মোস্তাফিজ ইস্যু: বৃথা চেষ্টা, জয়শঙ্করকে নতুন করে শুরু করতে হবে

বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে জয়শঙ্করকে ঢাকা পাঠানোর সিদ্ধান্তটা ছিল তাৎপর্যপূর্ণছবি: রয়টার্স

ঠিক যখন মনে হচ্ছিল, দেড় বছরের টানাপোড়েনের পর ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের স্লেটরঙা আকাশটা একটু ফরসা হচ্ছে, ঠিক তখনই মোস্তাফিজুর রহমানকে নিয়ে ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের (বিসিসিআই) অবাক সিদ্ধান্ত সবকিছু ঘেঁটে দিল। সম্পর্কের উন্নতির উদ্যোগ একধাক্কায় এক শ কদম পিছিয়ে গেল।

ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ ঠিক করেছে, ভারতে তারা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে যাবে না। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলকে (আইসিসি) অনুরোধ করেছে তাদের খেলাগুলো শ্রীলঙ্কায় দিতে। বাংলাদেশ অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টাকে অনুরোধ করেছেন, দেশে আইপিএলের সম্প্রচার যেন বন্ধ করে দেওয়া হয়। এবং ইতিমধ্যে তা কার্যকরও হয়েছে। বেশ বোঝা যাচ্ছে, বিসিসিআইয়ের সিদ্ধান্তে শুধু মোস্তাফিজ নন, আপামর বাংলাদেশ অপমানিত ও অসম্মানিত বোধ করছে।

বড় জানতে ইচ্ছা করছে, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এখন হতাশ হয়ে কপাল চাপড়াচ্ছেন কি না।

ইচ্ছাটা অবান্তর নয়। কেননা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে জয়শঙ্করকে ঢাকা পাঠানোর সিদ্ধান্তটা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। কাউকে পাঠানো বাধ্যতামূলক ছিল না। অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ কাউকেও পাঠানো যেত। কিন্তু পাঠানো হলো পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে। শুধু তা-ই নয়, তাঁর হাত দিয়ে তারেক রহমানকে চিঠিও পাঠালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেই চিঠিতে তিনি বেগম জিয়ার সঙ্গে ব্যক্তিগত সাক্ষাতের উল্লেখ করেছেন, গণতন্ত্র ও দেশবাসীর জন্য শ্রদ্ধাবনত হয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব ও ভূমিকার প্রশংসা করেছেন, এবং আশা প্রকাশ করেছেন, প্রয়াত নেত্রীর আদর্শ মেনে বিএনপি এগিয়ে যাবে। তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি ভরসা রেখে এই আশাও প্রকাশ করেছেন, দুই দেশের গভীর ও ঐতিহাসিক অংশীদারত্ব গভীরতর হবে।

তারেক রহমানের হাতে চিঠি তুলে দেওয়া ছাড়াও তাঁর সঙ্গে জয়শঙ্কর কুড়ি মিনিট কথা বলেছেন। আগামী দিনে নতুন সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে একসঙ্গে পথচলার ইঙ্গিত দিয়েছেন। বার্তা যে ইতিবাচক, বাংলাদেশও তা বুঝেছে।

সংক্ষিপ্ত সফরের এই ‘ইতিবাচক স্পন্দনের’ প্রতিফলন দেখা গেল সফরের পরেও। তামিলনাড়ুতে আইআইটি মাদ্রাজের এক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে করা প্রশ্নের উত্তরে জয়শঙ্কর বলেন, নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশকে তিনি শুভেচ্ছা জানিয়ে এসেছেন। ভারতের আশা, ভোটের পর পরিস্থিতি থিতু হলে সুপ্রতিবেশীসুলভ চেতনা বৃদ্ধি পাবে। পাকিস্তানকে নিয়ে সমালোচনার ঝাঁপি খুললেও ওই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ নিয়ে একটিও অসমীচীন মন্তব্য জয়শঙ্কর করেননি।

একই সময় ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে শোকবইয়ে সই করেন। সেটাও ছিল ভারতের দিক থেকে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে এগিয়ে যাওয়ার আরও এক স্পষ্ট ও ইতিবাচক ইঙ্গিত। ভারত বোঝাতে চেয়েছে, প্রতীক্ষা স্রেফ নির্বাচনের।

মোটকথা, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিদ্বেষপূর্ণ বাতাবরণে অনেক দিন পর ইতিবাচক মনোভাবের পরশ অনুভূত হচ্ছিল। মৃদুমন্দ বসন্তসমীরণের মতো স্বস্তিদায়ক আবহের একটা চাদর উড়ে এসেছিল। বিসিসিআই একটানে তা সরিয়ে দিল।

ক্রিকেট শুধু খেলা নয়, রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ববিদ সমাজতাত্ত্বিক আশিস নন্দীর কথা ধার করে বলা যায়, ক্রিকেট এই উপমহাদেশের একমাত্র ধর্মনিরপেক্ষ ধর্ম। ক্রিকেট একমাত্র খেলা, যা বিভাজনের বদলে সংযোজন করে। হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয় মেলায়। শশী থারুর বলেছেন, পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশ কিন্তু এ দেশে সন্ত্রাসী পাঠায় না। সুপ্রতিবেশীসুলভ মনোভাবের বার্তাবাহক জয়শঙ্করের কপাল চাপড়ানো ছাড়া উপায় নেই। সম্পর্কের উন্নতিতে কেঁচে গণ্ডূষ তাঁকেই করতে হবে।

বিসিসিআইয়ের সিদ্ধান্তটা কেন অবাক করা, তা বলা দরকার। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় থেকেই ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক মুখ থুবড়ে পড়ে। শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় পাওয়ার পর সম্পর্কটা আরও বিষিয়ে যায়। দেড় বছর ধরে সম্পর্কের এই অবনতির কথা বিসিসিআইও জানত। জানত বলেই ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে ভারতীয় ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফর স্থগিত করেছিল। সব জেনেও বিসিসিআই কিন্তু আইপিএলের নিলামে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ আটকায়নি।

২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার পর ২০০৯ সাল থেকে আইপিএলে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ রয়েছে। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে কিন্তু তারা তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি; বরং মোস্তাফিজ ছাড়া আরও ছয়জন ক্রিকেটারকে এবার নিলামে অংশ নিতে দিয়েছে। কেন দিল? বিসিসিআই কেন আটকাল না? কেন বলেনি পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি ক্রিকেটাররা আইপিএলে কাঙ্ক্ষিত নন?

বাংলাদেশে ‘হিন্দু নিধন ও নির্যাতনের’ অভিযোগ তো দেড় বছর ধরেই ভারত করে আসছে। দেড় বছর ধরেই তো ভারতের শাসক দল বিভিন্ন রাজ্যে ‘হিন্দু নির্যাতনের’ বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। ভারত সরকার বাংলাদেশিদের ঢালাও ভিসা দেওয়াও বন্ধ রেখেছে দেড় বছর। দুই দেশের কূটনৈতিক বিবৃতিও চলছে বিরামহীন। বিসিসিআইয়ের এত দিন কেন মনে হয়নি আইপিএলে বাংলাদেশিরা খেলতে এলে পরিস্থিতি ঘোরালো হবে? সাবেক বিজেপি বিধায়ক সংগীত সোম বা শিবসেনার সঞ্জয় নিরুপমদের মতো কারও কারও হুমকির পরে কেন বোধোদয়?

মোস্তাফিজুর রহমান
প্রথম আলো

বিস্ময় আরও এই কারণে যে পাকিস্তানের সঙ্গে ক্রিকেট খেলা বন্ধ করতে একদা বিজেপি তার সবচেয়ে পুরোনো শরিক শিবসেনার প্রতিষ্ঠাতা বাল ঠাকরের হুমকিকেও আমল দেয়নি। ১৯৯৯ সালে শিব সৈনিকেরা দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা মাঠের ক্রিকেট পিচ খুঁড়ে দিয়েছিল। ২০১২ সালের শেষাশেষি পাকিস্তানি ক্রিকেট দলের ভারত সফর বন্ধের চেষ্টাও বাল ঠাকরে করেছিলেন। দলের মুখপত্র সামনায় দুই দেশের সিরিজ বন্ধের দাবি জানিয়ে লিখেছিলেন, পাকিস্তান ক্রিকেট দল ভারত সফরে এলে সেটা হবে ‘জাতীয় লজ্জা’। কেন্দ্রীয় সরকার তাঁর দাবি মানেনি। বিজেপিও ঠাকরেকে সমর্থন করেনি। দলের সর্বভারতীয় মুখপাত্র মুখতার আব্বাস নাকভি বলেছিলেন, ‘ক্রিকেট ও রাজনীতি আলাদা থাকা উচিত।’ সবচেয়ে বড় কথা, বিসিসিআই তখন রাজনীতির অংশ হয়নি।

এবার কী দেখা গেল? বাংলাদেশিদের নিলামে অংশ নিতে দেওয়া হলো। মোস্তাফিজকে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপি দিয়ে শাহরুখ খানের দল কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) কিনল। বিসিসিআই টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করেনি! হঠাৎ সংগীত সোমদের মতো দু-একজন নেতার দাবি উঠতে না উঠতেই তারা নড়েচড়ে বসল এবং মোস্তাফিজকে নিয়ে তাদের আদেশ শিরোধার্য করল কেকেআর! মনে হতেই পারে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নীতি নির্ধারণ করছে বিসিসিআই, সাউথ ব্লক নয়!

আরও আশ্চর্যের, এত বড় ঘটনাটা ঘটল, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন করে অন্ধ কূপে নিমজ্জিত হলো, কেন্দ্রীয় সরকার কিন্তু এখনো মন্তব্যহীন! এ থেকে দুটি বিষয় মনে হতে পারে। এক. প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকার কোনো ভূমিকা নেয় না। স্বশাসিত সংস্থাকে তার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলতে দেয়। ক্রিকেট প্রশাসনকে চলতে দেয় তার মর্জিমতো; যেন বিসিসিআইয়ের সিদ্ধান্ত একান্তই তার নিজস্ব। দায়ও তার, সরকারের নয়। দুই. বিসিসিআইয়ের সিদ্ধান্ত সরকারের ইশারাতেই। ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের নেতৃত্বে রয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পুত্র। এত বড় একটা সিদ্ধান্ত দিল্লির অগোচরে নেওয়া হচ্ছে, ভাবা কঠিন। বিশেষত যখন সাবেক ক্রিকেটার মদনলালের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে এমন কেউ নেই, যিনি বোর্ডকে প্রশ্ন করতে পারেন।

আরও পড়ুন

শেখ হাসিনার পতনের অন্যতম বড় কারণ পুঞ্জীভূত ভারতবিদ্বেষ। দেড় বছর ধরে নানাভাবে সেই বিদ্বেষের রূপ প্রকট হয়েছে। কমার বদলে বেড়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসিফ নজরুলের বয়ান লক্ষণীয়, ‘উই ওন্ট স্ট্যান্ড ফর অ্যানি ইনসাল্ট টু বাংলাদেশেস ক্রিকেট, ক্রিকেটার্স অ্যান্ড দ্য কান্ট্রি। দ্য ডেজ অব স্লেভারি আর ওভার।’ বিসিসিআইয়ের সিদ্ধান্ত ভারতবিদ্বেষের আগুনে ঘৃতাহুতির শামিল।

ক্রিকেট শুধু খেলা নয়, রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ববিদ সমাজতাত্ত্বিক আশিস নন্দীর কথা ধার করে বলা যায়, ক্রিকেট এই উপমহাদেশের একমাত্র ধর্মনিরপেক্ষ ধর্ম। ক্রিকেট একমাত্র খেলা, যা বিভাজনের বদলে সংযোজন করে। হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয় মেলায়। শশী থারুর বলেছেন, পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশ কিন্তু এ দেশে সন্ত্রাসী পাঠায় না। সুপ্রতিবেশীসুলভ মনোভাবের বার্তাবাহক জয়শঙ্করের কপাল চাপড়ানো ছাড়া উপায় নেই। সম্পর্কের উন্নতিতে কেঁচে গণ্ডূষ তাঁকেই করতে হবে।

  • সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি

    মতামত লেখকের নিজস্ব