খসড়া শিক্ষা আইন, ২০২৬: সম্ভাবনার সূচনা, পরিপূর্ণতার অপেক্ষা

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে নানা স্তরে বিভক্ত, নীতিগতভাবে অসংলগ্ন ও আইনি দিক থেকে খণ্ডিত। প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক শিক্ষা, মাদ্রাসা, কারিগরি ও উচ্চশিক্ষা—প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদা আইন ও বিধিমালার মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে। এ বাস্তবতায় খসড়া শিক্ষা আইন, ২০২৬ একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী উদ্যোগ হিসেবে সামনে এসেছে। প্রথমবারের মতো পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত আইনি কাঠামোর আওতায় আনার চেষ্টা এই খসড়ার বড় শক্তি। একে শিক্ষানীতির দীর্ঘদিনের শূন্যতা পূরণের প্রয়াস বলা যায়। তবে এটিও স্বীকার করতে হবে, এই উদ্যোগ এখনো পরিপূর্ণতার পথে।

কেন এই আইন প্রয়োজন

শিক্ষা কেবল প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও সামাজিক বিনিয়োগ। বাস্তবে বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পরিপত্র বা সাময়িক নির্দেশনার মাধ্যমে নেওয়া হয়, যার ফলে জবাবদিহি ও ধারাবাহিকতা দুর্বল হয়ে পড়ে। একটি পূর্ণাঙ্গ আইন সেই বিচ্ছিন্নতাকে কমাতে পারে। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার বিষয়টি আইনি কাঠামোয় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হওয়া ইতিবাচক। তবে অবৈতনিক ঘোষণার পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা, গোপন ব্যয় রোধ করা ও সব অঞ্চলে সমান সুযোগ সৃষ্টি করা—এসবও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষা: অধিকার না সেবা?

সংবিধানে শিক্ষা মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু খসড়া আইনের ভাষা অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাকে রাষ্ট্র প্রদত্ত সেবা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। অধিকারভিত্তিক কাঠামো শক্তিশালী হলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের দাবিদাওয়া আইনি ভিত্তি পায়। এ জায়গাটি আরও সুস্পষ্ট করা গেলে আইনটি অধিক শক্তিশালী হতে পারত।

শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের কণ্ঠ

আইনটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নির্ধারণে সচেতন হলেও শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অংশগ্রহণমূলক ভূমিকা তুলনামূলকভাবে সীমিত। শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান অংশীজন হিসেবে তাঁদের মতামত, প্রতিনিধি কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ আইনে আরও দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন ছিল।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা

খসড়া আইনে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হয়েছে। প্রাথমিক স্তরে শিশুদের মৌলিক সাক্ষরতা ও জীবনমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করার দিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তবে মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ, পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও পাঠ্যক্রমের মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের জন্য কেবল পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষার পরিবর্তে সৃজনশীলতা, দক্ষতা উন্নয়ন ও শেখার আনন্দের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা যেতে পারত। স্কুল পর্যায়ে শিক্ষকের প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রম পুনর্গঠন ও মান যাচাই—এসব যদি আইনের আওতায় আসে, তাহলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মান দৃঢ়ভাবে উন্নত হবে।

এমপিওভুক্তি

বেসরকারি স্কুল ও কলেজের জন্য এমপিওভুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক প্রভাব ও অস্বচ্ছতার অভিযোগ আছে।

আইনে নিরীক্ষা, তথ্যভান্ডার ও মান নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিয়ে এমপিওকে স্বচ্ছ ও নিয়মভিত্তিক করা সম্ভব। শর্তগুলো—

• শিক্ষক–শিক্ষার্থী অনুপাত, ফলাফল, অবকাঠামো ও আর্থিক স্বচ্ছতার মানদণ্ড।

• ডিজিটাল ডেটাবেজ ও স্বচ্ছ মূল্যায়ন।

• শিক্ষকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থী

অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা কেবল নীতিগত ঘোষণা নয়, বাস্তব প্রস্তুতির বিষয়। অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, সহায়ক প্রযুক্তি ও পৃথক বাজেট বরাদ্দ ছাড়া অন্তর্ভুক্তি বাস্তবায়ন কঠিন। শিক্ষা যদি সবার জন্য হয়, তবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের মর্যাদাপূর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা আবশ্যক।

মাদ্রাসা শিক্ষা

মাদ্রাসা শিক্ষা দেশের একটি বাস্তব ও ঐতিহাসিক অংশ। খসড়ায় আলিয়া ধারার সঙ্গে মূলধারার সমন্বয়ের ইঙ্গিত থাকলেও মানোন্নয়ন ও সনদের সামঞ্জস্যের প্রশ্নে আরও সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রয়োজন। কওমি ধারার ক্ষেত্রেও স্বীকৃতি ও দক্ষতা সংযোগের বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক আলোচনা জরুরি। সমন্বিত কাঠামো ছাড়া শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের পথ সীমিত হতে পারে।

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (টিভিইটি)

বাংলাদেশে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ জোরদার করা প্রয়োজন। শিল্প খাতের সঙ্গে সমন্বিত পাঠ্যক্রম, প্রশিক্ষণের মান যাচাই ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি—এসব ক্ষেত্রে আইনি দিকনির্দেশনা আরও শক্তিশালী হতে পারত। বিদ্যালয় স্তর থেকেই নমনীয় কারিগরি ধারায় প্রবেশের সুযোগ তৈরি হলে কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

উচ্চশিক্ষা ও প্রশাসনিক ভারসাম্য

মান নিয়ন্ত্রণ ও নিরীক্ষার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজনীয় হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও গবেষণার স্বাধীনতা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ সৃজনশীলতা ও একাডেমিক স্বাধীনতায় প্রভাব ফেলতে পারে। ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো এখানে অপরিহার্য।

শিক্ষা–বাণিজ্য ও মান নিয়ন্ত্রণ

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যত্রতত্র স্কুল স্থাপন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই বিভাগ খোলা, অতিরিক্ত টিউশন ফি নির্ধারণ—এসব নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। শিক্ষা একটি সামাজিক দায়িত্ব হলেও বাস্তবে তা অনেক ক্ষেত্রে বাজারনির্ভর প্রবণতার দিকে যাচ্ছে। খসড়া আইনে মান নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে, তবে শিক্ষা–বাণিজ্য রোধে স্বচ্ছ অনুমোদনের প্রক্রিয়া, ফি নির্ধারণে নীতিমালা ও নিয়মিত মূল্যায়ন কাঠামো আরও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। শিক্ষা যদি বিনিয়োগ হয়, তবে সেটি কেবল আর্থিক নয়—নৈতিক ও সামাজিক বিনিয়োগও।

বড় চ্যালেঞ্জ

আইন প্রণয়ন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার কার্যকর বাস্তবায়ন ততটাই জটিল। সাফল্য নির্ভর করছে মূলত:

• দীর্ঘ মেয়াদে রাজনৈতিক অঙ্গীকার বজায় রাখার ওপর।

• অতিরিক্ত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ কেন্দ্রীয়কৃত হয়ে যেতে পারে।

• শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের মতামত ও অংশগ্রহণ না থাকলে সমন্বিত পরিবেশ গড়ে তোলা কঠিন হয়।

ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, শিক্ষা প্রযুক্তি, অনলাইন শিক্ষা ও জীবনব্যাপী শিক্ষার বিষয়গুলো এখন অপরিহার্য। খসড়া আইনে এসব বিষয় সীমিতভাবে এসেছে। ভবিষ্যৎমুখী দক্ষতা উন্নয়ন আইনের কেন্দ্রে থাকা প্রয়োজন।

সংসদে পাস ও পরবর্তী পথ

আইন পাস হলে বা নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে বাস্তবায়ন শুরু হলে এটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে বিধিমালা, বাজেট বরাদ্দ ও অংশগ্রহণমূলক প্রয়োগ ছাড়া সাফল্য নিশ্চিত নয়।

শেষ কথা

খসড়া শিক্ষা আইন, ২০২৬ একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। এতে সমন্বয়ের চেষ্টা আছে, কাঠামো আছে, ভবিষ্যতের ইঙ্গিতও আছে। তবে শিক্ষাকে আরও স্পষ্টভাবে অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা, শিক্ষা–বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা, এমপিও প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা জোরদার করা, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের মান উন্নয়ন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর সুযোগ বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎমুখী দক্ষতা সংযোজন—এসব করলে এটি সত্যিকার অর্থে পরিপূর্ণ ও টেকসই হবে। পরিমার্জনের মধ্য দিয়ে এটি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি মানবিক, অংশগ্রহণমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী আইনি ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

  • ড. সাব্বির আহমেদ চৌধুরী সহকারী অধ্যাপক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ই–মেইল: [email protected]

*মতামত লেখকের নিজস্ব