বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের ভাগ্য যখন ছাত্রের হাতের মুঠোয়

গত তিন দশকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় ব্যাপক রূপান্তর ঘটিয়েছে। তারা উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকার বিস্তৃত করেছে, শিক্ষকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। এ জন্য তাদের স্বীকৃতি প্রাপ্য।

তবু এই সাফল্যের আড়ালে রয়েছে একটি ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ, যা নিয়ে খুব কম মানুষই খোলাখুলি আলোচনা করতে চান: উচ্চশিক্ষার ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিকীকরণ এবং শিক্ষার মানের ও শিক্ষকের স্বাধীনতার ওপর তার প্রভাব।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রীয় অংশীজন। তাঁদের মতামত গুরুত্বপূর্ণ এবং শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যৌক্তিক অভিযোগ সব সময় গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা উচিত। একইভাবে, পেশাগত আচরণ বজায় রাখা, মানসম্মত পাঠদান করা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি ন্যায্য আচরণ করার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের জবাবদিহি থাকতে হবে। তবে জবাবদিহি এমন একপক্ষীয় প্রক্রিয়ায় পরিণত হওয়া উচিত নয়, যেখানে কেবল এক পক্ষের কণ্ঠই শোনা হয়।

আরও পড়ুন

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্থিক শক্তি শিক্ষার্থীর ভর্তি ও টিউশন ফি আয়ের ওপর নির্ভর করে। এই বাস্তবতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শিক্ষার মানের চেয়ে শিক্ষার্থীর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রণোদনা তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীদের যখন ক্রেতা হিসেবে দেখা হয়, তখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধীরে ধীরে একাডেমিক উৎকর্ষ সাধনের বদলে ক্রেতার সন্তুষ্টি বজায় রাখার দিকে ঝুঁকে পড়ে।

এই পরিবর্তনের একটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো একাডেমিক স্বাধীনতা। অনেক শিক্ষক ক্রমেই কঠোর একাডেমিক মান প্রয়োগে অনীহা বোধ করছেন। দুর্বল পারফরম্যান্সের জন্য কম নম্বর দেওয়া, অযৌক্তিক উপস্থিতির অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা, বা কঠোর পরীক্ষার মান বজায় রাখার মতো ঘটনাগুলো শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয় হয় ওঠে।

এ সব অভিযোগ ডেকে আনতে পারে শিক্ষকের বেদনাদায়ক পরিণতি—তাঁদের চুক্তি নবায়ন বা পদোন্নতি ব্যাহত হতে পারে, এমনকি পেশাগত ভবিষ্যৎ থেমে যেতে পারে। ফলে গ্রেড ইনফ্লেশন (কৃত্রিমভাবে ভালো নাম্বার দিয়ে গ্রেড উন্নয়ন) এবং একাডেমিক কঠোরতা হ্রাসের দিকে নীরব চাপ তৈরি হয়, যাতে পুরো শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে থাকে।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের হতে হলে ভালো শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে, কিন্তু ভালো শিক্ষক, মন্দ শিক্ষক—এর যথার্থ মানদণ্ড কী? ভালো শিক্ষক নির্ধারণ করতে শুধু শিক্ষার্থী মূল্যায়ন বা কাঙ্ক্ষিত গ্রেডবঞ্চিত ছাত্রের অভিযোগ নয়, শিক্ষকের শিক্ষাদানে অনুপ্রাণিত, ঋদ্ধ ছাত্রের প্রশংসাপত্রও বিবেচনায় নিতে হবে। নিতে হবে শিক্ষকের শিক্ষার প্রতি নিষ্ঠা, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, উঁচু মানের গবেষণাপত্রের প্রকাশনাও।

গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষার্থী মূল্যায়ন মূল্যবান হলেও, তা পাঠদানের কার্যকারিতা পরিমাপের একমাত্র মানদণ্ড হলে শিক্ষক নিজেকে অনিরাপদ ভাবেন এবং স্বাধীনভাবে শিক্ষাদান করতে পারেন না।

কারণ, শিক্ষার্থীরা প্রায়ই এমন শিক্ষকদের বেশি মূল্যায়ন করে যাঁরা উদারভাবে নম্বর দেন বা যাঁরা কম একাডেমিক চাপ দেন। অন্যদিকে কঠোর শিক্ষকেরা গভীরতর শিক্ষণকে উৎসাহিত করলেও কম রেটিং পেয়ে থাকেন। ফলে শিক্ষার্থী মূল্যায়নের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা জনপ্রিয়তাকে পুরস্কৃত করার ঝুঁকি তৈরি করে, আর শিক্ষাদানগত উৎকর্ষ ঢাকা পড়ে।

সাম্প্রতিক কালের একটি প্রবণতা হলো, ছাত্ররা নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে ফেসবুক পেজ তৈরি করে সেখানে শিক্ষক সম্পর্কে মতামত লেখেন। এগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘ইজি-গোয়িং’ ফ্যাকাল্টি তাঁদের খুব প্রিয়। ‘ইজি-গোয়িং’ ফ্যাকাল্টি বলতে তাঁরা বোঝান যিনি ‘ভালো’ গ্রেড দেন, কোনো কিছুতেই কড়াকড়ি আরোপ করেন না। পক্ষান্তরে, যাঁরা সঠিক গ্রেড দেন এবং সব ক্ষেত্রে কঠোরভাবে নিয়ম মেনে চলেন, তাঁদের নোংরা ভাষায় গালাগালও করা হয়।

আরও পড়ুন

আরেকটি উদ্বেগ হলো শিক্ষকের স্বাধীনতার সংকোচন। উচ্চশিক্ষা কেবল সিলেবাসে তালিকাভুক্ত তথ্য পরিবেশন নয়। কার্যকর পাঠদানের জন্য প্রায়ই কোর্স উপকরণকে সমসাময়িক বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত করা, বিষয় সংশ্লিষ্ট বিখ্যাতদের অবদানের গল্প বলা, আন্তবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করা, সমালোচনামূলক চিন্তাকে উৎসাহিত করা এবং শিক্ষার্থীদের বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে চ্যালেঞ্জ করা প্রয়োজন।

এখন শিক্ষকেরা যদি সংকীর্ণভাবে নির্ধারিত কোর্স–রূপরেখার বাইরে আলোচনা করলে অভিযোগের আশঙ্কায় থাকেন, তবে শ্রেণিকক্ষ বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধানের বদলে কেবল পরীক্ষাকেন্দ্রিক যান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়।

উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য ডিগ্রি প্রদান থেকে বহুদূরে, বহু ওপরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব বিশ্লেষণী চিন্তা, বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতূহল, নৈতিক বিচারবোধ এবং আজীবন শিক্ষাকে বিকশিত করার জন্য। এসব লক্ষ্য কখনো কখনো অস্বস্তি ঘটায় বটে; কিন্তু মনে রাখতে হবে, কঠিন অ্যাসাইনমেন্ট, চ্যালেঞ্জিং পরীক্ষা, সমালোচনামূলক প্রতিক্রিয়া এবং কঠোর মূল্যায়ন শিক্ষার প্রতিবন্ধক নয়—এগুলো শিক্ষার অপরিহার্য উপাদান।

বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি। উচ্চশিক্ষা কি বাজারের নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হবে, যেখানে গ্রাহক সন্তুষ্টিই প্রধান লক্ষ্য? নাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের মৌলিক একাডেমিক মিশন বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে?

শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে থাকাকালীন কতটা সন্তুষ্ট ছিল তার ওপর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে স্নাতক হওয়ার পর দায়িত্বগুলোর কতটা সফলভাবে পালন করল, তার ওপর। তাই একাডেমিক স্বাধীনতা সংরক্ষণ এবং কঠোর মান বজায় রাখা শিক্ষার্থীর সাফল্যের অন্তরায় নয় বরং তার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তিগুলোর অন্যতম।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের হতে হলে ভালো শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে, কিন্তু ভালো শিক্ষক, মন্দ শিক্ষক—এর যথার্থ মানদণ্ড কী? ভালো শিক্ষক নির্ধারণ করতে শুধু শিক্ষার্থী মূল্যায়ন বা কাঙ্ক্ষিত গ্রেডবঞ্চিত ছাত্রের অভিযোগ নয়, শিক্ষকের শিক্ষাদানে অনুপ্রাণিত, ঋদ্ধ ছাত্রের প্রশংসাপত্রও বিবেচনায় নিতে হবে। নিতে হবে শিক্ষকের শিক্ষার প্রতি নিষ্ঠা, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, উঁচু মানের গবেষণাপত্রের প্রকাশনাও।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী মূল্যায়ন বা গ্রেডবঞ্চিত ছাত্রের অভিযোগের নিরিখে ‘মন্দ’ শিক্ষককে দণ্ড দেওয়ার প্রক্রিয়া অন্যায্য। কারণ, সেখানে শিক্ষকের বক্তব্য শোনা হয় না, অভিযোগের চেয়ে বহুগুণ ছাত্রের প্রশংসা আমলে নেওয়া হয় না। এভাবে অনেক ভালো শিক্ষকের নীরব প্রস্থান ঘটে।

  • এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ এবং সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ।

    ই–মেইল: [email protected]

    মতামত লেখকের নিজস্ব