বাংলাদেশের আগামী সরকার কেবলই ক্ষমতার পালাবদলে সৃষ্ট শাসকগোষ্ঠী হবে, আগের মতোই একই ধারাবাহিকতায় সরকার চলবে—এ দেশের মানুষ আর তা চায় না।
প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের অস্বাভাবিকতার নিরসন কীভাবে হবে? প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ও নির্বাচনী জোটের দৃষ্টিভঙ্গি কী রকম হবে? এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়ার প্রবল আগ্রহও তৈরি হয়েছে জনমনে।
দক্ষিণ এশিয়ায় বহুপক্ষীয় কূটনীতির পথ প্রায় সম্পূর্ণরূপে অচল হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় মিথস্ক্রিয়া তলানিতে। ভূরাজনৈতিক সম্পর্কে চলছে ঘোরতর অস্বস্তি। আফগানিস্তান ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার অন্য কোনো দেশের সঙ্গেই ভারতের সম্পর্ক স্বস্তিদায়ক নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে দেশটির চিরবৈরিতা। ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বই নয়, গোটা উপমহাদেশ আস্থা ও নিরাপত্তাহীনতার সংকটে। নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপের সঙ্গেও ভারতের সম্পর্কে রয়েছে গভীর সংশয় ও অস্বস্তি।
দক্ষিণ এশিয়ায় নিরাপত্তাহীনতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক অবিশ্বাসের পেছনে বড় কারণ সার্কের অচলাবস্থা।
সার্কের অচলাবস্থাটি এক-দুই দিনে হয়নি। দীর্ঘদিন ধরেই বেড়ে উঠেছে পারস্পরিক অবিশ্বাস, অসম আচরণ ও রাজনৈতিক-মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের বিষবৃক্ষ। স্বাভাবিক দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক চর্চা দিয়ে এই দূরত্ব আর ঘুচবে না। কারণ, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আবেগ, অহংকার ও শক্তির অহমিকার রাজনীতির কাদায় আটকে গেছে।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনটি রাজনীতিকদের জন্য দেশের কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্নির্ধারণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সুযোগ। নির্বাচিত নতুন সরকারের প্রথম ও প্রধান কূটনৈতিক কর্মসূচি হওয়া দরকার দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) পুনরুজ্জীবন ও কার্যকরীকরণের উদ্যোগ।
২.
সার্ককে সক্রিয় করা কেন দরকার?
ভেনেজুয়েলার মতো দেশে একপক্ষীয় ও রক্তক্ষয়ী মার্কিন হস্তক্ষেপ দেখিয়ে দিয়েছে—আঞ্চলিক ঐক্য দুর্বল হলে কোনো দেশের সার্বভৌমত্বই নিরাপদ থাকে না। মধ্যপ্রাচ্যে আরব লিগের ব্যর্থতা কিংবা আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে আঞ্চলিক সংহতির অভাবের ফলও একই রকম। বিপরীতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ান কিংবা লাতিন আমেরিকার মারকোসর দেখিয়েছে—আঞ্চলিক সহযোগিতা কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক নিরাপত্তারও প্রধান ভিত্তি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কারণে ছোট দেশ যেমন পর্তুগাল, গ্রিস বা বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোও বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতে একটি সম্মিলিত শক্তির অংশ হয়ে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন না থাকলে এই দেশগুলোর কেউই আজ এককভাবে যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা রাশিয়ার সঙ্গে সমানে সমানে দর-কষাকষি করতে পারত না।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ান সক্ষম না থাকলে ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো এককভাবে কখনোই বৈশ্বিক উৎপাদন ও সরবরাহ চেইনের কেন্দ্রে উঠে আসতে পারত না। আসিয়ানের ছাতার নিচে তারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, পারস্পরিক আস্থা ও বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য দ্বন্দ্বের মধ্যেও একটি বিকল্প উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের নতুন সরকার একটি নতুন কূটনৈতিক অধ্যায় শুরু করতে চাইলে সার্ক পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নিতে হবে প্রথম দিন থেকেই। এটিই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একমাত্র সম্মানজনক পথ। আঞ্চলিক জোটে কোনো পক্ষকে মাথা নত করতে হয় না। উদ্যোগের সহজ ভাষ্য—সার্ক শক্তিশালী হলে লাভ সবার। বিভেদ-বিভাজন দক্ষিণ এশিয়াকে একটি শক্তিহীন অঞ্চলে পরিণত করবে। এতে বহিরাগত শক্তির সহজ শিকার হয়ে পড়ার ঝুঁকি সবারই সমান।
আঞ্চলিক জোট রাজনৈতিক নিরাপত্তার একটি অমোঘ ঢালও বটে! লাতিন আমেরিকার মারকোসর জোটভুক্ত ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়ে যখন একক বাজার ও শুল্কব্যবস্থার দিকে এগিয়েছে, তখনই এ অঞ্চল বৈশ্বিক কৃষিপণ্য ও শিল্পপণ্যের বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পেরেছে। মারকোসর বর্তমানে পুরোপুরি সফল বা কার্যকর নয়। তবু জোট কার্যকর থাকার সময় সদস্যরাষ্ট্রগুলো এককভাবেও অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায়।
আঞ্চলিক জোট দুর্বল হয়ে পড়লে প্রতিটি দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মে এতটা কাছাকাছি হওয়া সত্ত্বেও আরব লিগ কার্যকর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলাফল ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ও ইয়েমেন—প্রতিটি দেশ আলাদা আলাদাভাবে বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপের শিকার হয়েছে।
আফ্রিকান ইউনিয়নের অভিজ্ঞতাও শিক্ষণীয়। যখন জোট কিছুটা সক্রিয় ছিল, তখন গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও সংঘাত নিয়ন্ত্রণেও সাফল্য ছিল। যখনই জোট দুর্বল থেকেছে, দেশগুলো গৃহযুদ্ধ, সামরিক অভ্যুত্থান ও বহিরাগত প্রভাবের কাছে অসহায় হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় সার্ক অচল হয়ে পড়ার ফলও একই রকম। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল বা শ্রীলঙ্কা—কোনোটিই এককভাবে নিরাপদ নয়। ভারত মনে করতে পারে, সে একা শক্তিশালী। বাস্তবে আঞ্চলিক অবিশ্বাস ও দূরত্ব ভারতের কৌশলগত নিরাপত্তাকেই দুর্বল করছে। বাংলাদেশ, নেপাল বা শ্রীলঙ্কা মনে করতে পারে, দ্বিপক্ষীয় ভারসাম্য রক্ষা করেই চলা যাবে। বাস্তবে বহুপক্ষীয়তা ছাড়া বড় শক্তির চাপের মুখে টিকতে পারা কঠিন।
৩.
সম্প্রতি খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দ্রুত শোক জানালেন। সশরীর প্রতিনিধি পাঠালেন শোকবার্তাসহ। বাংলাদেশের জনগণ আশায় বুক বেঁধে ভেবেছিল, দীর্ঘদিনের বরফ গলতে শুরু করেছে। এই আপাত ইতিবাচক সম্ভাবনার মধ্যেই আইপিএলে মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দিয়ে ক্রিকেটে বাংলাদেশের সঙ্গে বৈরিতা তৈরি করল। বাংলাদেশের জনপ্রত্যাশা মুহূর্তেই পরিণত হলো নিরাশা ও হতাশায়।
ক্রীড়া কূটনীতির বাইরের একটি মানবিক ও সৌহার্দ্যের ক্ষেত্র, বিশেষত ক্রিকেট। খেলাটি যেহেতু ভদ্রলোকের খেলা। জনগণের আবেগ, ভালোবাসা ও স্বদেশপ্রেমও খেলাটিতে এসে একাকার। তাই ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী মানসিকতা-প্রভাবিত সিদ্ধান্তটি পুরো অঞ্চলে ভারতবিরোধিতা আরও জোরদার করেছে। ঘটনাটি একজন খেলোয়াড়কে বাদ দেওয়ার দুর্ঘটনায় আটকে নেই। বরং ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ, সহনশীল ও উদার গণতন্ত্রকামী রাষ্ট্রের দাবিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
শেখ হাসিনার শাসনকালে ভারত বাংলাদেশে আধিপত্যের সাফল্য পেয়েছিল বটে! কিন্তু প্রতিবেশী দেশে অনুগত সরকার বসিয়ে একপক্ষীয় সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা পৃথিবীর কোনো দেশেই দীর্ঘ মেয়াদে কাজ করেনি। এখনো ঘোরের মধ্যে থাকলেও ভারত একসময় ঠেকেই শিখবে আঞ্চলিক সম্পর্কের বেলায় শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, ব্যবসা-বাণিজ্য—সর্বোপরি পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের মিশেলে সৌহার্দ্যটিও থাকতে হবে।
৪.
বাংলাদেশের নতুন সরকার একটি নতুন কূটনৈতিক অধ্যায় শুরু করতে চাইলে সার্ক পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নিতে হবে প্রথম দিন থেকেই। এটিই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একমাত্র সম্মানজনক পথ। আঞ্চলিক জোটে কোনো পক্ষকে মাথা নত করতে হয় না। উদ্যোগের সহজ ভাষ্য—সার্ক শক্তিশালী হলে লাভ সবার। বিভেদ-বিভাজন দক্ষিণ এশিয়াকে একটি শক্তিহীন অঞ্চলে পরিণত করবে। এতে বহিরাগত শক্তির সহজ শিকার হয়ে পড়ার ঝুঁকি সবারই সমান। অস্ত্রসম্ভার ও ভৌগোলিক আয়তনের বা অর্থনৈতিক শক্তির অহমিকা দিয়ে এই শক্তিহীনতা কাটানো সম্ভব নয়।
সার্ক বিষয়ে ভারত বরাবরই অনাগ্রহী। বড় দেশ হওয়ার উন্নাসিকতা থেকে দেশটি বিকল্প আঞ্চলিক জোট বিমসটেক গঠন করেছিল। বিমসটেক মূলত সার্ককে পাশ কাটিয়ে ভারতকেন্দ্রিক একটি ভূরাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়াস ছিল। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এ কাঠামোয় নিজেদের সম্মানজনক অবস্থান খুঁজে পায়নি। ফলে বিমসটেক কখনোই সার্কের বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি এবং পারবেও না। বাস্তবে বিমসটেকের সফল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
বাংলাদেশ এমনই এক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক ভাবনাটিই আগেভাগে ভেবে রাখা জরুরি। নতুন সরকারও যদি পুরোনো দ্বিপক্ষীয় ছকেই হাঁটতে থাকে, তাহলে হয় ভারতের বশ্যতা, নয় শত্রুতা, ঘৃণা ও পারস্পরিক অসম্মানই বাড়বাড়ন্ত হবে। কিন্তু সাহসিকতার সঙ্গে সার্ক পুনরুজ্জীবনের মতো একটি বড়, সম্মানজনক ও ঐতিহাসিক উদ্যোগ নিলে সেটিই হবে বরফ গলানোর বাস্তব পদক্ষেপ। রিকনসিলিয়েশনের জন্য একটি সুন্দর প্ল্যাটফর্ম দরকার—সার্কই হতে পারে সেই যথার্থ প্ল্যাটফর্ম।
আঞ্চলিক জোট টেকসই হয় তখনই, যখন সেটি পারস্পরিক সমতা, সম্মান ও যৌথ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। সার্কের সেই সম্ভাবনা এখনো অটুট। সার্কের উদ্যোক্তা বাংলাদেশের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দূরদৃষ্টি দেখিয়েছিলেন। তাঁর হাতে গড়া দল বিএনপি তো বটেই, অন্যান্য দল–জোটও তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সার্ক পুনরুজ্জীবনের অঙ্গীকার যুক্ত করতে পারে। প্রতিশ্রুতিটি থাকলে ভোটাররাও জানবেন ইতিবাচক ভূরাজনীতি বিষয়ে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সদিচ্ছা ও সক্রিয়তা রয়েছে।
হেলাল মহিউদ্দীন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটার মেভিল স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সমাজবিজ্ঞান অধ্যাপনায় নিয়োজিত
*মতামত লেখকের নিজস্ব
[১০ জানুয়ারি ২০২৬ প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণে এ লেখা ‘সার্কের পুনরুজ্জীবন কূটনৈতিক অগ্রাধিকার হওয়া উচিত’—শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে।]
