যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি যেভাবে দেশের স্বার্থবিরোধী

৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর করে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার। জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে অস্থায়ী একটি সরকার কর্তৃক কঠোর গোপনীয়তা বজায় রেখে এই চুক্তি স্বাক্ষরের ঘটনা নানা কারণে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এ চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা রক্ষিত হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে দুই পর্বে লিখেছেন কল্লোল মোস্তফা। আজ প্রকাশিত হলো প্রথম পর্ব

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাকোলাজ

চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত পাল্টা শুল্কহার ১ শতাংশ কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য প্রবেশে বিদ্যমান সাধারণ গড় শুল্কহার সাড়ে ১৫ শতাংশ। এর ওপর বাড়তি পাল্টা শুল্ক আরোপ হবে ১৯ শতাংশ। অর্থাৎ দেশটির বাজারে বাংলাদেশি পণ্যে মোট শুল্কের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে সাড়ে ৩৪ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের তুলা বা সুতা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে যে ‘পাল্টা শুল্ক’ অব্যাহতি পাবে বলে প্রচার করা হচ্ছে, তা নানা শর্তযুক্ত। এসব শর্ত মেনে বাংলাদেশ ঠিক কতটা সুবিধা আদায় করতে পারবে, তা নিয়ে ব্যবসায়ীরাই প্রশ্ন তুলেছেন। অথচ বিনিময়ে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় বাণিজ্য, অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রে নানা শর্ত মেনে চলার অঙ্গীকার করতে হয়েছে। এই লেখায় চুক্তিতে থাকা শর্তগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা হবে চুক্তিটিতে দেশের স্বার্থ কতটা রক্ষিত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিপুল শুল্কছাড়

এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ৬ হাজার ৭১০টি পণ্যে শুল্কছাড় দেবে, বিনিময়ে বাংলাদেশ পাবে ১ হাজার ৬৩৮ পণ্যে পাল্টা শুল্কছাড়ের সুবিধা। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিন থেকেই ৪ হাজার ৫০০টি পণ্য বাংলাদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এগুলোকে ইআইএফ (এন্টার ইনটু ফোর্স) শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গবাদিপশু, মাংস, মাছ, রাসায়নিক দ্রব্য, বস্ত্র, যন্ত্রপাতি ও নানা শিল্পপণ্য।

এ ছাড়া বি-৫ শ্রেণিতে থাকা ১ হাজার ৫৩৯টি পণ্যের শুল্ক চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্ধেক কমানো হবে। বাকি অর্ধেক পরবর্তী চার বছরে সমানভাবে কমবে। পঞ্চম বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এসব পণ্য পুরোপুরি শুল্কমুক্ত হবে। বি-১০ শ্রেণির ৬৭২টি পণ্যের ক্ষেত্রেও শুরুতে শুল্ক অর্ধেক কমবে। বাকি অর্ধেক পরবর্তী ৯ বছরে সমান ধাপে কমিয়ে দশম বছরের ১ জানুয়ারি থেকে সম্পূর্ণ শূন্যে নামানো হবে। এই বিপুল শুল্কছাড়ের কারণে স্থানীয় কৃষি ও শিল্পপণ্য যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারে এবং শুল্ক বাবদ রাজস্ব আয় কমতে পারে (শিডিউল ১, অ্যানেক্স ১)।

মার্কিন শিল্পপণ্য রপ্তানিতে অশুল্ক বাধা অপসারণ

চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য রপ্তানিতে অশুল্ক বাধা কমানোর ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এমনভাবে আমদানি লাইসেন্সিং নীতির প্রয়োগ করতে পারবে না, যাতে সেসব পণ্যের আমদানি বাধাগ্রস্ত হয় (আর্টিকেল ২.২)। মার্কিন শিল্প ও চিকিৎসাপণ্য সে দেশে অনুমোদিত হলেও বাংলাদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে আবার পরীক্ষা ও বিপণন অনুমোদন নিতে হতো। যুক্তরাষ্ট্র এটাকে অশুল্ক বাধা হিসেবে চিহ্নিত করে দূর করার প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের কাছ থেকে আদায় করেছে (অ্যানেক্স ৩, সেকশন ১)।

এর ফলে বাংলাদেশকে যেসব ছাড় দিতে হবে, তার মধ্যে রয়েছে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধের ক্ষেত্রে এফডিএ সনদ ও পূর্ববর্তী বিপণন অনুমোদন গ্রহণ করা (আর্টিকেল ১.১, অ্যানেক্স ৩); মার্কিন ফেডারেল মোটরযান নিরাপত্তা ও নির্গমন মান অনুযায়ী নির্মিত যানবাহন গ্রহণ করা (আর্টিকেল ১.২, অ্যানেক্স ৩) এবং মার্কিন পুনঃউৎপাদিত পণ্য বা যন্ত্রাংশের ওপর যেকোনো আমদানি নিষেধাজ্ঞা বা লাইসেন্সিং শর্ত তুলে নেওয়া (আর্টিকেল ১.৩, অ্যানেক্স ৩)।

কৃষি ও জৈব প্রযুক্তি পণ্যের অশুল্ক বাধা অপসারণ

অশুল্ক বাধা দূর করার নামে মার্কিন কৃষি ও জৈব প্রযুক্তি পণ্যের প্রবেশের ক্ষেত্রেও পরীক্ষা–নিরীক্ষা বাদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। (অ্যানেক্স ৩, সেকশন ১) প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে রয়েছে মার্কিন খাদ্য ও কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে মার্কিন স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি ব্যবস্থা এবং অন্যান্য মানদণ্ডকে বাংলাদেশের মানদণ্ডের বিকল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া (আর্টিকেল ১.৪, অ্যানেক্স ৩); মাংস-পোলট্রি-ডিম ইত্যাদির ক্ষেত্রে ইউএসডিএ ফুড সেফটি অ্যান্ড ইন্সপেকশন সার্ভিসের মানদণ্ডকে স্বীকৃতি দেওয়া (আর্টিকেল ১.৫, অ্যানেক্স ৩); চুক্তি স্বাক্ষরের ২৪ মাসের মধ্যে এমন নীতিমালা তৈরি করা যেন যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপদ বলে স্বীকৃত বায়োটেকনোলজি বা জৈব প্রযুক্তি পণ্য বিনা পরীক্ষা ও বাড়তি কোনো লেবেলিং ছাড়াই বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে (আর্টিকেল ১.৬, অ্যানেক্স ৩); যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অঞ্চলের পোলট্রি খাত এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে আক্রান্ত অঞ্চলের ১০ কিলোমিটার বেশি দূরত্বের পোলট্রি পণ্যের ওপর আমদানি নিষেধাজ্ঞা না দেওয়া (আর্টিকেল ১.৮, অ্যানেক্স ৩) ইত্যাদি।

এসব কথিত অশুল্ক বাধা দূর করার অর্থ হলো খাদ্য ও কৃষিপণ্য আমদানিতে জৈব নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষমতা হারানো। আগে মার্কিন তুলা দেশে আসার পর পোকা মারার রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হতো। এখন সেটা সম্ভব হবে না। বিতর্কিত জেনিটিক্যালি মোডিফায়েড পণ্য আমদানিতে বাধা দেওয়া যাবে না, এমনকি লেবেল দিয়ে চিহ্নিতও করতে বাধ্য করা যাবে না, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাড়তি খরচে বাধ্যতামূলক পণ্য আমদানি

চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কিনতে হবে। আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার মার্কিন জ্বালানি, বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনতে হবে। সেই সঙ্গে ৩৫০ কোটি ডলার বা ৪২ হাজার কোটি টাকার মার্কিন কৃষি পণ্য কিনতে হবে। এর মধ্যে গম কিনতে হবে প্রতিবছর ৭ লাখ টন হারে পাঁচ বছর ধরে। সয়াবিন কিনতে হবে এক বছরের মধ্যে ১২৫ কোটি ডলার বা ২৬ লাখ টন পরিমাণ। এ ছাড়া বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনাকাটা বাড়াতে হবে এবং অন্য দেশ থেকে কেনা কমাতে হবে (সেকশন ৬, অ্যানেক্স ৩)।

বাংলাদেশ প্রতিবছর বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ কৃষি ও জ্বালানি পণ্য আমদানি করলেও খরচ ও সময় বেশি লাগায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলনামূলক কম আমদানি করা হতো। এখন চুক্তি অনুসারে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে পণ্য আমদানি বাড়াতে হলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে তুলনামূলক কম দরে ও কম সময়ে পণ্য আমদানি থেকে বঞ্চিত হতে হবে। এর ফলে দেশ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়াতে হলে ভর্তুকি বা বিশেষ সুবিধা দিতে হতে পারে। সামরিক সরঞ্জাম আমদানি বাড়াতে হলে বাড়তি খরচের পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিও বাড়বে।

আরও পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্রকে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মতো সুবিধা প্রদান

চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশকে খনিজ সম্পদ উত্তোলন ও রপ্তানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের সহযোগিতা করতে হবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন, টেলিকমিউনিকেশন, পরিবহন ও অবকাঠামো খাতে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সমান সুযোগ–সুবিধা প্রদান করতে হবে। (আর্টিকেল ৫.১) এ ছাড়া তেল-গ্যাস, বিমা ও টেলিযোগাযোগ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজি বিনিয়োগে কোনো সীমা আরোপ করা যাবে না (আর্টিকেল ১.১৬, অ্যানেক্স ৩)। বর্তমানে দেশি–বিদেশি বেসরকারি কোম্পানি কর্তৃক রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বীমা কর্পোরেশনে ৫০ শতাংশ পুনর্বিমা করার যে বাধ্যবাধকতা আছে, তা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিমা কোম্পানিকে ছাড় দিতে হবে (আর্টিকেল ১.১৫, অ্যানেক্স ৩)।

যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দেশীয় প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অনেক বেশি। এসব বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানকে যদি দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সমান সুযোগ–সুবিধা দিতে হয়, তাহলে দেশীয় খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ছাড়া এসব খাতের ওপর দেশের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ খর্ব হবে। যেমন দেশে গ্যাস–সংকট থাকার পরও যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিকে গ্যাস রপ্তানির অনুমোদন দিতে হবে।

দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে ভর্তুকি ও সুরক্ষা দিতে বাধা

আর্থিক ও প্রযুক্তিগত ঘাটতি মোকাবিলার জন্য উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে অনেক দেশীয় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তুকি ও প্রণোদনা দিতে হয়। নতুবা কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কৌশলগত খাতে বিদেশনির্ভরতা বাড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশকে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবাণিজ্যিক সহায়তা বা অন্য কোনো ধরনের ভর্তুকি প্রদান থেকে বিরত থাকতে হবে। শুধু তা–ই নয়, দেশের ভেতরের সব ম্যানুফ্যাকচারিং প্রতিষ্ঠানে ভর্তুকি ও প্রণোদনার তথ্য যুক্তরাষ্ট্রকে জানাতে হবে এবং বাজারের প্রতিযোগিতাকে প্রভাবিত করে এমন ভর্তুকি বন্ধ করতে হবে (আর্টিকেল ৫.২)।

শুধু তা–ই নয়, বাংলাদেশকে যত দ্রুত সম্ভব মৎস্য খাতে ভর্তুকি বিষয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার চুক্তি মেনে চলতে হবে এবং মৎস্য খাতে ‘ক্ষতিকর’ ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে ও ভর্তুকি ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে (আর্টিকেল ১.২৩, অ্যানেক্স ৩)। চুক্তি কার্যকর হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় সব ধরনের ভর্তুকির তথ্য জমা দিতে হবে (সেকশন ৬, অ্যানেক্স ৩)।

আরও পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা-জালে জড়ানো

চুক্তির নামে পারস্পরিক বাণিজ্যের কথা বলা হলেও এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে। চুক্তি অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্র যদি জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় সীমান্ত বা বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নেয়, তাহলে বাংলাদেশকেও তাদের সঙ্গে মিল রেখে ‘পরিপূরক বিধিনিষেধ’ গ্রহণ করতে হবে (আর্টিকেল ৪.১)।

বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘন ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এর ফলে বৃহৎ শক্তিগুলোর দ্বন্দ্বে বাংলাদেশ নিরপেক্ষ থাকতে পারবে না, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা বা ‘বাণিজ্যযুদ্ধে’ বাংলাদেশকে কার্যত একই অবস্থানে দাঁড়াতে হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশের বন্দর, টার্মিনাল, লজিস্টিক নেটওয়ার্কে এমনপ্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে, যেন তৃতীয় দেশের কাছে তথ্য পাচার না হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর এমন সফটওয়্যার ব্যবহার সীমিত করতে হবে (আর্টিকেল ১-৫, সেকশন ৩)।

তৃতীয় দেশের সঙ্গে চুক্তি ও বাণিজ্যে বাধা

যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে চুক্তিতে এমন সব শর্ত রাখা হয়েছে, যা বাংলাদেশের স্বাধীন সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করবে। চুক্তি অনুসারে, বাংলাদেশ তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি বা সমঝোতায় যেতে পারবে না, যেখানে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন, বৈষম্যমূলক বা পক্ষপাতমূলক কারিগরি মানদণ্ড থাকবে এবং যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয় (আর্টিকেল ২.৩), বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়—এমন কোনো ডিজিটাল বাণিজ্যচুক্তি অন্য কোনো দেশের সঙ্গে স্বাক্ষর করতে পারবে না (আর্টিকেল ৩.২)।

শুধু তা–ই নয়, বাংলাদেশ যদি অবাজারভিত্তিক কোনো দেশের (যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনায় চীন ও রাশিয়া) সঙ্গে এমন কোনো মুক্তবাণিজ্য বা অগ্রাধিকারমূলক অর্থনৈতিক চুক্তি করে, যা এই চুক্তিকে অবমূল্যায়ন করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি বাতিল করে আবার শাস্তিমূলক উচ্চ শুল্ক আরোপ করতে পারবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর, জ্বালানি রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ক্রয় করতে পারবে না, যে দেশ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত। তবে এমন যেসব পণ্যের কোনো বিকল্প সরবরাহকারী বা প্রযুক্তি নেই, অথবা এই চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগেই যেসব পণ্যের চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে ছাড় পাওয়া যাবে (আর্টিকেল ৪.৩)। 

উপসংহার

ওপরের আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে, এই তথাকথিত বাণিজ্যচুক্তির মাধ্যমে কার্যত বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, এমনকি পররাষ্ট্রনীতির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আয়োজন করা হয়েছে। শিল্প, কৃষি, জ্বালানি থেকে শুরু করে দেশের সব খাতকে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক স্বার্থের অধীন করে ফেলা হয়েছে; বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক প্রকল্পে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের হাত–পা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ফলে এককথায় এটি জাতীয় স্বার্থবিরোধী এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনকারী একটি চুক্তি। চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার আগেই জাতীয় সংসদের মাধ্যমে এর পুনর্মূল্যায়ন ও সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

  •  কল্লোল মোস্তফা লেখক ও গবেষক

    *মতামত লেখকের নিজস্ব

    [দ্বিতীয় পর্ব আগামীকাল প্রকাশিত হবে]