সম্প্রতি স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঘোষণা করছেন যে চলতি বছরের শেষের দিকে সব স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হবে। আমরা তাঁর বক্তব্যকে স্বাগত জানাই। তবে স্মরণ করে দিতে চাই যে বছরের শেষে স্কুল-কলেজের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে, তাই যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচনগুলো শুরু ও সম্পন্ন করা জরুরি।
দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়া জরুরি। কারণ, নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বাংলাদেশ সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘আইনানুযায়ী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।’ অর্থাৎ নির্বাচিত জেলা পরিষদ জেলায়, নির্বাচিত উপজেলা পরিষদ উপজেলায়, নির্বাচিত ইউনিয়ন ইউনিয়নে এবং একইভাবে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায়ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসনকার্য পরিচালনা করা বাধ্যতামূলক।
লক্ষণীয় যে সংবিধানে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর ‘স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান’ করার কথা বলা হয়েছে; অর্থাৎ নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাঁদের সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক স্তরে সবকিছুর দেখভাল করবেন, যেমনিভাবে নির্বাচিত কেন্দ্রীয় সরকার কেন্দ্রীয় পর্যায়ে শাসনকার্য পরিচালনা করেন।
অন্যভাবে বলতে গেলে, ছোটখাটো কিছু অবকাঠামো নির্মাণ, টিআর-কাবিখার মতো সরকারি স্কিমের উপকারভোগী নির্ধারণ এবং ছোটখাটো বিচার-সালিস পরিচালনার মধ্যেই স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকার পরিবর্তে তাদেরই স্থানীয় পর্যায়ে শাসনকার্য পরিচালনা করার কথা। তারা যাতে এ ভূমিকা সফলভাবে পরিচালনা করতে পারে, সেই লক্ষ্যে আমাদের সংবিধানে ‘প্রশাসন ও সরকারি কর্মচারীদের কার্য’ তাদের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ স্থানীয় পর্যায়ের সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের তত্ত্বাবধানে কাজ করবেন, যেমনিভাবে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচিত কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে কাজ করেন।
বস্তুত, আমাদের দেশে স্থানীয় সরকারব্যবস্থার গোড়াপত্তন হয় ‘বেঙ্গল লোকাল সেলফ গভর্নমেন্ট অ্যাক্ট, ১৮৮৫’–এর অধীনে; অর্থাৎ আমাদের স্বশাসিত স্থানীয় সরকারব্যবস্থা থাকার কথা, নিয়ন্ত্রিত নয়। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে উল্টো—কেন্দ্রে প্রশাসনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত সরকারের অধীনে কাজ করলেও, অন্য সব প্রশাসনিক স্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরই কর্মকর্তাদের অধস্তন করে ফেলা হয়েছে।
এটি সুস্পষ্ট যে বিদ্যমান সাংবিধানিক ব্যবস্থায় আমাদের স্থানীয় সরকারব্যবস্থা কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি একটি স্বায়ত্তশাসিত সরকারব্যবস্থা হওয়ার কথা। অন্যভাবে বলতে গেলে, স্থানীয় সরকার একটি সমান্তরাল সরকারব্যবস্থা, যার দায়িত্ব স্থানীয় পর্যায়ে, তথা সব প্রশাসনিক স্তরে শাসনকার্য পরিচালনা করা।
তবে আমাদের সংবিধান স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে তিনটি দায়িত্ব দিয়েছে, যেগুলো হলো জনশৃঙ্খলা রক্ষা করা, পাবলিক সার্ভিস তথা জনকল্যাণমূলক সব সরকারি সেবা প্রদানের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা। একই সঙ্গে সব উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা। জনকল্যাণ অর্জনের জন্য এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এবং স্থানীয় সরকারের আইন প্রণয়নকালে সংসদ এগুলো কোনোভাবেই উপেক্ষা করতে পারে না [কুদরত-ই-এলাহী পনির বনাম বাংলাদেশ, ৪৪ ডিএলআর (এডি)]
স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গ্রাসরুট ডেমোক্রেসি বা তৃণমূলের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। আর তৃণমূলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেই গণতন্ত্র পরিপূর্ণতা পায়। অন্যভাবে বলতে গেলে তৃণমূলের গণতন্ত্র গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপরিকাঠামোর ভিত হিসেবে কাজ করে। তাই ভিত দুর্বল হলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নড়বড়ে হতে বাধ্য।
স্থানীয় সরকারের তাত্ত্বিক ভিত্তি হলো ‘সাবসিডিয়ারিটি’ প্রিন্সিপাল, যার মূলকথা হলো—সমস্যা যেখানে সমাধানও সেখানে। একটু গভীরভাবে দৃষ্টি দিলে অনুধাবন করা যাবে যে মানুষ প্রতিনিয়ত যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়, সেগুলো—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পয়োনিষ্কাশন, নিরাপত্তা ইত্যাদি স্থানীয় সমস্যা এবং এগুলো জুতসই সমাধানও সম্ভব স্থানীয়ভাবে, জনগণের দোরগোড়ার সরকারের সহায়তায়।
সাবসিডিয়ারিটি প্রিন্সিপাল অনুযায়ী, যেসব সমস্যা তৃণমূলের স্থানীয় সরকারের (যেমন ইউনিয়ন পরিষদের) সহায়তায় সমাধান সম্ভব না হয়, সেগুলো তার ওপরের স্তরের (যেমন উপজেলা পরিষদ) সহায়তায়, তার পরেরগুলো পরের ওপরের স্তরের স্থানীয় সরকারের (যেমন জেলা পরিষদ) সহায়তায় সমাধান করা সহজ। সাবসিডিয়ারিটি প্রিন্সিপাল ব্যবহার করলে কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা হয়ে পড়ে সীমিত। যেমন জাতীয় নিরাপত্তা, বৈদেশিক বাণিজ্য, বৈদেশিক সম্পর্ক, আইন প্রণয়ন, নীতিগত ও প্রশাসনিক বিষয় ইত্যাদি, যেগুলো স্থানীয় বিষয় নয়।
সাবসিডিয়ারিটি প্রিন্সিপাল কাজে লাগিয়ে শাসনব্যবস্থা সাজানোর জন্য প্রয়োজন সত্যিকারের একটি বিকেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা, যেখানে ক্ষমতা, দায়িত্ব ও অর্থসম্পদের একটি বড় অংশ স্থানীয় সরকারগুলোর কাছে হস্তান্তর করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে। এর জন্য বিদ্যমান আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে, যে ব্যাপারে গুরুতর প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হবে।
তবে সবচেয়ে বেশি প্রতিবন্ধকতা আসবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাছে কেন্দ্রীয় কোষাগার থেকে অর্থসম্পদ হস্তান্তরের ক্ষেত্রে। কারণ, আমাদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদদের ধারণা, সব রাষ্ট্রীয় অর্থসম্পদের মালিকানা কেন্দ্রীয় সরকারের এবং এগুলো ব্যয়ের সিদ্ধান্তও তাদের। কিন্তু বাস্তবে একটি রাষ্ট্রে সব অর্থসম্পদের মালিক জনগণ, এগুলো সেই সব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই ব্যয় হওয়া আবশ্যক, যাতে জনগণের সর্বোচ্চ কল্যাণ সাধিত হয়।
এ কথা প্রায় সর্বজনবিদিত যে সব সরকারি সেবা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন–সম্পর্কিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জনগণের দোরগোড়ার সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত হলেই তাতে জনগণের সর্বোচ্চ কল্যাণ অর্জিত হবে। কারণ, এর মাধ্যমে সব কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে ব্যয় করা অর্থসম্পদের বিষয়ে জনগণ সরাসরি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের প্রশ্ন করতে পারে। সরকারি কর্মকর্তা বা বড় রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষেত্রে এটি সম্ভব হবে না।
আমার মনে আছে, বেশ কয়েক বছর আগে দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট আয়োজিত ইউনিয়ন পর্যায়ের একটি উন্মুক্ত বাজেট অধিবেশনে একজন নারী চেয়ারম্যানকে সরাসরিভাবে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘চেয়ারম্যান সাহেব, আপনার বাড়িতে যাওয়ার রাস্তাটি সংস্কার করলেন, আমার বাড়ির দিকে রাস্তাটি কেন জরাজীর্ণ?’ এ ছাড়া বিদ্যমান ইউনিয়ন পরিষদ আইনের বিধান অনুযায়ী, ওয়ার্ড সভার মাধ্যমে সরকারের স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব। একই সঙ্গে ওয়ার্ড সভার উন্মুক্ত অধিবেশনে সব সরকারি স্কিমের—এমনকি ফ্যামিলি কার্ড যাঁদের প্রাপ্য, তার তালিকাও প্রস্তুত করা সম্ভব, যার মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগীর কার্ড দেওয়ার জন্য অর্থ আদায়ের সমস্যা দূর করা করা সম্ভব হবে।
স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে শক্তিশালী ও কার্যকর করার আরেকটি মোক্ষম যুক্তি হলো, এর মাধ্যমে গণতন্ত্রের ভিত প্রস্তুত হয় তথা সত্যিকারের গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। গণতন্ত্র হলো জনগণের নিজেদের শাসন, যা প্রতিষ্ঠিত হয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে। তাই সর্বস্তরে জনপ্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে গণতান্ত্রিক শাসন কায়েম হয় না। তাই স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গ্রাসরুট ডেমোক্রেসি বা তৃণমূলের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। আর তৃণমূলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেই গণতন্ত্র পরিপূর্ণতা পায়। অন্যভাবে বলতে গেলে তৃণমূলের গণতন্ত্র গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপরিকাঠামোর ভিত হিসেবে কাজ করে। তাই ভিত দুর্বল হলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নড়বড়ে হতে বাধ্য।
পরিশেষে, আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হলে দ্রুততার সঙ্গে স্থানীয় সরকারের সব স্তরে নির্বাচনের আয়োজন করা জরুরি, যা হবে বিএনপির বহু আলোচিত ৩১ দফা এবং নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এ জন্য শওকত আলী কমিটির, (বর্তমান লেখক যে কমিটির সদস্য ছিলেন) এবং গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে গঠিত তোফায়েল আহমেদ কমিশনের প্রতিবেদন দুটি বিবেচনায় নিয়ে সব স্থানীয় সরকার আইনকে পরিশীলিত করা আবশ্যক, যাতে আইনি কাঠামোটি যুগোপযোগী হয়। আর পরিশীলিত আইনি আইনি কাঠামোর ভিত্তিতে নির্বাচন আয়োজন করাই হবে যুক্তিযুক্ত।
ড. বদিউল আলম মজুমদার সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)
মতামত লেখকের নিজস্ব
