কৃষি পরিসংখ্যানে গরমিল যেভাবে খাদ্যনিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি

কৃষি খাতের নীতি নির্ধারণ, খাদ্য আমদানি-রপ্তানি, মূল্য স্থিতিশীলতা, কৃষক প্রণোদনা, মজুত ব্যবস্থাপনা কিংবা খাদ্যনিরাপত্তা পরিকল্পনা—সবকিছুই নির্ভর করে নির্ভরযোগ্য উপাত্তের ওপর। লিখেছেন মো. শাহজাহান কবীর

মো. শাহজাহান কবীর

‘মিথ্যা তিন প্রকার—মিথ্যা, ডাহা মিথ্যা এবং পরিসংখ্যান’—এ উক্তির উৎস নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে কিছু মতভেদ থাকলেও এটি বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রচলিত। তবে এই উক্তির প্রকৃত তাৎপর্য পরিসংখ্যানকে ‘অবিশ্বস্ত’ বলা নয়; বরং সতর্ক করে দেওয়া যে ভুল তথ্য, ত্রুটিপূর্ণ বিশ্লেষণ কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উপস্থাপনার মাধ্যমে পরিসংখ্যানকে বিভ্রান্তিকর করে তোলা সম্ভব। বাংলাদেশের কৃষি পরিসংখ্যান নিয়ে চলমান বিতর্ক ও বাস্তবতার পটভূমিতে সেই কথার তাৎপর্য আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়।

বাংলাদেশের ১৭ কোটির বেশি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা এবং দেশের কৃষি অর্থনীতির একটি বড় অংশ নির্ভর করে কৃষি উৎপাদনসংক্রান্ত সঠিক তথ্যের ওপর। কৃষি খাতের নীতি নির্ধারণ, খাদ্য আমদানি-রপ্তানি, মূল্য স্থিতিশীলতা, কৃষক প্রণোদনা, মজুত ব্যবস্থাপনা কিংবা খাদ্যনিরাপত্তা পরিকল্পনা—সবকিছুই নির্ভর করে নির্ভরযোগ্য উপাত্তের ওপর।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন সংস্থার কৃষি উৎপাদন–সংক্রান্ত তথ্যের মধ্যে প্রায়ই বড় ধরনের পার্থক্য থাকে। কখনো উৎপাদন বেশি দেখানো হয়, কখনো কম। আবার মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে সরকারি হিসাবেরও মিল পাওয়া যায় না। এই গরমিল কেবল পরিসংখ্যানগত সমস্যা নয়; এটি অর্থনীতি, কৃষক ও ভোক্তা—সবার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে।

২.

বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদনের তথ্য প্রধানত আসে সরকারি জরিপ, মাঠপর্যায়ের অনুমান, প্রশাসনিক রিপোর্ট এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আলাদা হিসাব থেকে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই), খাদ্য অধিদপ্তর, বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, কৃষি বিপণন অধিদপ্তরসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান কৃষিসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে। কিন্তু তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতি, নমুনা নির্বাচন, সময়কাল, ফলন নির্ধারণের কৌশল এবং বিশ্লেষণ পদ্ধতির ভিন্নতার কারণে একই ফসলের উৎপাদন নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা পাওয়া যায়। ফলে কোন তথ্যটি নীতিনির্ধারণের জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য, তা নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন দেখা দেয়। 

► মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে সরকারি হিসাবের মিল পাওয়া যায় না। এই গরমিল শুধু পরিসংখ্যানগত সমস্যা নয়; এটি অর্থনীতি, কৃষক ও ভোক্তা—সবার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে। ► দীর্ঘ মেয়াদে একটি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি পরিসংখ্যানব্যবস্থা গড়ে তোলাই খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং টেকসই কৃষি উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত।

এ ধরনের পার্থক্যের উদাহরণ বাংলাদেশে নতুন নয়। ২০২০ সালে বোরো ধানের উৎপাদন নিয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) হিসাবের মধ্যে নীতিনির্ধারণের দৃষ্টিকোণ থেকে পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। ডিএই যেখানে প্রায় ২ কোটি টন বোরো উৎপাদনের হিসাব দেয়, সেখানে বিবিএসের হিসাব ছিল প্রায় ১ কোটি ৯৬ লাখ টন। বিষয়টি এতটাই গুরুত্ব পায় যে সরকার বিবিএস কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সহযোগিতায় ‘হারমোনাইজড ক্রপ এস্টিমেশন মেথড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন হিসাবের মধ্যে পার্থক্য কমানো এবং একটি সমন্বিত ও গ্রহণযোগ্য উৎপাদন অনুমান পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা। এ উদ্যোগের ফলে তথ্য সংগ্রহ, ফলন নির্ধারণ এবং উৎপাদন হিসাবের ক্ষেত্রে সমন্বয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আগের তুলনায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবের মধ্যে সামঞ্জস্যও কিছুটা বেড়েছে। এ অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে দেখায় যে কৃষি পরিসংখ্যানের সামান্য গরমিলও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তির জন্ম দিতে পারে।

আরও পড়ুন

৩.

কৃষি পরিসংখ্যানের গরমিলের পেছনে বিভিন্ন কারণ কাজ করে। প্রথমত, মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের দুর্বলতা একটি বড় কারণ। অনেক ক্ষেত্রে নমুনা নির্বাচন (স্যাম্পলিং) সঠিকভাবে করা হয় না। কোনো এলাকায় সীমিতসংখ্যক ‘প্লট’ দেখে পুরো এলাকার উৎপাদন অনুমান করা হয়। কিন্তু একই এলাকার মধ্যেও জমির ধরন, মাটির উর্বরতা, সেচ, জাত, রোগবালাই, আবহাওয়া ইত্যাদির তারতম্যের কারণে ফলনে বড় পার্থক্য থাকতে পারে। ফলে ছোট নমুনার ভিত্তিতে বড় সিদ্ধান্ত নিলে ভুল হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। 

দ্বিতীয়ত, কৃষকের দেওয়া তথ্যের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক কৃষক সঠিক জমির পরিমাণ বা উৎপাদনের হিসাব জানেন না। কেউ কেউ কর, ঋণ বা সরকারি সুবিধার আশঙ্কায় কম তথ্য দেন, আবার কেউ বেশি উৎপাদন দেখিয়ে নিজেদের সফলতা তুলে ধরতে চান। এতে ভুল তথ্য পাওয়া যায়।

তৃতীয়ত, প্রশাসনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক চাপও কখনো কখনো পরিসংখ্যানের গরমিল সৃষ্টি করে। কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধির ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরার প্রবণতা কাজ করে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা বাস্তব পরিস্থিতির তুলনায় বেশি ফলন দেখাতে উৎসাহিত হতে পারেন। আবার দুর্যোগের সময় ক্ষতির পরিমাণ কম দেখানোর প্রবণতাও দেখা যায়, যাতে প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ এড়ানো যায়। এ ধরনের প্রবণতা দীর্ঘ মেয়াদে নীতিনির্ধারণকে বিভ্রান্ত করে। 

চতুর্থত, কৃষিজমির সঠিক হিসাব না থাকাও একটি বড় সমস্যা। প্রতিবছর নগরায়ণ, শিল্পায়ন, সড়ক নির্মাণ ও নদীভাঙনের কারণে কৃষিজমি কমছে। কিন্তু অনেক সময় পুরোনো জমির হিসাব ব্যবহার করেই উৎপাদন অনুমান করা হয়। ফলে কাগজে-কলমে উৎপাদন বাস্তবের চেয়ে বেশি দেখাতে পারে। 

পঞ্চমত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দ্রুত মূল্যায়ন করতে না পারাও গরমিলের কারণ। বন্যা, খরা, শিলাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি বা ঘূর্ণিঝড়ের কারণে মাঠের বাস্তব অবস্থা দ্রুত বদলে যায়। কিন্তু তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিবেদন তৈরিতে সময় লাগায় অনেক সময় ক্ষতির প্রকৃত চিত্র উঠে আসে না। বিশেষ করে হাওরাঞ্চল বা উপকূলীয় এলাকায় এ সমস্যা বেশি দেখা যায়। 

ষষ্ঠত, তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে আধুনিক প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহারও বড় একটি কারণ। এখনো অনেক ক্ষেত্রে হাতে লেখা তথ্য, অনুমাননির্ভর হিসাবের ওপর নির্ভর করা হয়। এতে মানবিক ভুল, তথ্য পুনরাবৃত্তি বা গাণিতিক ত্রুটি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আরও পড়ুন

কৃষি পরিসংখ্যানের এই গরমিলের প্রভাব বহুমাত্রিক। প্রথমত, খাদ্য মজুত ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়ে পড়ে। সরকার যদি প্রকৃত উৎপাদন সম্পর্কে সঠিক ধারণা না পায়, তাহলে কখন আমদানি করতে হবে বা কত মজুত রাখতে হবে—সে সিদ্ধান্তও ভুল হতে পারে। দ্বিতীয়ত, বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। উৎপাদনের ভুল তথ্য ব্যবসায়ী ও বাজার সিন্ডিকেটের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। তৃতীয়ত, কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। প্রকৃত ক্ষতির তথ্য সঠিকভাবে প্রতিফলিত না হলে কৃষক প্রয়োজনীয় সহায়তা বা ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। চতুর্থত, গবেষণা ও নীতি পরিকল্পনাও দুর্বল হয়ে পড়ে। ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া নীতি দীর্ঘ মেয়াদে কৃষি খাতকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। পঞ্চমত, ভুল বা অসম্পূর্ণ উৎপাদন তথ্য ‘অ্যাগ্রিকালচারাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্স’কে দুর্বল করে। 

কৃষিপণ্যের বাজার শুধু উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে মজুত, আমদানি-রপ্তানি, ভোগ, পরিবহন এবং বাজার আচরণও জড়িত। উৎপাদনের তথ্য বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে ভবিষ্যৎ সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। ফলে আমদানি, মজুত ব্যবস্থাপনা ও বাজার হস্তক্ষেপের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও ভুল হতে পারে, যা কৃষক ও ভোক্তা উভয়ের জন্য ক্ষতিকর।

৪.

বাংলাদেশে ২০০৭-০৮ সালের খাদ্যসংকট কৃষি পরিসংখ্যান ও তথ্যব্যবস্থার দুর্বলতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ২০০৭ সালে বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় সিডরের কারণে দেশের ধান উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে দুর্যোগের পরপরই ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে উৎপাদন–ঘাটতি কতটা হতে পারে, দেশে কী পরিমাণ খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে এবং কতটুকু আমদানি প্রয়োজন হবে—এসব বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ফলে বাংলাদেশকে পরে উচ্চমূল্যে চাল আমদানি করতে হয় এবং বাজারে মূল্য অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ সংকটের একমাত্র কারণ দুর্যোগ ছিল না; বরং দুর্যোগ-পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতির দ্রুত ও নির্ভুল মূল্যায়নের ঘাটতি সময়মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণকে কঠিন করে তোলে এবং সংকটের প্রভাবকে আরও তীব্র করে। 

সাম্প্রতিক বোরো মৌসুমেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি হিসাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে। সরকারি হিসাবে যেখানে প্রায় ২ লাখ টন বোরো উৎপাদন ক্ষতির কথা বলা হয়েছে, সেখানে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ, কৃষি গবেষক ও গণমাধ্যমভিত্তিক মূল্যায়নে ক্ষতির পরিমাণ ১৪–১৫ লাখ টন পর্যন্ত হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। 

এই বিপুল ব্যবধান শুধু একটি পরিসংখ্যানগত পার্থক্য নয়; এটি দেশের প্রকৃত খাদ্য পরিস্থিতি, সম্ভাব্য আমদানির প্রয়োজন, সরকারি মজুত ব্যবস্থাপনা এবং বাজারমূল্য পূর্বাভাসকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে। যদি প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ কম ধরে নেওয়া হয়, তাহলে প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব হতে পারে; আবার অতিরঞ্জিত হিসাবও অপ্রয়োজনীয় উদ্বেগ ও ভুল সিদ্ধান্তের জন্ম দিতে পারে। এই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে দুর্যোগপ্রবণ কৃষি অঞ্চলে দ্রুত, নির্ভুল এবং প্রযুক্তিনির্ভর ফসলের ক্ষতি মূল্যায়নব্যবস্থা না থাকলে সরকার সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। 

৫.

উৎপাদনের সরকারি হিসাব বনাম বাজারের বাস্তবতা—এমন পটভূমিতে বাংলাদেশে বহু বছর ধরেই একটি প্রশ্ন প্রায়ই ওঠে, সরকার বলছে উৎপাদন রেকর্ড, কিন্তু বাজারে চালের দাম এত বেশি কেন? সরাসরি ‘ভুল তথ্য’ না থাকলেও কয়েকটি জায়গায় গরমিল তৈরি হওয়ার কারণে এমনটা হতে পারে। 

অনেক সময় একটি মৌলিক বিষয় উপেক্ষিত হয়; উৎপাদন, প্রাপ্যতা, বাজার সরবরাহ, মজুত এবং ভোগ এক বিষয় নয়। কোনো বছরে ধানের উৎপাদন বেশি হলেই যে বাজারে চালের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকবে, তার নিশ্চয়তা নেই। কারণ, মোট উৎপাদনের একটি অংশ কৃষকের পারিবারিক ভোগে ব্যবহৃত হয়, কিছু অংশ বীজ হিসেবে সংরক্ষিত থাকে, কিছু অংশ ফসল কাটার পর ক্ষতি হিসেবে নষ্ট হয় এবং কিছু অংশ কৃষক, মিলার বা ব্যবসায়ীদের কাছে মজুত হয়ে যায়। ফলে উৎপাদনের পুরোটা বাজারে আসে না। 

অন্যদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, শিল্প খাতে ব্যবহার কিংবা দুর্যোগজনিত চাহিদা বৃদ্ধির কারণে মোট ভোগও ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়। তাই কাগজে-কলমে উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও বাজারে সরবরাহ, মজুত এবং ভোগের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে মূল্যবৃদ্ধি ও বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ খাদ্য পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য শুধু উৎপাদনের হিসাব নয়; উৎপাদন, প্রকৃত প্রাপ্যতা, বাজার সরবরাহ, মজুত ও ভোগ—এই পাঁচটি উপাদানের সমন্বিত বিশ্লেষণ প্রয়োজন। অন্যথা নীতিনির্ধারকেরা কাগজে উদ্বৃত্তের চিত্র দেখলেও বাস্তবে বাজারে ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতির মুখোমুখি হতে পারেন।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশে একাধিকবার আলুর বাম্পার উৎপাদনের ঘোষণা এসেছে, কিন্তু পরে দেখা গেছে হিমাগারে পর্যাপ্ত সংরক্ষণ নেই, বাজারে চাহিদা কম, রপ্তানি পরিকল্পনা দুর্বল এবং প্রকৃত বাজার চাহিদার তথ্য অপর্যাপ্ত; ফলে কৃষক রাস্তার পাশে আলু ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছেন বা উৎপাদন খরচও তুলতে পারেননি। এখানে সমস্যা শুধু উৎপাদন নয়; বাজারের অবস্থা, মূল্য, সরবরাহ, চাহিদা, ভোক্তার আচরণ, ব্যবসায়িক প্রবণতা ইত্যাদি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ এবং চাহিদাসংক্রান্ত পরিসংখ্যানের দুর্বলতাও একটি কারণ।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কৃষি পরিসংখ্যান সংগ্রহে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। স্যাটেলাইট ইমেজ, ড্রোন, জিআইএস এবং রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তির মাধ্যমে জমির পরিমাণ, ফসলের অবস্থা ও ফলনের ধারণা আরও নির্ভুলভাবে পাওয়া সম্ভব। বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশ ফসল উৎপাদন পর্যবেক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল কৃষি তথ্যব্যবস্থা ব্যবহার করছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ জরুরি। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা শক্তিশালী করা প্রয়োজন। কৃষি ও ফসল উৎপাদনসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও বিশ্লেষণের দায়িত্বে থাকা পরিসংখ্যান কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও পেশাগত মর্যাদা বৃদ্ধি করতে হবে। 

কৃষি পরিসংখ্যানের মানোন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু উৎপাদন তথ্যের নির্ভুলতা বৃদ্ধি করলেই সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান হবে না। বাংলাদেশের জন্য একটি সমন্বিত ‘অ্যাগ্রিকালচারাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্স সিস্টেম’ গড়ে তোলা জরুরি, যা উৎপাদন, মজুত, বাজার সরবরাহ, ভোগ, আমদানি-রপ্তানি এবং মূল্য পরিস্থিতির সমন্বিত বিশ্লেষণ করবে। এর ফলে সরকার আরও তথ্যভিত্তিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে। দীর্ঘ মেয়াদে একটি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি পরিসংখ্যানব্যবস্থা গড়ে তোলাই খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং টেকসই কৃষি উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত।

ড. মো. শাহজাহান কবীর সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)

* মতামত লেখকের নিজস্ব