জ্বালানিসংকট: যা কিছু জেনে আমাদের পরিকল্পনা সাজাতে হবে

দেশের একমাত্র সরকারি জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় প্রতিষ্ঠিত হয়ফাইল ছবি: প্রথম আলো

জ্বালানি যেকোনো দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি ও অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ। তবে বাস্তবতা হলো, বিশ্বের প্রতিটি দেশ জ্বালানি সম্পদে সমানভাবে সমৃদ্ধ নয়। সম্পদের মজুতের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের দেশগুলোকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়—জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশ এবং জ্বালানি আমদানিকারক দেশ। স্বাভাবিকভাবেই জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি প্রধান বিবেচ্য বিষয়।

এর অন্যতম কারণ হলো, কোনো দেশ চাইলেই নিজেদের ইচ্ছেমতো বাইরে থেকে জ্বালানি আমদানি করতে পারে না। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি প্রাপ্তির জন্য প্রয়োজন পড়ে সেই দেশের পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা পেট্রোডলার, তেল সংরক্ষণের বিশাল ও মজবুত অবকাঠামো, উন্নত পরিশোধন সক্ষমতা এবং সর্বোপরি সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থার নিরবচ্ছিন্নতা।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলার ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলেই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই সংঘর্ষের পরিণতিতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেল পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বিশ্বের জ্বালানি তেল আমদানিকারক দেশগুলোতে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয় এবং বিশ্বজুড়ে শুরু হয় তেলের চরম অস্থিরতা।

আমাদের যেহেতু কোনো তেলখনি নেই, তাই দেশীয় তরল জ্বালানি দিয়ে সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো সম্ভব হয় না। তাই আমাদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নির্ভরযোগ্য আমদানির উৎস খুঁজতে হবে, যেখান থেকে সময়মতো জ্বালানি পৌঁছানোর নিশ্চয়তা সবচেয়ে বেশি থাকে।

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের বর্তমান চিত্র

বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে প্রাকৃতিক গ্যাসপ্রবণ অঞ্চল। দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাসের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। তবে ব্যাপকতার অর্থে বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো খনিজ তেলের উৎস নেই। গ্যাস উত্তোলনের সময় কিছু পরিমাণ কনডেনসেট বা তরল উপজাত পাওয়া যায়, যা পরবর্তী সময়ে ফ্র্যাকশনেশন বা প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও এলপিজিতে রূপান্তরিত করে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করা হয়ে থাকে।

বাংলাদেশে বর্তমানে মোট ২৯টি গ্যাসক্ষেত্র কার্যকর আছে। যার মধ্যে ২০টি গ্যাসক্ষেত্র থেকে এখন নিয়মিত উৎপাদন হচ্ছে। বাংলাদেশ মূলত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তিনটি কোম্পানি, যথা বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড এবং বাপেক্সের মাধ্যমে এই গ্যাস উত্তোলন করে থাকে।

এর পাশাপাশি বেশ কিছু বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানিও দেশে গ্যাস উত্তোলনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। সরকারি তথ্যমতে, এযাবৎকালে দেশে আবিষ্কৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সর্বমোট মজুত প্রায় ২৮ দশমিক ৭৯ টিসিএফ বা ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ২০ দশমিক ৩৩ টিসিএফ উত্তোলিত হয়েছে এবং মজুত হিসেবে অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ৪৬ টিসিএফ গ্যাস।

বর্তমানে দেশে প্রতিদিন প্রাকৃতিক গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় ৩ দশমিক ৮০ বিসিএফ বা বিলিয়ন কিউবিক ফিট। এই বিপুল চাহিদার বিপরীতে দেশীয় উৎসগুলো থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ দশমিক ৮ বিসিএফ গ্যাস উৎপাদন করা হয় এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে আরও ১ বিসিএফ গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর অর্থ হলো, এখনো আমাদের দৈনিক গড়ে ১ বিসিএফ গ্যাসের বিশাল ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।

তেলের অবস্থা

তেলের ক্ষেত্রে আমরা প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় জ্বালানি মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, ওমান, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানি করে থাকে। এই আমদানির পদ্ধতিটি দুটি ভাগে বিভক্ত। আমরা কিছু পরিমাণ সরাসরি ফিনিশড প্রোডাক্ট এবং বাকিটা ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেল হিসেবে ক্রয় করি। এই ক্রুড অয়েল পরে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে বা ইআরএল এ পরিশোধন করে অকটেন, পেট্রল ও ডিজেল তৈরি করা হয়।

এর বাইরে দেশীয় উৎপাদক সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড দেশের মোট চাহিদার ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ অকটেন, ২৪ থেকে ২৬ শতাংশ পেট্রল, শূন্য দশমিক ১ থেকে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ ডিজেল এবং ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ কেরোসিনের চাহিদা মেটাতে পারে। কিন্তু আমাদের যেহেতু কোনো তেলখনি নেই, তাই দেশীয় তরল জ্বালানি দিয়ে সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো সম্ভব হয় না। তাই আমাদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নির্ভরযোগ্য আমদানির উৎস খুঁজতে হবে, যেখান থেকে সময়মতো জ্বালানি পৌঁছানোর নিশ্চয়তা সবচেয়ে বেশি থাকে।

বাংলাদেশে ৩৫ থেকে ৪৫ দিন চলার মতো বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি সংরক্ষণ ক্ষমতা রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী সংরক্ষণাগার থেকে সারা দেশে তেল সরবরাহ শুরু হলে মজুত কিছুটা কমতে থাকে, আবার নতুন শিপমেন্ট বা চালান পৌঁছালে তা আগের অবস্থায় ফিরে যায়। কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা শুরু হওয়ার কারণে জ্বালানির চালান আটকে যায়। এমন পরিস্থিতিতে দেশের সংরক্ষিত জ্বালানির মজুত কমে মাত্র ১৫ দিন চলার মতো ডিজেল, ১৫ থেকে ১৭ দিন চলার মতো পেট্রল এবং ২৪ দিন চলার মতো অকটেনে নেমে আসে।

আরও পড়ুন

স্বাভাবিকভাবেই এই খবরে জনমনে গভীর উৎকণ্ঠা তৈরি হয় এবং ক্রেতাপর্যায়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত মজুত করার এক অস্বাভাবিক প্রবণতা দেখা যায়। এর মধ্যেও কিছু মানুষ সাধারণ জনগণকে ভুল বুঝিয়ে গুজব ছড়ানোর অপচেষ্টা করে এবং কিছু অসাধু সিন্ডিকেট অতিরিক্ত মুনাফার লোভে অবৈধ মজুত গড়তে সক্রিয় হয়ে ওঠে। মনে রাখা জরুরি, তেল সরবরাহ একটি প্রবহমান প্রক্রিয়া।

গুদামের মজুত কমা মানেই চূড়ান্ত সংকট নয়, কারণ একটি চালান দেশের পথে থাকার সময়েই বিদ্যমান মজুত দিয়ে কাজ চালানো হয়। মূলত বিপণন এবং সরবরাহ ব্যবস্থার কারিগরি দিক সম্পর্কে সাধারণ জনগণের পরিষ্কার ধারণা না থাকার ফলেই বৈশ্বিক সংকটের খবরের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁরা দেশের ভেতরে অনাকাঙ্ক্ষিত আতঙ্কে ভোগেন।

আরও পড়ুন

ভবিষ্যতের জন্য করণীয়

প্রথমত, অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে দেশের সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি বা আইইএ–এর মতানুসারে, ন্যূনতম ৯০ দিনের তেল সংরক্ষণের সক্ষমতা থাকাকে নিরাপদ মাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেখানে আমাদের মজুত মাত্র ৩৫ থেকে ৪৫ দিনের। ভবিষ্যতের বিপদে দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে অবিলম্বে জ্বালানি মজুত ও সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।

দুই, আমাদের বিকল্প উৎসের সন্ধান করতে হবে। তেল সরবরাহে যেন ব্যাঘাত না ঘটে, তাই আমদানির ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, রাশিয়া ও কাজাখস্তান থেকে তেল আমদানির যৌক্তিক সম্ভাব্যতা দ্রুত যাচাই এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি গ্রহণ করা প্রয়োজন।

তিন, আমদানির পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও খননে বিপুল বিনিয়োগ করতে হবে। পুরোনো যেসব কূপের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে বা কমে গেছে, সেগুলো দ্রুত ওয়ার্কওভার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুনরায় চালু করতে হবে। একই সঙ্গে অফশোর বা সমুদ্রে তেল–গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া আবশ্যক। ভোলার গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদিত গ্যাস দেশের মূল সঞ্চালন লাইনে যুক্ত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাপেক্সকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে দেশীয় উত্তোলন সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে হবে।

চার, ভূতাত্ত্বিক তথ্যমতে, দেশের মজুত থাকা কয়লার পরিমাণ প্রায় ১৮৮ টিসিএফ গ্যাসের সমান। কিন্তু অত্যন্ত হতাশার কথা হলো, দেশে পাঁচটি আবিষ্কৃত কয়লাখনি থাকা সত্ত্বেও মাত্র একটি থেকে এখন কয়লা উত্তোলন করা হয়। দেশে নিজস্ব সম্পদ ফেলে রেখে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে বাইরে থেকে আমদানি করা কয়লায় পাওয়ার প্ল্যান্ট চলছে। এই মানসিকতা পরিবর্তন করে দ্রুত দেশজ কয়লার সঠিক উত্তোলনে মনোযোগী হতে হবে।

পাঁচ, সংকট মেটানোর স্থায়ী সমাধান নিশ্চিতে একাডেমিয়া তথা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও এই খাতের বিশেষজ্ঞদের একসঙ্গে বসে নিবিড় গবেষণায় নিযুক্ত হতে হবে। সব পক্ষের যুক্তিসংগত আলোচনা এবং চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে টেকসই জ্বালানিনিরাপত্তায় একটি বাস্তবভিত্তিক রোডম্যাপ তৈরি করা হলে আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার পথে আর কোনো বড় বাধাই থাকবে না।

  • ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম; আবু সাঈম বিশ্বাস; মো. মিজানুর রহমান; নাদিয়া মাহজাবিন; আকিফ হোসেন খান; অমিত দাশ; বিনতুন জামান; মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম; মো. রাসেল রানা এবং শ্রাবনী তালুকদার। তাঁরা সবাই চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযু্িক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক।

    মতামত লেখকদের নিজস্ব