প্রায় দুই দশক ধরে উন্নয়ন ও বিকাশের অনুষঙ্গ হিসেবে বাংলাদেশে জ্বালানি চাহিদা বাড়ছে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামা ও সরবরাহ শৃঙ্খলে চ্যালেঞ্জের কারণে জ্বালানিনিরাপত্তা বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ফলে সেটি আরও কষ্টকর হয়ে উঠেছে। ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রতি প্রায় ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। এসবের প্রত্যক্ষ প্রভাব এরই মধ্যে দেশের জ্বালানি খাতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এরই মধ্যে ফিলিং স্টেশনগুলোয় বিভিন্ন যানবাহন চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। এ ছাড়া ফিলিং স্টেশন থেকে চাহিদামতো জ্বালানি না পাওয়ায় বাসের সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে অনেক পরিবহন কোম্পানি। গ্যাস সাশ্রয় করতে পাঁচটি সার কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে ঈদুল ফিতরের ছুটি এগিয়ে এনে সোমবার থেকে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারিভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে বৈদ্যুতিক বাতি, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রাংশ (এসি) ব্যবহার কমিয়ে আনা, আলোকসজ্জা পরিহারসহ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া জাতীয় গ্রিডে এরই মধ্যে এলএনজির সরবরাহ কমিয়েছে পেট্রোবাংলা। সেই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রেও গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা কমানো হয়েছে। অর্থাৎ জ্বালানি পণ্যে রেশনিংয়ের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। তবে বাস্তবতা হলো যদি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়, তবে দেশে জ্বালানি পণ্যের বিদ্যমান মজুত শিগগিরই ফুরিয়ে যাবে এবং জ্বালানিসংকট তীব্রতর হয়ে উঠবে।
আশঙ্কার বিষয় হলো, চলমান সংঘাত অবিলম্বে বন্ধের কোনো ইঙ্গিত এ পর্যন্ত লক্ষণীয় নয়। বরং টানা নয় দিন ধরে ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোকে টার্গেট করার পর দেশটির জ্বালানি তেলের ডিপোগুলোকে লক্ষ্য করে তীব্র হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর বিপরীতে ইরানও পাল্টা হামলা জোরদার করেছে। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া প্রয়োজন জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
জ্বালানি আমদানির জন্য কিছু নির্দিষ্ট বন্ধুরাষ্ট্রসহ বিকল্প উৎস থেকে কীভাবে অবিলম্বে জ্বালানি আনা যায়, সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সাধারণ জনগণের জীবনমান ধরে রাখতে জ্বালানিতে ভর্তুকির পরিমাণও বাড়াতে হবে। সামগ্রিক সুরক্ষা বেষ্টনীর বরাদ্দে কিছুটা পরিবর্তন ও প্রাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনীতিতে চাঞ্চল্য বজায় রাখতে সামগ্রিক বাজেটেও জ্বালানিনিরাপত্তাকে ব্যাপক প্রাধান্য দিতে হবে।
আমাদের দেশের জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬২ শতাংশ পূরণ করা হয় আমদানির মাধ্যমে। সেই আমদানির বেশির ভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। বিশেষ করে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ তেল এবং এক-পঞ্চমাংশ তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সরবরাহ হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। চলমান যুদ্ধের জেরে ইরান যদি এ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম উদ্বেগজনক হারে বাড়বে, এমনকি প্রতি ব্যারেল ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে এবং সরবরাহ সংকটও অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে যাবে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম ও আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যাবে।
আবার দেশ যেহেতু জ্বালানির ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর, তখন জ্বালানি ব্যয়ও বেড়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ব্যয়বহুল জ্বালানি আমদানির সক্ষমতা দেশের অর্থনীতির রয়েছে কি না। বাস্তবতা হলো নেই। বিশেষ করে আরও উদ্বেগের বিষয় হলো আমদানির জন্য প্রয়োজন ডলার, যা উপার্জনের অন্যতম উৎস প্রবাসী আয়। কিন্তু প্রবাসীদেরও অধিকাংশ কর্মরত রয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয়। সেখানে সংঘাতের কারণে দেশে রেমিট্যান্সপ্রবাহও কমার আশঙ্কা রয়েছে। সব মিলিয়ে এ মুহূর্তে সরকারকে জ্বালানিনিরাপত্তায় সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে।
এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন যে জ্বালানিসংকট তীব্র হলে দেশের অর্থনীতিতেও বড় ধস নামবে। কেননা, এর প্রধানতম ভিত্তি হলো শিল্পোৎপাদন। কলকারখানাগুলো পরিচালনায় প্রয়োজন হয় ব্যাপক পরিমাণ গ্যাস ও বিদ্যুৎ। আবার বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাথমিক জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় গ্যাস, বিশেষত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)।
গেল কয়েক বছরে টানা জ্বালানি পণ্যের ঘাটতিতে চলছে দেশ, যার দরুন বহু কারখানা বন্ধ হয়ে পড়েছে। নতুন করে এ ঘাটতি বেড়ে গেলে পুরো উৎপাদনব্যবস্থা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। শুধু তা–ই নয়, পণ্য পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যাবে। এগুলোর সরাসরি প্রভাব পড়বে পণ্যের দামে, যা মূল্যস্ফীতি আরও উসকে দেবে। উল্লেখ্য, চার মাস ধরে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে ৯ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা ১০ মাসে সর্বোচ্চ। আর ২০২২ সাল থেকে ক্রমবর্ধমান উচ্চ মূল্যস্ফীতিই অর্থনীতিতে বড় ক্ষত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে জ্বালানিনিরাপত্তা যে শুধু শিল্পের জন্য প্রয়োজন, এমন নয়। দেশের জনগণের খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টিও এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। উদাহরণ হিসেবে বোরো ধান উৎপাদনের কথা বলা যায়। এ ধানের চাষ মূলত সেচনির্ভর। আর সেচকাজের জন্য ব্যাপক পরিমাণ ডিজেল প্রয়োজন হয়। ফলে জ্বালানিসংকট তীব্র হলে এ ধান উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটবে। যেখানে দেশে মোট উৎপাদিত ধানের প্রায় অর্ধেক আসে বোরো মৌসুম থেকে, সেখানে এর উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার অর্থ হলো খাদ্যনিরাপত্তায় ঝুঁকি সৃষ্টি। কেননা দেশের মানুষের প্রধানতম খাদ্যশস্য হলো চাল, যা আসে ধান থেকে।
উৎপাদনের বাইরেও জ্বালানিসংকটের প্রভাব হবে গুরুতর। শহরে আবাসন খাতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চাহিদা অনেক বেশি। বিশেষ করে রান্না নির্ভর করে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ওপর। কেবল আবাসনেই নয়, হোটেল-রেস্তোরাঁয় ব্যবহার হয় এ গ্যাস। গত জানুয়ারিতে দেশে নানা কারণে এলপিজির সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় জনগণকে কতটা ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হয়েছিল তা প্রায় সবার জানা। কয়েক গুণ বেশি দাম দিয়েও গ্রাহকেরা এলপিজি সিলিন্ডার পাচ্ছিলেন না। এ থেকে ধারণা করা যাচ্ছে যে আগামীতে জ্বালানির ঘাটতি বেড়ে গেলে আবাসন খাতও চাপের মধ্যে পড়বে। অর্থাৎ জ্বালানিসংকটের কারণে বহুমুখী চাপের মধ্যে পড়বে দেশ।
জ্বালানিনিরাপত্তা প্রসঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি পণ্যের মজুত রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি আমদানি ব্যাহত হলে যে মজুত রয়েছে তা দিয়ে বড়জোর দুই-তিন সপ্তাহ পার করা যাবে। এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে আমদানি বৃদ্ধি ও অব্যাহত রাখা যাবে তা নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে।
জ্বালানি আমদানির জন্য কিছু নির্দিষ্ট বন্ধুরাষ্ট্রসহ বিকল্প উৎস থেকে কীভাবে অবিলম্বে জ্বালানি আনা যায়, সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সাধারণ জনগণের জীবনমান ধরে রাখতে জ্বালানিতে ভর্তুকির পরিমাণও বাড়াতে হবে। সামগ্রিক সুরক্ষা বেষ্টনীর বরাদ্দে কিছুটা পরিবর্তন ও প্রাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনীতিতে চাঞ্চল্য বজায় রাখতে সামগ্রিক বাজেটেও জ্বালানিনিরাপত্তাকে ব্যাপক প্রাধান্য দিতে হবে।
মামুন রশীদ অর্থনীতি বিশ্লেষক।
মতামত লেখকের নিজস্ব
