প্রায় সবাই বিজয়ী হয়েছে, এমন এক নির্বাচন

অবিশ্বাস্যভাবে খুব অল্প কিছু মানুষ ছাড়া এই নির্বাচনে জিতেছে প্রায় সবাইছবি: প্রথম আলো

সব জল্পনাকল্পনা, এমনকি গুজবের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনটি হয়ে গেল। প্রাথমিকভাবে বলা যায়, নানা বিবেচনায় নির্বাচনটি আমাদের অনেকের প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে।

অবিশ্বাস্যভাবে খুব অল্প কিছু মানুষ ছাড়া এই নির্বাচনে জিতেছে প্রায় সবাই। কারা এই নির্বাচনে পরাজিত হয়েছে (এটা জামায়াত জোট না), সেটা নিয়ে পরে কথা বলছি। নির্বাচনে কার বিজয় কীভাবে হয়েছে, সেটা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনার অবকাশ আছে। সংক্ষেপে কিছু কথা বলা যাক। 

বিএনপি

আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে (এমনকি দলটি থাকলেও) এই নির্বাচনে বিএনপির জয় প্রত্যাশিতই ছিল, তাই এটাকে খুব বড় বিজয় হিসেবে দেখার সুযোগ কম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের যে পরিস্থিতি দাঁড়ায়, তাতে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন পাবে কি না, সেটা নিয়ে সংশয়ের কথা আসছিল কিছু জরিপে। সেগুলোর ওপর ভিত্তি করে এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে এমন পূর্বাভাস দিচ্ছিলেন অনেক বিশ্লেষকও। কিন্তু বিএনপি বিজয়ী হয়েছে সেটার চেয়ে কিছু বেশি আসনে।

দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে ওঠার প্রবণতা থাকলেও বাংলাদেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে, যেখানে দীর্ঘকালীন স্বৈরাচারী ব্যবস্থার মধ্যে থাকার কারণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সব ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে, সেখানে খুব শক্তিশালী একটা সরকার থাকা জরুরি। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করব পরবর্তী সময়ে, আলাদাভাবে। 

এক–এগারো সরকারের সময় দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া তারেক রহমান লন্ডনে থেকে দীর্ঘদিন বেগম খালেদা জিয়াকে দল পরিচালনায় সাহায্য করেছেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ‘ডি–ফ্যাক্টো’ প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও কোনো নির্বাচন তাঁর একক নেতৃত্বে হয়নি।

বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পর তারেক রহমান এবারই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে দলের প্রধান হয়ে পূর্ণ ক্ষমতা এবং নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দলকে নির্বাচনী লড়াইয়ে নিয়ে গেছেন এবং বলা বাহুল্য, দুর্দান্তভাবে সাফল্য অর্জন করেছেন। নির্বাচনী প্রচারাভিযানে দেশের মানুষ তারেক রহমানের কৌশল এবং উপস্থাপনায় মুগ্ধ হয়েছে। নেতা হিসেবে তারেক রহমানের এভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়াও দলটির জন্য এক বিরাট বিজয়, যা ভবিষ্যতের রাজনীতিতে তাঁর দলকে অনেক সুবিধা দেবে। 

আরও পড়ুন

জামায়াতে ইসলামী 

নির্বাচনের ফলাফল বলছে, জামায়াতে ইসলামী বিএনপির এক-তৃতীয়াংশ আসন পেয়েছে। এতে মনে হতেই পারে, তারা নির্বাচনে বড় পরাজয়ের শিকার হয়েছে। বিশেষ করে দলটি যখন এই নির্বাচনে জিতে যাওয়ার খুব বড় সম্ভাবনা আছে, এ ধরনের একটা হাইপ তোলার চেষ্টা করেছে অনলাইন-অফলাইনে। যেটা অনেকেই বিশ্বাসও করেছে। ফলে সেই মানুষগুলো মনে করতেই পারে, জামায়াতের ফলাফল বিপর্যয়কর। 

একটা জোট, যেটা নির্বাচনে অন্য জোটটির সঙ্গে ক্ষমতায় যাওয়ার লড়াই করতে চায়, তাকে এ ধরনের একটা বিভ্রম জনগণের মধ্যে তৈরি করতেই হবে। না হলে সে যতগুলো আসনে জিতেছে, ততগুলো জিতত না।

সর্বশেষ জামায়াতে ইসলামী যে সংখ্যার আসন পেয়েছে, দেশব্যাপী যে সংখ্যার ভোটারের সমর্থন পেয়েছে, সেটা তাদের ইতিপূর্বে পাওয়া যেকোনো অর্জনের চেয়ে অনেক গুণ বেশি। শুধু সেটাই নয়, ঢাকা শহরে তাদের উল্লেখযোগ্য আসন পাওয়াটাও একটা বড় সাফল্য। একই সঙ্গে দলটি ক্ষমতায় চলেও যেতে পারে, নাগরিকদের মধ্যে এমন একটা ধারণা তৈরি করতে পেরেছে। বহু আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকা এবং অনেক আসনে বিএনপির প্রার্থীদের আত্মতুষ্টিতে ভোগাসহ কিছু কারণ জামায়াতের এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে কাজ করলেও এতে তাদের অর্জন খুব একটা ছোট হয়ে যায় না। 

সরকার, নির্বাচন কমিশন

যথেষ্ট সাংবিধানিক এবং আইনি ক্ষমতা থাকলেও বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশন আদতে সরকারের পূর্ণ সহযোগিতা ছাড়া একটি ভালো নির্বাচন করতে পারে না। সে কারণেই জুলাই সনদেও আমরা একটি নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছি। 

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তার পুরো সময়টাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বেশ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। বাংলাদেশ আদতে একটা মবোক্রেসিতে পরিণত হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্ন যৌক্তিকভাবে উঠেছিল। এই ভঙ্গুর অবস্থায় অন্যান্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দেওয়া সরকারটি নির্বাচন পরিচালনায় কেমন করবে, এ প্রশ্ন জনগণের মধ্যে ছিল। 

এমনকি যখন প্রধান উপদেষ্টা বলতেন, তাঁরা ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ নির্বাচনটি করতে যাচ্ছেন, তখন সেটাকে অতিকথন বলার মতো মানুষের অভাব ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের সার্বিক ব্যবস্থাপনা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যেভাবে দায়িত্ব পালন করেছে সরকারের নানা প্রতিষ্ঠান, সেটা আসলে অনেক ক্ষেত্রেই চমকে দেওয়ার মতো। 

তবে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রধান রাজনৈতিক দল খুবই দায়িত্বশীল আচরণ করেছে। দুই দলের দুই প্রধান নেতা পরস্পরের সমালোচনা করার সময় অত্যন্ত শালীনতা বজায় রেখেছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সম্ভবত আমরা প্রথমবারের মতো দেখলাম, দুই সর্বোচ্চ নেতা তাঁদের প্রতিপক্ষের সমালোচনা করার সময় এমনকি দলের নাম পর্যন্ত নেননি। 

এ সবকিছু বিবেচনায় নিয়েও বলা যায়, এই অসাধারণ নির্বাচনটিতে নির্বাচন কমিশন খুব ভালো করেছে। আর এর জন্য অধ্যাপক ইউনূস অবশ্যই একটা বড় কৃতিত্ব দাবি করতেই পারেন। তাঁর এই শেষ সাফল্য তাঁর অতীতের অনেক ভুলের ওপর প্রলেপ দেবে নিশ্চয়ই। 

আরও পড়ুন

সেনাপ্রধান, সেনাবাহিনী

শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে সেনাপ্রধানকে ক্রমাগত আক্রমণ করা হয়েছে নানা মহল থেকে, তাঁর নামের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে নানা রকম তকমা। কারণটা বোধগম্যই ছিল—এই ভদ্রলোক নির্বাচনের ব্যাপারে একাধিকবার তাঁর অবস্থান জানিয়েছেন।

তাই পাঁচ বছর বা কোনো সময়সীমা ছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ যাঁরা চাইছিলেন, তাঁদের বিরাগভাজন হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে তিনি এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। 

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাহায্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করে গেছে সেনাবাহিনী। দৈনন্দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে কিছু খামতি থাকার কারণে বাহিনীর কিছু সমালোচনা থাকলেও নির্বাচনে সেনাবাহিনী দুর্দান্ত ভূমিকা রেখেছে, তাই নির্বাচনে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে খুব সামান্যই। 

২০২৪ সালের আগস্টের শুরুর দিনগুলোতে সেনাবাহিনী বর্তমান সেনাপ্রধানের নেতৃত্বে জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনার পতন নিশ্চিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা করেছিল। এর দেড় বছর পর আবার তারা অসাধারণভাবে দায়িত্ব পালন করে দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় দুর্দান্ত ভূমিকা পালন করেছে। এটা নিশ্চয়ই তাদের বিজয়। 

পরাজিত হলো কে? 

এই নির্বাচনে পরাজিত হয়েছে সেই মানুষেরা, যারা চেয়েছে এই নির্বাচন যতটা সম্ভব পিছিয়ে দেওয়া যায়। সেটায় ব্যর্থ হয়ে যারা চেয়েছে এবং ক্ষেত্রবিশেষে চেষ্টা করেছে নির্বাচনটা কারও পক্ষে কারচুপি করতে, পরাজিত হয়েছে তারাও।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে নির্বাচনের কয়েক দিন আগপর্যন্ত যেসব মানুষ নানা রকম মিসইনফরমেশন এবং ডিজইনফরমেশন ছড়িয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করে এই নির্বাচনে উৎসবটিকে কোনো না কোনোভাবে ম্লান করে দিতে চেয়েছিল, এই দেশের মানুষ পরাজিত করেছেন তাদেরও। 

জাহেদ উর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

* মতামত লেখকের নিজস্ব