মৌসুমি ধারা বদলে যাচ্ছে ডেঙ্গুর, এখন কী করা জরুরি

মশার লার্ভা ধ্বংস করতে স্প্রে করা হচ্ছে। পূর্ব গির্জাপাড়া, মৌলভীবাজার।ছবি: প্রথম আলো

বাংলাদেশে ডেঙ্গু জ্বর আবারও জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। এডিস এজিপ্টাই ও এডিস অ্যালবোপিক্টাস প্রজাতির মশার মাধ্যমে ছড়ানো এই ভাইরাসজনিত রোগ একসময় মৌসুমি সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এর প্রকৃতি বদলে গেছে। এখন ডেঙ্গু শুধু বর্ষাকালের রোগ নয়; বরং বছরজুড়েই সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। ফলে এটিকে আর সাময়িক সংকট হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখতে হবে।

ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বর্ষা মৌসুমে—বিশেষ করে জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত। বৃষ্টির পানিতে জমে থাকা ছোট ছোট জলাধার এডিস মশার প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন, অস্বাভাবিক আবহাওয়া, দীর্ঘ উষ্ণ সময়কাল ও দ্রুত নগরায়ণের কারণে ডেঙ্গুর মৌসুমি ধারা বদলে যাচ্ছে। এখন সংক্রমণ আগেভাগে শুরু হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে আবারও বড় ধরনের ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। ওই বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১ লাখ ২ হাজার ৫৬২ জন আক্রান্ত এবং ৪১২ জনের মৃত্যুর তথ্য রেকর্ড করা হয়। এর আগের বছরগুলোতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক ছিল। ২০২৪ সালে এক লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয় এবং ৫৭৫ জনের মৃত্যু ঘটে। আর ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন আক্রান্ত এবং ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৫ সালের শেষ দিকে সংক্রমণ আবার দ্রুত বাড়তে দেখা যায়। ২০২৬ সালের শুরুতে সংক্রমণ তুলনামূলক কমলেও এটি পুরোপুরি থেমে যায়নি; এখনো প্রতিদিন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।

ডেঙ্গু মোকাবিলায় উচ্চপর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। একটি জাতীয় পর্যায়ের সমন্বয় কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যেখানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ, গবেষক ও বেসরকারি সংস্থাগুলো একসঙ্গে কাজ করবে।

ডেঙ্গুর কেস ফ্যাটালিটি রেট বা মৃত্যুহার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওঠানামা করছে। ২০২৩ সালে এটি ছিল প্রায় ০.৫৩ শতাংশ, ২০২৪ সালে প্রায় ০.৫৭ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে প্রায় ০.৪০ শতাংশ। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কখনো কখনো নারীদের মধ্যে মৃত্যুহার তুলনামূলক বেশি। এ ছাড়া ৬০ বছরের বেশি বয়স্ক মানুষ এবং ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে মৃত্যুঝুঁকি বেশি থাকে। চিকিৎসা নিতে দেরি করা, সহ-বিদ্যমান রোগ (কো–মরবিডিটিস) ও ভাইরাসের বিভিন্ন সেরোটাইপের প্রভাব—এসব কারণ মৃত্যুহার বাড়াতে ভূমিকা রাখে।

একসময় ডেঙ্গু প্রধানত ঢাকাকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। বর্তমানে দেশের প্রায় সব জেলাতেই ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল ও খুলনা ঐতিহাসিকভাবে বেশি আক্রান্ত এলাকা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে মানিকগঞ্জ, পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় সংক্রমণ বেশি দেখা গেলেও অনেক বছরই বরিশাল বিভাগ আক্রান্তের তালিকায় শীর্ষে থাকে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও সমন্বিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম

সাম্প্রতিক ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শহরগুলোতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যাপক পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদার করতে সরকারি কর্মকর্তা, সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য—নগর এলাকায় জমে থাকা পানি অপসারণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা ও মশার প্রজননস্থল পুরোপুরি ধ্বংস করা। ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ জনগণের সম্মিলিত লড়াই কার্যকর ফল দিতে পারে। শহর পরিষ্কার রাখা ও মশার বংশবিস্তারস্থল ধ্বংসে সবার ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপই এখন সবচেয়ে জরুরি।

কী করা জরুরি

ডেঙ্গু মোকাবিলায় দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। প্রাদুর্ভাবের সময় হাসপাতালে অতিরিক্ত রোগীর চাপ তৈরি হয়, অনেক রোগী দেরিতে হাসপাতালে আসে—ফলে কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। পাশাপাশি পর্যাপ্ত নজরদারি, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা ও গুরুতর রোগীর জন্য আইসিইউ সুবিধার সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।

মশা নিয়ন্ত্রণেও রয়েছে নানা সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে ফগিং কার্যক্রম মৌসুমি ও অনিয়মিত। একই সঙ্গে কীটনাশকের প্রতি মশার প্রতিরোধক্ষমতা বেড়ে যাওয়া, জমে থাকা পানির উৎস যথাযথভাবে অপসারণ না করা ও প্রশিক্ষিত এন্টোমোলজিস্টের অভাব পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।

ডেঙ্গু মোকাবিলায় একটি বড় দুর্বলতা হলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রোগ নজরদারি ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকলেও মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব মূলত স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে। বাস্তবে এই দুই ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় অনেক সময়ই দুর্বল থাকে। ফলে দায়িত্বের ওভারল্যাপ ও জবাবদিহির ঘাটতি তৈরি হয়।

ডেঙ্গু মোকাবিলায় উচ্চপর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। একটি জাতীয় পর্যায়ের সমন্বয় কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যেখানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ, গবেষক ও বেসরকারি সংস্থাগুলো একসঙ্গে কাজ করবে। এর পাশাপাশি দরকার দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত ভেক্টর ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা। সারা বছর মশার নজরদারি, লার্ভা উৎস ধ্বংস, কীটনাশক প্রতিরোধ পরীক্ষা, কমিউনিটিভিত্তিক কর্মসূচি ও নতুন প্রযুক্তি—যেমন ওলবাকিয়া বা সম্ভাব্য ভ্যাকসিন—নিয়ে গবেষণা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে জনগণের সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি পরিষ্কার রাখা, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা ও মশা প্রতিরোধী ব্যবস্থা ব্যবহার—এসব বিষয়েও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

  • ড. এ এস এম আলমগীর ভাইরোলজিস্ট ও জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ, সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)