মতামত
গণ–অভ্যুত্থান–পরবর্তী নির্বাচনে নারীরা কোথায়
বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামো ও প্রক্রিয়া এখনো ব্যাপকভাবে পুরুষতান্ত্রিক এবং পুরুষের নিয়ন্ত্রণে। বাংলাদেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা চায় না যে নারীরা এ দেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় অংশগ্রহণ করুন। তাই রাজনৈতিক দলের সব স্তরে নারীর প্রতিনিধিত্ব কম। আসন্ন নির্বাচনে নারীরা কোথায়—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন সেলিম জাহান
২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পরবর্তী একটা সময়ে প্রশ্ন উঠেছিল, ‘জুলাইয়ের নারী যোদ্ধারা কোথায়?’
উত্থাপিত প্রশ্নটির একটি পরিপ্রেক্ষিত ছিল। জুলাই অভ্যুত্থানে মেয়েরা ছিলেন সংগ্রামের প্রথম সারিতে—নেতৃত্বে, দাবিতে, দৃশ্যমানতায়। কোনো সন্দেহ নেই যে জুলাই আন্দোলন সফল হওয়ার পেছনে মেয়েদের অংশগ্রহণ একটি বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল।
কিন্তু বছর ঘুরতেই তাঁরা যেন হারিয়ে গেলেন। তাঁদের আর দেখা গেল না নানা সংস্কার বিষয়ের প্রতিনিধিত্বে, দেশের রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনার অংশগ্রহণে, দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে। মেয়েরা যেন উবে গেলেন।
সংগতভাবেই প্রশ্ন উঠল, ‘জুলাইয়ের নারীরা কোথায় হারালেন?’
২.
আমাদের দেশে ব্যাপারটি অবশ্য নতুন নয়। ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের কথাই ধরা যাক। সে সংগ্রামে বাংলাদেশের নারীরা পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন—প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে এবং পরোক্ষভাবে সারা দেশে।
কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে না তাঁদের বীরত্বগাথা তেমনভাবে উঠে এসেছে, না মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের ভূমিকার যথাযথ মূল্যায়ন হয়েছে।
বহু ক্ষেত্রে সেই নারীদের চিত্রায়িত করা হয়েছে শুধু মুক্তিযুদ্ধের বলি হিসেবে, কিন্তু যুদ্ধে যোদ্ধা হিসেবে তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। তাই স্বাধীনতা–পরবর্তী সময়ে দেশ পুনর্গঠনের নানা কর্মকাণ্ডে মেয়েরা উপেক্ষিতই থেকে গেলেন। তাঁদের কথা কেউ ভাবল না এবং তাঁদের কাজে লাগানোর বিষয়টিও কেউ চিন্তা করল না।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দেড় বছর পর বাংলাদেশ আজ গণতান্ত্রিক পথযাত্রায় একটি সুষ্ঠু জন–অংশগ্রহণমূলক নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
জুলাই আন্দোলনের একটি প্রধান ভিত্তিভূমি ছিল বৈষম্যবিহীন একটি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা এবং একটি সমতাসম্পন্ন সমাজ গঠন। সে উদ্দেশ্যে একটি গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ এখন একটি অংশগ্রহণমূলক সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে।
সেই পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ববর্তী সময়ের মতো আজ আবারও প্রশ্ন উঠছে, ‘দেশের নির্বাচনে মেয়েরা আজ কোথায়?’
প্রশ্নটি ওঠার একটি সংগত কারণ আছে। সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য অনুসারে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের জন্য মোট ২ হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্র দাখিল করা হয়েছে। এর মধ্যে নারী প্রার্থী রয়েছেন ১০৯ জন, অর্থাৎ মোট প্রার্থীর মাত্র ৪ দশমিক ২ শতাংশ।
মোট নারী প্রার্থীর মধ্যে দলীয় প্রার্থী ৭২ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ৩৭ জন। তার মানে হচ্ছে, প্রতি ৩ জন নারী প্রার্থীর মধ্যে ১ জন কোনো দলীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেননি।
দলগত দিক থেকে বাংলাদেশের ৫০টি রাজনৈতিক দল আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। তার মধ্যে ৩০টি দলেরই কোনো নারী প্রার্থী নেই, অর্থাৎ দেশের তিন-পঞ্চমাংশ রাজনৈতিক দল আগামী নির্বাচনে কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। সে অবস্থায় এই ৩০টি দল সারা দেশে একজনও যোগ্য নারীও পেলেন না প্রার্থী হিসেবে—এটা দুর্ভাগ্যজনক।
৩.
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, নারীদের প্রতি বৈরিতা ও তাঁদের বিরুদ্ধে একধরনের বৈষম্য কি এখানে কোনোভাবে কাজ করেছে?
যেসব রাজনৈতিক দল নারী প্রার্থী দিয়েছে, তার মধ্যে মাত্র ১০ জন নারী প্রার্থী নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও মার্ক্সবাদী বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) নারী প্রার্থীর তালিকার শীর্ষে রয়েছে।
বিএনপির মতো একটি প্রধান শক্তিশালী তৃণমূলপ্রোথিত রাজনৈতিক দল তার ৩২৮ জন প্রার্থীর মধ্যে ১০ জনের (মাত্র ৩ শতাংশ) বেশি নারী প্রার্থী দিল না বা দিতে পারল না, এটা চরম দুঃখজনক।
দেশের ৯টি রাজনৈতিক দল মাত্র ১ জন করে নারী প্রার্থী দিয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে উঠে আসা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের ৪৪ প্রার্থীর মধ্যে শুধু ৩ জন নারী প্রার্থীকে বেছে নিয়েছে। অথচ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে দলটির জন্ম।
উল্লেখ্য, জামায়াতে ইসলামীর ২৭৯ প্রার্থীর মধ্যে ১ জনও নারী প্রার্থী নেই। কোন বার্তা দিতে চাইছে দেশের এই অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলটি?
নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণও পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ভালো চোখে দেখে না। সেই সঙ্গে বাংলাদেশে নারীরা ভোট দেন, কিন্তু তাঁদের অনেকেই স্বাধীনভাবে ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর ভিত্তি করে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন, এমনটা বলা বোধ হয় সঠিক হবে না।
সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামীর শরিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একাধিক নারীনেত্রী জামায়াতের সঙ্গে এনসিপি জোট বাঁধায় দলত্যাগ করেছেন।
অনেকেই বলছেন, নারী বিষয়ে জামায়াতের নানা নীতি ও অবস্থানের কারণে এই নারীনেত্রীরা জামায়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ততায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেননি।
কথা আরও আছে। নির্বাচন বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্য পোষণ করেছিল, নির্বাচনে প্রতিটি দলের প্রার্থীদের মধ্যে ন্যূনতম ৫ শতাংশ প্রার্থী হবেন নারী। এই লক্ষ্যে দলগুলো অঙ্গীকারবদ্ধও হয়েছিল। এখন দেখা যাচ্ছে, বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে।
দ্বিতীয়ত, দেশের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুসারে রাজনৈতিক দলগুলোর ২০২০ সালের মধ্যে তাদের সব স্তরের ও পর্যায়ের পর্ষদগুলোতে ন্যূনতম ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধি রাখার কথা ছিল।
কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো সে শর্ত প্রতিপালনে ব্যর্থ হলে সে ব্যাপারে সময়সীমা বাড়িয়ে ২০৩০ সাল করা হয়েছে। হাতের কাছে উপাত্ত নেই, কিন্তু মনে হয় না যে সে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে।
৪.
এই অনভিপ্রেত চালচিত্রের কারণ কী?
এর প্রধানতম কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামো ও প্রক্রিয়া এখনো ব্যাপকভাবে পুরুষতান্ত্রিক এবং পুরুষের নিয়ন্ত্রণে। বাংলাদেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা চায় না যে নারীরা এ দেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় অংশগ্রহণ করুন। তাই রাজনৈতিক দলের সব স্তরে নারীর প্রতিনিধিত্ব কম।
এককথায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীদের উপস্থিতি কম এবং বাংলাদেশে রাজনীতি করেন, এমন নারীর সংখ্যাও সীমিত।
এর পরিপ্রেক্ষিতে নারীরা কম সংখ্যায় নির্বাচনে প্রার্থী হন, নির্বাচনী সমাবেশ কিংবা প্রচারণা করেন না। সমাজও নারীদের এই ভূমিকায় দেখতে অভ্যস্ত নয়। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের নির্বাচনে সনাতনভাবে পেশিশক্তির প্রয়োগও নারীদের নির্বাচনে প্রার্থী হতে উৎসাহিত করে না।
নির্বাচনী ব্যয় মেটানোর জন্য অর্থায়নের ক্ষেত্রে নির্বাচনী অভিযান চালানোর জন্য জনশক্তি জোগাড় করাও মেয়েদের জন্য দুরূহ। সেই সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের দলীয় প্রার্থী হলেও মেয়েরা দলের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ সাহায্য ও সাংগঠনিক সহায়তা পান না।
সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের সমাজে ‘মবতন্ত্রের’ বিস্তারও নির্বাচন প্রার্থী হতে মেয়েদের নিরুৎসাহিত করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বহু সময়েই নারীরা তাঁদের জন্য সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত হতেই আগ্রহী থাকেন। কিন্তু এটা একটি সংরক্ষিত ব্যবস্থা এবং এটি নারীর প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক সক্ষমতার পরিপন্থী।
অথচ উপর্যুক্ত চালচিত্রের প্রেক্ষাপটে রয়েছে এই সত্য যে তিন দশক ধরে বাংলাদেশের দুটি প্রধানতম দলের শীর্ষ নেতৃত্বে ছিলেন নারী এবং এই সময়কালে তাঁরা দুজনেই অদলবদল করে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান ছিলেন।
কিন্তু বিষয়টি দেশের রাজনৈতিক কাঠামোর শীর্ষেই রয়ে গেছে এবং এটা রাজনীতির তৃণমূল ও মধ্যপর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বা প্রতিনিধিত্বের চালচিত্রের বাস্তবতায় যে খুব বড় একটা পরিবর্তন এনেছে, এমন নয়।
সেই সঙ্গে তাঁদের নেতৃত্ব কিংবা প্রধানমন্ত্রিত্বের কালে তাঁরা নিজেরা যে এ ব্যাপারে বিস্তৃত প্রত্যক্ষ প্রণোদনামূলক কোনো পদক্ষেপ নিয়েছেন, এমনটাও নয়।
সুতরাং রাজনৈতিক কাঠামোর সামষ্টিক পর্যায়ের শীর্ষে নারী থাকলেও ব্যষ্টিক পর্যায়ে সেটা আপামর নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর ব্যাপারে খুব একটা ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে বলে মনে হয় না।
৫.
ঐতিহাসিকভাবেও বাংলাদেশে নির্বাচনকালে কোনো প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী সমাবেশ কিংবা প্রচারণায় বিপুলসংখ্যক নারীর অংশগ্রহণও খুব একটা দেখা যায় না।
নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণও পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ভালো চোখে দেখে না। সেই সঙ্গে বাংলাদেশে নারীরা ভোট দেন, কিন্তু তাঁদের অনেকেই স্বাধীনভাবে ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর ভিত্তি করে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন, এমনটা বলা বোধ হয় সঠিক হবে না।
কারণ, কোন প্রার্থীকে কিংবা কোন প্রতীকে তাঁরা ভোট দেবেন, তা তাঁরা নির্ধারণ করেন না, বাড়ির পুরুষেরাই ঠিক করে দেন। সেখানে মেয়েদের নিজস্ব বিচারবুদ্ধি খাটিয়ে তাঁদের ভোটাধিকার ব্যবহার করার সুযোগ বড় কম।
বাড়ির পুরুষদের পছন্দের প্রার্থীকে মেয়েরা ভোট দেন। ভোটকেন্দ্রে যাওয়া-আসার ব্যাপারেও গ্রামবাংলার নারীদের স্বাধীনতা নিতান্ত সীমিত।
সুতরাং বাংলাদেশের নির্বাচনে নারীরা কোথায়, এ প্রশ্নের সবচেয়ে সদুত্তর হচ্ছে, এ দেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তাঁদের নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় যেখানে রেখে দিতে চায় এবং রেখে দিয়েছেন, বাংলাদেশের নারীরা সেই বৃত্তের মাঝেই আছে।
এ বৃত্ত ভাঙতে না পারলে নির্বাচন আসবে, নির্বাচন যাবে, কিন্তু এ দেশের নারীরা পুরুষ–নির্দেশিত স্থানেই থাকবেন। এ বৃত্ত ভাঙার দায়িত্বটি কিন্তু শুধু নারীদের নয়, আমাদের সবার।
সেলিম জাহান সাবেক পরিচালক, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ
*মতামত লেখকের নিজস্ব