অস্থির সময়ে সংকট কাটিয়ে ওঠার পথ কোথায়

অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে কি না, তা চারটি সূচকেই বোঝা যাবে: বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়ছে কি না, খেলাপি ঋণ কমছে কি না, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে কি না এবং সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর কত অংশ সামাজিক সুরক্ষার আওতায় এসেছে। এক বছর পরও এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি না থাকলে অর্থনীতি স্থিতিশীল হতে পারে, কিন্তু প্রকৃত পুনরুদ্ধার ঘটবে না। লিখেছেন গোলাম রসুল।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতি ফিরেছে বলে মনে হতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন তুলনামূলক স্থিতিশীল, নীতি সুদহারও কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। কিন্তু অর্থনীতির ভেতরের চিত্র এখনো স্বস্তিদায়ক নয়।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। আগামী অর্থবছরেও প্রবৃদ্ধি একই থাকবে বলে তাদের পূর্বাভাস। আইএমএফ অবশ্য আরও কম প্রবৃদ্ধির আশঙ্কা করছে—৩ দশমিক ২ শতাংশ। সংস্থাটির পূর্বাভাস, গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে। এর মধ্যে জুনে বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে মাত্র সাড়ে ৪ শতাংশ, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

এই পরিসংখ্যানগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য সামনে আনে: অর্থনীতি স্থিতিশীল হওয়া আর ঘুরে দাঁড়ানো এক কথা নয়। ডলারের বাজারে চাপ কমলেই অর্থনীতি সচল হয়ে ওঠে না। প্রকৃত পুনরুদ্ধার তখনই আসে, যখন ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগ করেন, ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া সহজ হয়, কর্মসংস্থান বাড়ে এবং মানুষের আয় বাড়তি খরচের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে। বাংলাদেশ এখনো সেই অবস্থায় পৌঁছায়নি। কেন এই অগ্রগতি থমকে আছে, আর অর্থনীতিকে সত্যিকার অর্থে ঘুরে দাঁড় করাতে কোন কাজগুলো আগে করতে হবে—সেই প্রশ্নগুলোই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

পুরোনো দুর্বলতা

গত কয়েক দশকে তৈরি পোশাক রপ্তানি, প্রবাসী আয়, কৃষি এবং সামাজিক খাতের অগ্রগতির ওপর ভর করে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু অর্থনীতির কিছু পুরোনো দুর্বলতা রয়ে গেছে। ব্যাংক খাতের সমস্যা, সরকারের কম রাজস্ব আদায়, অল্প কয়েকটি পণ্যের ওপর রপ্তানির নির্ভরতা এবং আমদানি করা জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। বিশ্ববাজার অনুকূলে থাকলে এসব দুর্বলতা আড়ালে থাকে। কিন্তু বড় কোনো ধাক্কা এলে এগুলোই অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

প্রবৃদ্ধির হিসাবেও দুর্বলতার ছাপ স্পষ্ট। বিবিএসের হিসাবে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের হিসাবও এর চেয়ে বেশি নয়।

তবে প্রবৃদ্ধির হিসাব নিয়ে এই পার্থক্যের বাইরেও উদ্বেগের কারণ আছে। বিবিএসের প্রাথমিক হিসাবেই শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি আগের বছরের ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগের হারও ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ থেকে কমে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ হয়েছে।

মানে, অর্থনীতির গতি যেটুকু আছে, তা শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। নতুন বিনিয়োগ না হলে উৎপাদন বাড়ে না। উৎপাদন ও কাজ না বাড়লে মানুষের আয়ও বাড়ে না।

ধাক্কা এসেছে, প্রস্তুতি হয়নি

২০২২ সালে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি, সার ও খাদ্যের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। আমদানি ব্যয় বাড়ে, ডলারের ওপর চাপ তৈরি হয়, আর নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় কমে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। সেই চাপ পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠার আগেই ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ জ্বালানি ও খাদ্যের বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

প্রথম ধাক্কার পর অর্থনীতির দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার সুযোগ ছিল। কিন্তু সেই সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি। ফলে নতুন ধাক্কা সামলানোর প্রস্তুতিও থেকে গেছে দুর্বল।

তবে বাংলাদেশের সমস্যার সবটাই বাইরের নয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, বাংলাদেশ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার বেশির ভাগ দেশে মূল্যস্ফীতি সাধারণভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি বা তার নিচে ছিল। অর্থাৎ একই বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যেও দেশগুলোর অভিজ্ঞতা এক হয়নি।

যেসব দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত তুলনামূলক শক্তিশালী, ব্যাংক ব্যবস্থা সুস্থ এবং দরিদ্র মানুষের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা রয়েছে, তারা ধাক্কা সামলাতে বেশি সক্ষম। বাংলাদেশের দুর্বলতা ছিল এই তিন ক্ষেত্রেই। প্রথম ধাক্কার পর এসব দুর্বলতা কমানোর যে সুযোগ ছিল, তা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।

মনে রাখতে হবে, মূল্যস্ফীতি কমা মানে দাম কমে যাওয়া নয়; দাম ধীরে বাড়া। আগের মূল্যবৃদ্ধিতে কমে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতা ফিরতে হলে আয় বাড়তে হবে। তাই প্রকৃত পুনরুদ্ধার বোঝাতে শুধু মূল্যস্ফীতি নয়, মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানও দেখতে হবে।

সংকটের মূল্য দিচ্ছে কারা?

অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছেন যাঁদের সঞ্চয় ও আয় কম, বিপদের সময় বিকল্পও নেই। বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে। জাতীয় দারিদ্র্যরেখায় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে ২০২৬ সালের জুনে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ছিল ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকার জরুরি সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

প্রশ্ন হলো, ব্যাংক বাঁচাতে এত অর্থ দেওয়া হচ্ছে, অথচ বেসরকারি খাতে ঋণ ও বিনিয়োগ বাড়ছে না কেন? খেলাপি ঋণে ব্যাংকের অর্থ আটকে থাকলে নতুন উদ্যোক্তা ঋণ পান না। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমে। ফলে সরকারের রাজস্বও চাপে পড়ে, আর সামাজিক ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ সংকুচিত হয়।

তরুণ ও নারীরাও এই সংকটের বড় বোঝা বহন করছেন। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করলেও মন্থর প্রবৃদ্ধিতে পর্যাপ্ত মানসম্মত কাজ তৈরি হচ্ছে না। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনেও শ্রমবাজার থেকে মানুষের সরে যাওয়ার প্রবণতা উঠে এসেছে, যাঁদের বড় অংশ নারী।

 ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পেছনে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষোভ ছিল না; রাজনৈতিক অধিকার, জবাবদিহি ও বৈষম্যের প্রশ্নও ছিল; সুযোগের অভাব আর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাও সেই ক্ষোভের অংশ ছিল। সংকটের খরচ কে বহন করছে, আর সিদ্ধান্ত যাঁরা নেন তাঁরা কতটা জবাবদিহির মধ্যে আছেন, এই প্রশ্ন এড়িয়ে টেকসই সংস্কার হয় না।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

সংকট কাটিয়ে ওঠার পথ

সংকট কাটিয়ে ওঠার পথ শুরু হবে ব্যাংক খাত সুস্থ করা, দরিদ্রদের সুরক্ষা দেওয়া এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে। কারণ, এই তিনটি কাজ ছাড়া বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

প্রথমত, ব্যাংকের প্রকৃত ক্ষতি নির্ধারণ করে সংস্কার করতে হবে। ব্যাংক রেজোল্যুশন ও আমানত সুরক্ষার আইন গুরুত্বপূর্ণ, তবে সম্পদের প্রকৃত মূল্য নিরূপণ, খেলাপি ঋণের দায় নির্ধারণ ও দায়ীদের জবাবদিহি ছাড়া সংকট কাটবে না। ক্ষতির বোঝা আগে ব্যাংকের মালিক ও ঋণখেলাপিদের বহন করতে হবে। সরকারি সহায়তা শর্তসাপেক্ষ হতে হবে, যাতে পরিচালনায় সংস্কার আসে এবং ছোট আমানতকারীদের সঞ্চয় সুরক্ষিত থাকে। ক্ষতি স্বীকারে সাময়িকভাবে ঋণদান কমতে পারে, কিন্তু ক্ষতি আড়াল করলে সংকট আরও গভীর হবে।

দ্বিতীয়ত, দরিদ্রের সুরক্ষা নিশ্চিত করেই ভর্তুকি সংস্কার করতে হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ভর্তুকির চাপ কমানো দরকার, কিন্তু হঠাৎ তা তুলে নিলে পরিবহন, বিদ্যুৎ ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ক্ষতিপূরণ ছাড়া বিদ্যুতের ভর্তুকি পুরোপুরি তুলে নিলে দারিদ্র্যের হার আরও ২ দশমিক ৮ শতাংশ পয়েন্ট বাড়তে পারে।

অথচ সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই। তাই আগে প্রকৃত দরিদ্র পরিবারগুলোকে শনাক্ত করে সময়মতো সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে, তারপর ধাপে ধাপে ভর্তুকি কমাতে হবে। একইভাবে সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা বাড়ানোর আগে কর ফাঁকি বন্ধ ও অপ্রয়োজনীয় করছাড় পর্যালোচনা করা জরুরি।

তৃতীয়ত, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহের উদ্যোগ এখনই নিতে হবে। গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা উৎপাদন খরচ বাড়ায়, বিনিয়োগ কমায় এবং কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত করে। এর প্রভাব সেচ, সার, পরিবহন ও খাদ্যের দামেও পড়ে। তাই আমদানিনির্ভরতা কমানো, দেশীয় জ্বালানির সম্ভাবনা কাজে লাগানো এবং সরবরাহের উৎসে বৈচিত্র্য আনা জরুরি। এসব উদ্যোগের সুফল পেতে সময় লাগবে, তাই শুরু করতে দেরি করা যাবে না।

বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রপ্তানিতে বৈচিত্র্য ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি এই পদক্ষেপগুলোর সাফল্যের ওপর নির্ভর করে। ব্যাংকের ক্ষতি আড়াল করলে ঋণ উৎপাদনশীল খাতে ফিরবে না। আবার দরিদ্র মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত না করে ভর্তুকি কমালে দারিদ্র্য ও অসন্তোষ বাড়তে পারে। তাই সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু কী করা হচ্ছে তার ওপর নয়, কখন করা হচ্ছে এবং এর খরচ শেষ পর্যন্ত কারা বহন করছে, তার ওপরও।

পুনরুদ্ধারের পরীক্ষা

অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে কি না, তা চারটি সূচকেই বোঝা যাবে: বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়ছে কি না, খেলাপি ঋণ কমছে কি না, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে কি না এবং সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর কত অংশ সামাজিক সুরক্ষার আওতায় এসেছে। এক বছর পরও এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি না থাকলে অর্থনীতি স্থিতিশীল হতে পারে, কিন্তু প্রকৃত পুনরুদ্ধার ঘটবে না।

অর্থনীতির শক্তি বোঝা যায় ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতায়, আর প্রস্তুতি বোঝা যায় সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে দুর্বলতা কতটা কাটানো গেল, তা দিয়ে। পুরোনো দুর্বলতা রেখে আগের পথেই চললে পরের ধাক্কা আরও কঠিন হবে। তাই লক্ষ্য শুধু প্রবৃদ্ধি বাড়ানো নয়, এমন অর্থনীতি গড়ে তোলা, যা সংকটের মধ্যেও উৎপাদন ও কর্মসংস্থান ধরে রাখতে পারে, মানুষের জীবিকা সুরক্ষিত রাখে এবং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে শুধরে নিতে পারে। স্থিতিশীলতার সুফল যখন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবনযাত্রায় প্রতিফলিত হবে, তখনই বলা যাবে অর্থনীতি সত্যিকার অর্থে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

  • গোলাম রসুল অধ্যাপক, অর্থনীতি, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি (আইইউবিএটি), ঢাকা [email protected].

    মতামত লেখকের নিজস্ব