্রাজ্য’-এর অবস্থান আরও শক্তিশালী হচ্ছে।

কিসিঞ্জারের জবাব ছিল স্পষ্ট—আদর্শগতভাবে আমেরিকা সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরোধী হলেও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের মতো কিছু বিষয়ে তাদের সঙ্গে সমঝোতা অপরিহার্য।

ইরান প্রশ্নে এ দৃষ্টিভঙ্গির আধুনিক প্রতিফলন দেখা যায় প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়ে। ওবামা প্রশাসন স্বীকার করে, ইরানে অন্য শাসনব্যবস্থা থাকলে ভালো হতো, কিন্তু বাস্তবে এ সরকারকেই মোকাবিলা করতে হবে।

তাদের কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল পরমাণু অস্ত্র। সে কারণেই ইরান চুক্তি করা হয়। এ চুক্তির লক্ষ্য ছিল ইরানের পরমাণু কর্মসূচির সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা। এ প্রচেষ্টা সফলও হয়েছিল।

কিন্তু আমেরিকার ডানপন্থী মহলের কাছে এ চুক্তির মূল্য ছিল অন্য জায়গায়। তাদের মতে, এর মাধ্যমে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে একধরনের বৈধতা দেওয়া হয়েছে। ফলে ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসেন।

এর ফল হয়েছিল উল্টো। এতে ইরানের তুলনামূলক উদারপন্থী নেতা হাসান রুহানির অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে এবং কট্টরপন্থীরা আবার ক্ষমতায় শক্ত অবস্থান নেয়। তারা ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি আরও বাড়িয়ে দেয়।

ফলে ট্রাম্প আবার সেই পুরোনো সমস্যার সামনে এসে দাঁড়ান—তিনি কি চুক্তি করবেন, না কঠোর অবস্থান নেবেন?

বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে, ট্রাম্প একটি চুক্তি করতে চান। কিন্তু সেই চুক্তি করতে গিয়ে তিনি হয়তো ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে এমন একটি স্বীকৃতি দিয়ে বসবেন, যা তারা প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে পেতে চেয়েছে।

তেহরানের কাছে আমেরিকার সবচেয়ে কঠোর বিরোধীদের কাছ থেকে নিঃশর্ত স্বীকৃতি তাদের কাছে এতটাই মূল্যবান যে তার জন্য তারা অনেক ছাড় দিতেও প্রস্তুত থাকতে পারে।

ফরিদ জাকারিয়া আন্তর্জাতিক রাজনীতিবিষয়ক বিশিষ্ট ভাষ্যকার

ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে নেওয়া; অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ