কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচন তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। উল্লেখ্য, এ নির্বাচনে সব কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট গ্রহণ চলছিল। অন্যদিকে, কমিশন সিসি ক্যামেরায় দেখেছে ভোটকক্ষে একাধিক ব্যক্তির সমাগমসহ নানাবিধ অনিয়ম। কোথাও-বা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল সেসব ক্যামেরারই। এক এক করে ৫১টি কেন্দ্রের নির্বাচন স্থগিত করার পর কমিশন গোটা নির্বাচনকে নিষ্ফল বিবেচনায় বন্ধই করে দেয়। যেখানে নিষ্ক্রিয়তা, পক্ষপাতসহ বহুবিধ কারণে ২০১২ সালের পর নির্বাচন কমিশনের অস্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছিল, সেখানে সংশ্লিষ্ট উপনির্বাচনে তাদের ভূমিকা প্রশংসার দাবি রাখে। তবে ভোট গ্রহণের প্রক্রিয়াটি কেন ব্যর্থ হয়ে যায়, কমিশনকে এর একটি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিয়ে জানাতে হবে জনগণকে।

উল্লেখ্য, এ উপনির্বাচনে মোতায়েন ছিলেন তিন হাজারের মতো নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। অন্যদিকে, ৩০০ আসনের সংসদ নির্বাচনে আসনপিছু গড়ে ৫০০ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিয়োগ দেওয়া যাবে কি না, এ বিষয়ে আমি সন্দিহান। এরপর থাকছে প্রতিটি ভোটকেন্দ্র সিসি ক্যামেরার আওতায় রাখা ও পর্যবেক্ষণ। এ নির্বাচনী এলাকায় ভোটকেন্দ্র ছিল শ দেড়েক। পর্যবেক্ষণ করেছেন গোটা কমিশন ও গণমাধ্যমের উৎসাহী ব্যক্তিরা। জাতীয় নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র হবে প্রায় ৪০ হাজার। বুথের সংখ্যা দাঁড়াবে দুই লাখের কাছাকাছি।

সে ধরনের কোনো কিছু করতে না পারলে মাঠ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্বাচনমুখী হবে না। গাইবান্ধা নিয়ে শেষ কথা নয়। এটি অতি ছোট একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তবে নজর খুলে দেওয়ার মতো। একে ভিত্তি ধরে কমিশন সামনের দিকে এগিয়ে যাবে—এ প্রত্যাশা রইল। তাদের সদিচ্ছা ও সক্ষমতার দেখা এখনো অনেক বাকি।

সেখানে সব বুথে এ ধরনের সিসিটিভি সংযোগ ও তা পর্যবেক্ষণ কতটা সম্ভব, এটি বোধগম্য হচ্ছে না। পাশাপাশি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্যও লোকের অভাব ঘটবে না; বরং যে ক্ষেত্রে বিজয় ও পরাজয়ের মূল্য চড়া, সে ক্ষেত্রে আমাদের নির্বাচন-সংস্কৃতি অনুসারে প্রতিদ্বন্দ্বীদের মরিয়া হয়ে ওঠারই কথা। গাইবান্ধা উপনির্বাচন বন্ধ করে দেওয়া নিয়ে সরকারি দলের কয়েকজন নেতা কমিশনের সিদ্ধান্তের বিপরীতে কথা বলেছেন। সেখানে তাঁদের কোনো যুক্তি জোরালো নয়। অনিয়ম দীর্ঘদিন চলছিল বলে কখনো থামানোর চেষ্টা হবে না, এমন হতে পারে না।

গাইবান্ধা উপনির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা ছিলেন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তা। অবশ্য তিনি কেন্দ্রে বসে থাকেন না এবং সব অনিয়ম তাৎক্ষণিকভাবে জানেনও না। তবে প্রতিটি কেন্দ্রে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও পোলিং কর্মকর্তা (সবাইকে ভোটকর্মী বলে আখ্যায়িত করা যায়) নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে যে ৫১ কেন্দ্র কমিশন সিসিটিভিতে নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত অনিয়ম পর্যবেক্ষণ করে বাতিল করল, সেসব কেন্দ্রে তো ভোটকর্মীরা ছিলেন। তাঁরা বাধা দিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সাহায্য চেয়েছেন বা সেখানে অনিয়ম ঠেকানোতে কারও কোনো ভূমিকা ছিল, এমন তো এখনো শুনিনি। তাহলে তো আমাদের উপনির্বাচনের ব্যবস্থাটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকে এ অনিয়মের সহযোগী কিংবা অসহায় দর্শক ছিলেন। এ ক্ষেত্রে বাদ পড়েন না নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারাও।

২০১২ সালের পর থেকে কমিশনের এ ধরনের আচরণ লক্ষ করা গেছে বারবার। মনে হয়েছে, ক্ষমতায় থাকা সরকারকে পুনর্বহাল কার্যক্রমে বৈধতা দেওয়াই তাদের কাজ। আর তারা কাজটি শুধু নিজেরা করে না; সারা দেশে ৩০০ নির্বাচনী এলাকায় রিটার্নিং কর্মকর্তা, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা, ভোটকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়েই চলছে এত দিন। এবার বিপরীতমুখী হওয়া অর্থাৎ সঠিক অর্থে নির্বাচন হওয়ার মতো কাজ তারা করতে পারবে কি না, এ নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। গাইবান্ধা মডেল প্রশংসনীয়। তবে এটা সব ক্ষেত্রে অনুসরণ করার সক্ষমতা ও সম্ভাব্যতা সম্পর্কে নিশ্চয়তা নেই। এখন গাইবান্ধাতেও আবার নির্বাচন করতে হবে। আর করবেন এবার যাঁরা করেছেন, তাঁদের সতীর্থরাই। তবে এবার যাঁদের অবজ্ঞা কিংবা উসকানিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়, কমিশন তাঁদের চিহ্নিত করে নির্বাচনী আইন অনুসারে যদি ব্যবস্থা নিতে পারে, তবে পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করবে।

মাঠপর্যায়ে যদি ধারণা দেওয়া যায় যে এ কমিশন নির্বাচন করতে দায়িত্ব নিয়েছে, এর বিপরীতে কেউ অবস্থান নিলে বা ন্যায্য সহযোগিতা না করলে তাঁকে শাস্তি পেতে হবে, তবে আপনা থেকেই সহযোগিতা আসতে থাকবে। কমিশন নিজদের গুটিয়ে রাখলে কোনো ফল দেবে না। যেমন দেখলাম, ডিসি-এসপিদের সঙ্গে সংলাপের পর কমিশন নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে।

আমরা ঘটনাটিতে বিচলিত ও ক্ষুব্ধ। তবে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা গত দুই দফায় সংসদ নির্বাচনে দেখে এসেছেন, ‘ভোটের’ তাঁরাই নিয়ামক শক্তি। কমিশন বৈধতা দেয় মাত্র। এ ক্ষেত্রে তাঁদের থেকে কমিশনের প্রতি স্বতঃসিদ্ধ আনুগত্য না দেখে হতাশ হলেও বিস্মিত হইনি। দলীয়করণের মাধ্যমে নিযুক্ত মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বুঝতে পারছেন, সরকার ছাড়া নির্বাচন কমিশন কিংবা অন্য কোনো সংস্থা তাঁদের কিছু করতে পারবে না। তখন অন্যায় হলেও তাঁদের কেউ কেউ হয়ে পড়েন বেপরোয়া। এখানেও তো সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তাঁদের কর্তৃপক্ষকে লেখা যায়। কিন্তু কমিশন তা করছে না।

মাঠের প্রধান বিরোধী দলসহ তাদের সহযোগীরা দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। ইভিএমের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান স্পষ্ট। ইভিএম যে সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা দেয় না, এটা গাইবান্ধায় সুস্পষ্ট হয়েছে। সিইসির ভাষাতেই ‘পেছনের মানুষটি’ ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করে, মেশিন নয়। সে ক্ষেত্রে বহুসংখ্যক রাজনৈতিক দলের বিরোধিতার মুখে কোটি কোটি টাকা খরচ করে কমিশন ইভিএম চালুর জন্য তৎপর হয়েছে কেন, এটা বোধগম্য নয়। সর্বোপরি থাকছে মাঠপর্যায়ের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিরপেক্ষ ও নির্বাচনমুখী করার বিষয়।

দলনিরপেক্ষ সরকার ক্ষমতায় থাকলে এবং কমিশন পক্ষপাতহীন হলে অতীতে বেশ কয়েকটি নির্বাচন হয়েছে গ্রহণযোগ্য মাত্রায়। হতে পারে রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন কমিশনের কাজ নয়। তেমনি প্রধান প্রধান দল ও ভোটার ছাড়া নির্বাচন করাও তাদের কাজ হতে পারে না।

এটা বুঝতে হবে, ব্যক্তির পরিবর্তন ঘটলেও মাঠ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকবে। তারা বারবার দলীয় আবর্তে জড়িয়ে পড়ছে। আর এ থেকে পরিত্রাণ পেলেই দায়িত্ব পালন করেছে সফলভাবে। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান ক্ষমতা গ্রহণের পর তাঁর বেসামরিক ভিত মজবুত করেন প্রশাসনের সাহায্যে। ঠিক সে প্রশাসনই ১৯৭০ সালে সামরিক শাসন চলমান সত্যেও নির্দলীয় সরকারব্যবস্থার সুযোগে একটি সফল নির্বাচন উপহার দিয়েছে জাতিকে। ওই নির্বাচনের ফলাফলই ছিল আমাদের স্বাধীনতা ঘোষণার আইনি ভিত্তি।

বর্তমান নির্বাচন কমিশনকেও তাদের চলার পথ মসৃণ করার জন্য এখন থেকে কাজ শুরু করতে হবে। নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা সম্পর্কে একটি পরীক্ষিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাদ দেওয়া হয়েছে।

সে ধরনের কোনো কিছু করতে না পারলে মাঠ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্বাচনমুখী হবে না। গাইবান্ধা নিয়ে শেষ কথা নয়। এটি অতি ছোট একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তবে নজর খুলে দেওয়ার মতো। একে ভিত্তি ধরে কমিশন সামনের দিকে এগিয়ে যাবে—এ প্রত্যাশা রইল। তাদের সদিচ্ছা ও সক্ষমতার দেখা এখনো অনেক বাকি।

আলী ইমাম মজুমদার সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব

[email protected]