তালেবানের অন্দরে যেভাবে ক্ষমতার কোন্দল ছড়িয়ে পড়ছে

‘তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা কান্দাহার থেকে ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে শাসন পরিচালনা করছেন।’ফাইল ছবি

জাবুল প্রদেশের উপগভর্নরের পদ থেকে হাজি জুম্মা খান ফাতেহকে সরিয়ে দিয়েছে তালেবান। প্রথম দেখাতে এ ঘটনাকে হয়তো প্রশাসনিক রদবদলের সাধারণ ঘটনা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ঘটনাটি তালেবানের পুরো শাসনকাঠামোয় দেখা দেওয়া একটি উদ্বেগজনক প্রবণতারই অংশ। সেটি হলো জাতিগতভাবে পশতু নন, এমন কমান্ডাররা যতক্ষণ পর্যন্ত স্বাধীন শক্তি না হয়ে ওঠেন, ততক্ষণ তাঁদের প্রয়োজনীয় মনে করা হয়।

হাজি জুম্মা খান ফাতেহ প্রভাবশালী তাজিক কমান্ডার। বাদাখশান প্রদেশে তাঁর শক্তিশালী প্রভাব ও নিজস্ব নেটওয়ার্ক রয়েছে। স্থানীয় কর্তৃত্ব ও সোনার খনির আয়কে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় তাঁকে আগেই দক্ষিণাঞ্চলে বদলি করা হয়েছিল।

আঞ্চলিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে ইঙ্গিত মিলেছে ফাতেহকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো পদক্ষেপ নয়। তালেবান ভূখণ্ড দখলের সময় অ-পশতুন কমান্ডারদের কাজে লাগায়, কিন্তু তাঁদের সামরিক বা অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কান্দাহারকেন্দ্রিক নেতৃত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠলেই সরিয়ে দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন

তালেবান নেতৃত্বের কাঠামোর দিকে তাকালে এই বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের মে মাসে মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ‘তালেবান লিডারশিপ ট্র্যাকার’-এ ১ হাজার ২১৫ জন জ্যেষ্ঠ ও মধ্যম পর্যায়ের নেতার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, তাঁদের ৯০ শতাংশই পশতুন। অন্যদিকে তাজিক মাত্র ৫ দশমিক ২ শতাংশ এবং উজবেক প্রায় ৩ শতাংশ।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, তালিকাভুক্ত নেতাদের প্রায় ৮০ শতাংশেরই সামরিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। আর তালেবান আন্দোলনের বাইরে থেকে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তির সংখ্যা মাত্র প্রায় ৩০। আফগানিস্তানে আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য কোনো জাতিগত জনশুমারি নেই, তবে বহুল ব্যবহৃত বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পশতুন। এই পরিসংখ্যান বলে দেয় আফগানিস্তানে জাতিগত বৈচিত্র্য ও রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রতিনিধিত্বের মধ্যে বিশাল বৈষম্য রয়েছে।

বদ্ধ পরিসরে ক্ষমতার আবর্ত

তালেবানের শাসনব্যবস্থা ক্রমেই এমন এক বদ্ধ ক্ষমতার বলয়ে পরিণত হচ্ছে, যেখানে প্রতিনিধিত্বশীল রাষ্ট্রের বদলে অনুগতদের ছোট একটি গোষ্ঠীই প্রাধান্য করছে। ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা কান্দাহার থেকে ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে শাসন পরিচালনা করছেন। নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট ক্ষমতা ক্রমেই নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করছেন।

আফগানিস্তানের পাহাড়ের নিচে আছে বিপুল খনিজ সম্পদ
ছবি: এএফপি

আফগানিস্তান অ্যানালিস্টস নেটওয়ার্কের প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, তালেবানের মন্ত্রিসভায় পশতুনদেরই একচ্ছত্র প্রাধান্য। তাজিক ও উজবেকদের উপস্থিতি কেবল প্রতীকী পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। হাজারা বা শিয়া সম্প্রদায়ের কার্যকর কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই আর নারীদের তো কোনো স্থানই নেই।

এখানে পদ ও প্রকৃত ক্ষমতার মধ্যে পার্থক্যটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারি ফাসিহউদ্দিন ফিতরাত এখনো তালেবানের সেনাপ্রধান। তালেবান সামরিক কাঠামোয় তিনি সবচেয়ে প্রভাবশালী তাজিক নেতা। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে দেখা গেছে, উত্তরাঞ্চলের কমান্ডারদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কগুলোর বিরুদ্ধেই তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

জাতিসংঘও (বিশেষ করে ২০২৬ সালের জুন মাসে নিরাপত্তা পরিষদে দেওয়া বিবৃতিতে) আফগানিস্তানের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পুনঃ অন্তর্ভুক্তির পথে অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের অভাবকে অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বহুজাতিক রাষ্ট্রে প্রতিনিধিত্ব কেবল রাজনৈতিক বিষয় নয়, বরং এর ওপর নির্ভর করে নাগরিকেরা সরকারকে নিজেদের জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখবেন, নাকি একটি বিশেষ গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক ক্ষমতাকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করবেন।

তালেবান উত্তর আফগানিস্তানে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের জন্য তাজিক ও উজবেক কমান্ডারদের নিয়োগ দিয়েছিল। এই কমান্ডাররা স্থানীয় পর্যায়ে জনগণকে সংগঠিত করতে সক্ষম ছিলেন। কিন্তু ২০২১ সালে ক্ষমতা দখলের পর এসব কমান্ডারদের অনেককেই গ্রেপ্তার, পদাবনতি ও নিরস্ত্র করা হয়েছে। অনেককে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে।

তালেবান উত্তর আফগানিস্তানে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের জন্য তাজিক ও উজবেক কমান্ডারদের নিয়োগ দিয়েছিল। এই কমান্ডাররা স্থানীয় পর্যায়ে জনগণকে সংগঠিত করতে সক্ষম ছিলেন। কিন্তু ২০২১ সালে ক্ষমতা দখলের পর এসব কমান্ডারদের অনেককেই গ্রেপ্তার, পদাবনতি ও নিরস্ত্র করা হয়েছে। অনেককে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে।

হাশত-ই সুবহ-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তাজিক কমান্ডার গুলাম হুসাইনকে গ্রেপ্তার এবং তাঁর অধীন প্রায় ৩৫০ যোদ্ধাকে নিরস্ত্র করার তথ্য উঠে এসেছে। এ ছাড়া উজবেক কমান্ডার মাখদুম আলম রাব্বানিকে গ্রেপ্তার, সালাহউদ্দিন আইউবিকে প্রান্তিক করে দেওয়া এবং জাতিগত বৈষম্যের অভিযোগের পর আবদুল হামিদ খোরাসানির তালেবান ত্যাগের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য। অনেক ক্ষেত্রেই একজন কমান্ডারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অর্থ ছিল তাঁর অধীন পুরো নেটওয়ার্কটিকে ভেঙে দেওয়া।

আরও পড়ুন

বাদাখশানের খনিজ সম্পদকে ঘিরে সংঘাত এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে। ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, সেখানে প্রায় ১ হাজার সদস্যের একটি বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে, প্রভাবশালী তাজিক কমান্ডারদের ঘনিষ্ঠ অন্তত ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে ও প্রায় ২ হাজার কথিত অবৈধ খনির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

আফগানিস্তান অ্যানালিস্টস নেটওয়ার্কের খনিজ খাতবিষয়ক এক গবেষণায় দেখা গেছে, তালেবানের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হচ্ছে খনিজ সম্পদ। তবে খনির লাইসেন্স প্রদানে অস্বচ্ছতা, অনিরাপদ উত্তোলন, অপরিশোধিত খনিজ রপ্তানি এবং স্থানীয় জনগণের সীমিত সুবিধা পাওয়ার চিত্র এখনো রয়েছে।

আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদের সম্ভাব্য মূল্য প্রায় এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো খনির চুক্তি, ফি আদায় ও সশস্ত্র নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। আফগানিস্তানে এমন এক ব্যবস্থা গড়ে উঠছে, যেখানে কে শাসনকাঠামোয় থাকবে, তা নির্ধারিত হচ্ছে আনুগত্যের ভিত্তিতে, আর কে অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে, তা নির্ভর করছে ক্ষমতাকেন্দ্রের কতটা ঘনিষ্ঠ, তার ওপর। এর ফলে রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও ক্রমেই জাতিগত পক্ষপাতের দোষে দুষ্টু হয়ে উঠছে।

২০২১ সালে আফগানিস্তানে পশ্চিমা–সমর্থিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে তালেবান
ফাইল ছবি: রয়টার্স

এ ধরনের ঘটনার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ মৌলভি মাহদি মুজাহিদের পরিণতি। মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের তথ্য বলছে, তালেবানের সবচেয়ে পরিচিত হাজারা কমান্ডার মাহদি মুজাহিদ নেতৃত্বের সঙ্গে মতবিরোধে জড়িয়ে পড়েন। এই বিরোধের মূল কারণ ছিল ক্ষমতার কাঠামো থেকে হাজারা সম্প্রদায়কে বঞ্চিত করা এবং স্থানীয় সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ।

পরে তালেবানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, ইরান সীমান্তের কাছে মাহদি মুজাহিদ নিহত হয়েছেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তালেবানের ভেতর থেকে দর-কষাকষি করার সক্ষমতা থাকা একমাত্র প্রভাবশালী হাজারা সামরিক নেতার অবসান ঘটে। একই সঙ্গে এটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কমান্ডারদের ততক্ষণই সহ্য করা হবে, যতক্ষণ তাঁরা রাজনৈতিকভাবে নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীল থাকবেন।

খনিজ সম্পদের মালিকানা নিয়ে নতুন সমীকরণ

নতুন গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো জাতিগত ভিত্তিতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এখন আর্থিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের সঙ্গেও একীভূত হচ্ছে। আফগানিস্তান ইন্টারন্যাশনাল প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৪ হাজার ৪০৩ জন কর্মকর্তা ও কর্মীকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে এক হাজার জনই ছিলেন বাদাখশানের বাসিন্দা।

আরও পড়ুন

তালেবান এই প্রক্রিয়াকে সরকারি ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। তাদের জারি করা এক আদেশে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ শাখাগুলোর ২০ শতাংশ সদস্যকে রিজার্ভে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে যেভাবে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চল থেকে সবচেয়ে বেশি জনবল ছাঁটাই করা হয়েছে, তাতে সরকারি ব্যাখ্যা যা–ই হোক না কেন, এই পদক্ষেপের রাজনৈতিক তাৎপর্য স্পষ্ট।

এ ধরনের ব্যবস্থা স্বল্পমেয়াদে আনুগত্য নিশ্চিত করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের সংহতিকে দুর্বল করে। দায়িত্ব থেকে অপসারিত কমান্ডার ও যোদ্ধাদের হাতে অস্ত্র ব্যবহারের দক্ষতা, স্থানীয় যোগাযোগ ও ক্ষোভ—সবই থেকে যায়। যেসব জাতিগোষ্ঠী দেখছে তাদের নিজস্ব কমান্ডারদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং স্থানীয় সম্পদের নিয়ন্ত্রণ অন্যত্র চলে যাচ্ছে, তারা অপরাধীগোষ্ঠী কিংবা উগ্রপন্থী সংগঠনের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।

গভীরতর হচ্ছে জাতিগত বিভাজন

ঝুঁকির বিষয়টি এই নয় যে উপেক্ষার শিকার তাজিক, উজবেক বা হাজারারা অস্ত্র হাতে বিদ্রোহে নামবেন। বরং বড় উদ্বেগ হলো তালেবান নিজেই সেই প্রণোদনাগুলো ধ্বংস করছে, যেগুলোর কারণে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন নেটওয়ার্ক এত দিন তাদের জোটের ভেতরে ছিল। তালেবানের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও দেশবিরোধী শক্তিগুলো নিয়ে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলোতেও এই ঝুঁকির বিষয়টি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

জাতিগত ভারসাম্যহীনতাকে যখন নিরাপত্তা ও সম্পদ নিয়ন্ত্রণের একটি কাঠামোয় রূপ দেওয়া হচ্ছে, তখন কান্দাহারকেন্দ্রিক ক্ষমতার আধিপত্যই সেই বিভক্তিকে আরও গভীর করছে। অথচ এই বিভাজনের অবসান চেয়েছিল তালেবান।

  • ড. সাহিবজাদা মুহাম্মদ উসমান ইতালির একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূরাজনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন

এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত