রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রবাদ পুরুষ ও রাজনৈতিক অর্থনীতির গুরু হ্যারল্ড লাস্কি প্রথম জীবনে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধাচরণ না করলেও শেষ জীবনে মার্ক্সবাদে দীক্ষা নেন। কারণ, তিনি উপলব্ধি করেন, কমিউনিস্ট ব্যবস্থা ছাড়া মানবজাতির মুক্তি নেই। উল্লেখ্য, অনেক মানুষই প্রথম জীবনে একটি সমতাভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন দেখেন এবং মার্ক্সবাদ চর্চা করেন, কিন্তু শেষ জীবনে ধর্মের কাছে, অর্থের কাছে নতি স্বীকার করেন। হ্যারল্ড লাস্কির জীবনে ঘটেছে ঠিক উল্টোটি।

বিখ্যাত ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক গ্রাহাম গ্রিন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হয়েছিলেন, কিউবার বিপ্লবে ফিদেল কাস্ত্রোকে সহায়তা করেছিলেন। বিংশ শতাব্দীর সাড়া জাগানো লেখক-দার্শনিক জ্যঁ পল সার্তে ও কবি পাবলো নেরুদা সারা জীবনই কমিউনিস্ট আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। বার্ট্রান্ড রাসেল তাঁর আত্মজীবনীর মুখবন্ধে তিনটি প্রেষণার কথা উল্লেখ করেছিলেন। এর মধ্যে একটা হলো, বিপন্ন মানবতার প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা। সম্ভবত সে কারণেই তিনি নিজেকে সমাজতন্ত্রী ভাবতেন এবং ব্রিটিশ লেবার পার্টির প্রতিনিধি হয়ে ১৯২০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভ্রমণ করেন সমাজতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে।

পুঁজিতন্ত্রে এক্সপ্লয়টেশন তথা বঞ্চনাই যে উৎপাদন ক্ষমতার ভিত্তি এবং একটি সমতাভিত্তিক সমাজ যে পুঁজিতন্ত্রে সম্ভব নয়, তা উল্লেখিত সব কজন পণ্ডিতেরই ভাষ্য।

রুশ বিপ্লবের পর থেকে বিশ্ব কার্যত দুই মেরুতে ভাগ হয়ে যায় এবং শুরু হয় ঠান্ডা যুদ্ধ। এক মেরুর নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য মেরুর নেতৃত্বে তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন। ৯০-এ সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পর এবং রাশিয়া একটি পুঁজিবাদী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশের পরও যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়াকে শত্রু হিসেবে গণ্য করে। এর প্রমাণ ন্যাটোর অস্তিত্ব এবং রাশিয়াকে ন্যাটোর সদস্য হতে না দেওয়া। এক কথায়, ন্যাটোর ক্রম–সম্প্রসারণই ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণ, যা বিশ্বরাজনীতিতে বিরাজমান বিভাজন স্পষ্ট হয়ে দেখা দিচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতিতেও দেখা দিচ্ছে গভীর ও ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব।

যুক্তরাষ্ট্র চায় না আরেকটি মেরু তৈরি হোক। আরেকটি মেরু তৈরি হলে, সেই মেরুভুক্ত রাষ্ট্রগুলো বিকশিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের মোড়লগিরিতে ধাক্কা লাগে, পণ্য বিক্রির সম্ভাবনা কমে যায়, অন্য দেশ থেকে খণিজসম্পদ আহরণ বাধাগ্রস্ত হয়। ভ্লাদিমির পুতিন কমিউনিস্ট নন এবং তিনি একটা পুঁজিবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বর্তমান রাশিয়াকে ন্যাটোর সদস্য হওয়ার জন্য একাধিকবার আবেদন করেও ব্যর্থ হয়েছেন, অপমান করা হয়েছে তাঁকে বারবার। বস্তুত, রাশিয়াকে ন্যাটো সদস্য করলে বিশ্বের অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেত, ইউক্রেন যুদ্ধ নামে কোনো যুদ্ধ আর ঘটত না পৃথিবীতে।
মার্কিন আধিপত্যবাদের তিনটা ধরন আপাতত উল্লেখ করি। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ইত্যাদি সংগঠনের মধ্য দিয়ে তারা পুঁজিবাদী ব্যবস্থাপত্র হাতে ধরিয়ে দিয়ে দেশগুলোর ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখে, যাতে তাদের পণ্য বিক্রি অব্যাহত থাকে, বিনিময় ব্যবস্থা ডলারিকরণ করে বিপুল আয়ের পথ করেছে তাদের জন্য আর অ্যাংলোস্ফেয়ার (ইংরেজিভাষী ৫টি রাষ্ট্র—যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা) গঠন করে ভাষার আধিপত্য কায়েম করে অর্থ রোজগারের এক বিশাল উপায় বের করেছে তারা।

চীন-রাশিয়া এই মার্কিন আধিপত্যবাদ ভাঙার চেষ্টা করে যাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকে পশ্চিমারা রাশিয়ার ওপর নজিরবিহীন অবরোধ আরোপ করে চলেছে। এর একটা হলো, সুইফটসহ সব বিনিময়ব্যবস্থা থেকে রাশিয়াকে বাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রাশিয়ার অর্থনীতি ধ্বংস করার, বিশেষ করে ব্যাপক মূল্যস্ফীতির সম্মুখীন হবে রাশিয়া— পশ্চিমাদের এমন আশা পূরণ হয়নি। তেল-গ্যাসসহ অন্য সব পণ্য রুবলে শোধের শর্ত আরোপ করে রাশিয়ার অর্থনীতি খুব ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

রাশিয়া (এসপিএফএস, ডমেস্টিক মির পেমেন্ট কার্ড) ও চীন (সিআইপিএস) বিকল্প বিনিময় বা মূল্য পরিশোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছে। ২০১৯-এর হিসাব অনুযায়ী, বিকল্প এই ব্যবস্থায় বিনিময় এখনো নগণ্য। বিশ্ব বাণিজ্যের ৮৮ ভাগই হয় ডলারের মাধ্যমে। অসংখ্য অনুঘটক এখনো বাধা হয় চীনা ব্যবস্থার জন্য। বিশ্ব বাণিজ্যের মাত্র ৩ শতাংশ হয় ইউয়ানে।

বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্ট ব্যবস্থা বিস্তৃত না হলে একা একটা কমিউনিস্ট রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না—এই তত্ত্ব তাড়িত করেছে তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নকে অন্য দেশে সমাজতন্ত্র ‘রপ্তানি’ করতে। এটা করতে গিয়ে অর্থ, ছাত্রবৃত্তি, বই এবং শিক্ষা দিয়ে দেশে দেশে রাজনৈতিক দল গড়ে তুলেছে, তাদের ক্ষমতায় এনেছে। এরপর রাষ্ট্রটিকে তারা গড়ে তুলেছে স্বনির্ভর। বহু দেশের মুক্তিসংগ্রামে সর্বাত্মক সহায়তা করেছে তারা। বাংলাদেশ এক উজ্জ্বল উদাহরণ। পক্ষান্তরে, যুক্তরাষ্ট্র চায় তার পণ্য বিক্রি করতে। একটা রাষ্ট্র নিজের পায়ে দাঁড়াক, তারা তা চায় না।

পুঁজি পুঁজিপতিকে আরও পুঁজি আহরণে তাড়িত করে। কার্ল মার্ক্সের মতে, এটা পুঁজির ধর্ম। এই ধর্মই নির্ধারণ করে ধনতন্ত্রের অমোঘ বৈশিষ্ট্য: গরিব আরও গরিব হবে, ধনী আরও ধনী হবে। এই পুঁজি আহরণ চলতে থাকবে, যতক্ষণ শ্রম ছাড়া একজন মজুরের বিক্রি করার আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। এই পুঁজি আহরণ ও গরিব আরও গরিব হওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধের জন্য দরকার একটি নয়, দুটি নয়—একটা বহু মেরুর বিশ্ব, একটা ভারসাম্যপূর্ণ পৃথিবী। বহু মেরুর বিশ্ব, একটা ভারসাম্যপূর্ণ পৃথিবী ছাড়া মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা যাবে না।

(সংবিৎ কর্তৃক আয়োজিত ভার্চ্যুয়াল লেকচার সিরিজে লেখকের ‘বর্তমান বিশ্বরাজনীতি’ শীর্ষক বক্তৃতার অংশবিশেষ)

  • ড. এন এন তরুণ রাশিয়ার সাইবেরিয়ান ফেডারেল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির ভিজিটিং প্রফেসর ও সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ। [email protected]