‘ঘর্মস্নাত ওষ্ঠাগত দিবসে’ কথাটা দুই ছেলেকে কিছুটা ঝামেলায় ফেলেছিল। প্রথমত, এই খটমট কথাগুলো তারা ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারছিল না। দ্বিতীয়ত, কথাটার অর্থ তাদের কাছে পরিষ্কার ছিল না। তবে দিনে চার-পাঁচবার লোডশেডিংয়ের ঠ্যালায় পড়ে তারা যখন ঘেমেনেয়ে হাঁপানো শুরু করল; তখন প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসে ছিরু মোল্লা তাদের গতরের ঘাম আর হাঁসফাঁস অবস্থা দেখিয়ে কথাটার অর্থ বুঝিয়ে দিয়েছেন। ছেলেদের কাছে এখন জিনিসটা পানির মতো ক্লিয়ার হয়ে গেছে।  

একেবারে খালি খালি ছিরু মোল্লা তাঁর দুই পুত্রকে এই শপথবাক্য মুখস্থ করাননি। এর যে একটি জীবনঘনিষ্ঠ জনগুরুত্বসম্পন্ন কারণ আছে, তা বোঝানোর জন্য তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ-বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর একটি বক্তব্য ছেলেদের শুনিয়েছেন। সেই বক্তব্যে তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী দিনের বেলায় সবাইকে বিদ্যুৎ ব্যবহার না করার শপথ নিতে বলেছেন। 

ইতিমধ্যে মোটামুটি সবাই জেনে গেছেন, ২৩ অক্টোবর রাজধানীতে শিল্প খাতে জ্বালানিসংকটের প্রভাব হ্রাস নিয়ে একটি আলোচনা সভায় ব্যবসায়ীরা বলছিলেন, বিদ্যুৎ-জ্বালানির অভাবে কোনো কোনো কারখানা ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বন্ধ রাখতে হচ্ছে। সেখানে উপস্থিত থাকা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, কারখানা সচল রাখার জন্য যা যা দরকার তা তা করা হবে। তিনি বলেছেন, ‘যদি প্রয়োজন হয়, আমরা এখানে যারা আছি, তারা সবাই শপথ নেব; দরকার হলে আমরা দিনের বেলায় বিদ্যুৎ ব্যবহার করব না।’ 

তাঁর বক্তব্যের এই অংশটি ছিরু মোল্লা শিশুপুত্রদের শোনানোর সময় পাশে বসা ছিরু মোল্লার বউ তালপাখা নাড়তে নাড়তে অতি অবিবেচকের মতো শ্লেষমাখা কণ্ঠে বললেন, ‘উনি (তৌফিক–ই–ইলাহী চৌধুরী) যে বললেন, “দরকার হলে আমরা দিনের বেলায় বিদ্যুৎ ব্যবহার করব না”; এখানে এই “আমরা” মানে কারা?’ 

ছিরু মোল্লা বললেন, ‘কারা আবার? আমরা মানে আমরা! আমরা মানে জনগণ! আমরা মানে সবাই! ছোটলোক-বড়লোক সবাই।’ 

ছিরু মোল্লার বউ এবার কোট-টাই পরা এক কর্মকর্তার ছবি দেখিয়ে বললেন, ‘দিনির বেলা উনার অফিসে কারেন্ট না থাকলি পরে তো উনার এসি চলবিনানে; গরমে রুম তো দোজখ হয়া যাবিনে। তহন তো উনারে কুট–প্যান্ট খুলে লুঙ্গি নয়তো সুতির পায়জামা–পাঞ্জাবি পরতি হবিনে। সেই কষ্ট কি উনি করতি পারবেনে?’ 

ছিরু মোল্লা বললেন, ‘অবশ্যই পারবেন। গান্ধীজি কমপ্লিট স্যুট ফেলে নেংটি পরেছিলেন, আর উনি পাঞ্জাবি–পায়জামা পরতে পারবেন না! অবশ্যই পরবেন।’ 

ছিরু মোল্লার বউয়ের চোখ–মুখ দেখে মনে হলো না তিনি তাঁর স্বামীর কথা বিশ্বাস করেছেন। তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে; দিনির বেলা কারেন্ট ব্যবহার করলাম না। কিন্তু সেইটা কদ্দিন? মানে কত দিন কারেন্টের এই পলান–টুকটুক খেলা সহ্য করতি অবে?’ 

তখন বাধ্য হয়ে ছিরু মোল্লাকে লর্ড ভানুর সেই গল্প বউকে শোনাতে হলো: 

ভানু সর্ব বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার চেম্বার খুলেছেন। তাঁর সামনে একটা টিনের বাক্স। সেই বাক্সে বারো টাকা ‘ফি’ হিসেবে ফেলতে হয়। এক ভদ্রমহিলা এসে বারো টাকা বাক্সে ফেলে বললেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে অন্ধকার-গরমে আর টিকতে পারছি না, কী করি বলুন তো!’ 

ভানু বললেন, ‘মাস দুয়েক দেখেন, ঠিক অইয়া যাইবো’। 

 ‘দুই মাসে ঠিক হবে তো!’ 

 ‘যদি না অয়, আরও মাস তিনেক কোনো রকমে সহ্য করবেন।’

 ‘তাহলে তো দাঁড়াল পাঁচ মাস। তখন ঠিক হয়ে যাবে নিশ্চয়ই!’ 

‘ফাউ হিসেবে আরও দুই–এক মাস ধরেন।’

‘তখনো যদি কারেন্ট ঠিক না হয়?’ 

‘আরে তখন তো আর চিন্তাই নাই, অন্ধকার আর গরম সহ্য করা অভ্যাস অইয়া যাইবো। তখন কারেন্ট আইলেই বরং খারাপ লাগব।’

 ছিরু মোল্লা খেয়াল করলেন, ভানুর এই কৌতুক শুনে তাঁর স্ত্রীর মুখে হাসির বদলে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।   

তবে তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর বক্তব্যে এখনই আতঙ্কিত হতে মানা করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর বক্তব্যের বিষয়ে সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, ‘যে কথাটি আসছে, সেটি শঙ্কার কথা। ভবিষ্যতের শঙ্কার কথা। যদি দেশের অবস্থা, সারা বিশ্বের অবস্থা খুব খারাপের দিকে যায়, তাহলে শঙ্কার অবস্থা আছে। তবে আমি মনে করি, এত শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।...আমরা মনে করছি, কয়েক মাসের মধ্যে একটি ভালো অবস্থানে চলে যাব।’ 

তবে এই কথায় ভরসা পাওয়া ছিরু মোল্লার পক্ষে খানিকটা কঠিন মনে হচ্ছে। কারণ, এর আগেও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কেউ বলেছেন, এই সমস্যা মিটতে মাসখানেক লাগবে; কেউ আবার ‘আর কটা দিন সবুর করো, রসুন বুনেছি’ টাইপের আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডলারে বড় ধরনের টান পড়েছে। জ্বালানি তেল আনা যাচ্ছে না। তেল নেই তো বিদ্যুৎ নেই। 

তৌফিক–ই–ইলাহী চৌধুরী নিজে হতাশার সুরে বলেছেন, ‘ডলারের যে অবস্থা...!’ 

ছিরু মোল্লা যেহেতু রাষ্ট্রের একান্ত বাধ্যগত নাগরিক, সেহেতু তিনি এই অবস্থায় জ্বালানি উপদেষ্টার শপথের আহ্বানে সাড়া দিয়ে নিজের ঘরের দরজায় দিনের বেলায় বিদ্যুৎ ব্যবহার না করার শপথবাক্য লটকে দিয়েছেন। দুই শিশুপুত্র রোজ ইশকুলে যাওয়ার আগে ডান হাতের মুঠো বন্ধ করে সামনে বাহু মেলে ধরে আবৃত্তি করছে, ‘আমি শপথ করিতেছি, দেশের সেবায় সর্বদা নিজেকে নিয়োজিত রাখিব। রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকিব। চরম গরমে ঘর্মস্নাত ওষ্ঠাগত দিবসেও বিদ্যুৎ ব্যবহার করিব না। হে আল্লাহ, আমাকে শক্তি দিন। আমিন।’

সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক

[email protected]