জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চরম ঝুঁকির মধ্যে আছে সুন্দরবন। সমুদ্রতল থেকে সুন্দরবনের গড় উচ্চতা এক মিটারেরও কম। নাসার গবেষণা অনুযায়ী, প্রতিবছর সমুদ্রতলের উচ্চতা বাড়ছে ৩ দশমিক ২ মিলিমিটার হারে। এ কারণে সমুদ্রতলের উচ্চতা বেড়ে সুন্দরবন বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। তা ছাড়া ক্রমবর্ধমান ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে সুন্দরবনের উপকূলীয় এলাকা বর্তমানে প্রবল ভাঙনের মুখে। বিশেষ করে কচিখালী, কটকা, দুবলা, হিরণ পয়েন্ট ও মান্দারবাড়িয়া এলাকার গাছপালা ও বনভূমি বিলীন হচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে। এসব এলাকার নদীর দুই পাড় ভেঙে বিলীন হচ্ছে বনভূমি।

গত বছরের ডিসেম্বর মাসে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদের সময় সুন্দরবনের ভূমিতল জোয়ারের পানিতে নিমজ্জিত ছিল দীর্ঘ সময়। ওই সময় স্থলচর স্তন্যপায়ী, যেমন: বাঘ, হরিণ, বুনো শুয়োরের কী অবস্থা হয়েছিল, আমরা ধারণা করতে পারি। এ কারণে ভবিষ্যতে সুন্দরবন বাঘের জন্য একটি অনিরাপদ আবাসে পরিণত হবে—এমনটি অনুমান করা কঠিন নয়। সুতরাং দেশে বাঘ আছে—এমন গর্বের জায়গাটি জারি রাখতে হলে আমাদের এখনই প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে।

কাসালং সংরক্ষিত বনের আয়তন আনুমানিক ১ হাজার ৬৪৫ বর্গকিলোমিটার। ভারতের ৫১টি টাইগার রিজার্ভের মধ্যে অনেক রক্ষিত এলাকা কাসালং বনের চেয়ে আয়তনে ছোট। সে বিবেচনায় এখনো কাসালং বনের পরিধি বেশ ভালো, বিশেষত বাঘের জন্য। ভারতীয় উপমহাদেশে পুরুষ ও স্ত্রী বাঘের বিচরণ এলাকা (হোমরেঞ্জ) বিবেচনায় নিলে কাসালং বনে ১৫ থেকে ২০টি বাঘ থাকতে পারবে বলে ধারণা করি।

বিজ্ঞানীরা পৃথিবীতে ৩৬টি জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ এলাকা চিহ্নিত করেছেন। এলাকাগুলোর নাম দেওয়া হয়েছে বায়োডাইভারসিটি হটস্পট। এর মধ্যে আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলার অধিকাংশ এলাকা ইন্দো-বার্মা বায়োডাইভারসিটি হটস্পটের আওতাধীন। এ ছাড়া পার্বত্য এলাকাটি ‘নামদাফা-রয়্যাল মানাস গ্লোবাল প্রায়োরিটি টাইগার কনজারভেশন ল্যান্ডস্পেপ’-এর আওতাভুক্ত। ২০০৬ সালে পৃথিবীতে বাঘের বিচরণকৃত এলাকার মধ্যে পার্বত্য অঞ্চল ‘টাইগার রেস্টোরেশন ল্যান্ডস্কেপ’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অর্থাৎ এই এলাকা একসময় বাঘের আবাসভূমি ছিল বা এখনো আছে। চিহ্নিত এলাকা মেরামত বা পুনরুদ্ধার করে বাঘের উপযোগী করার প্রস্তাব করা হয়েছে ওই গবেষণাপত্রে। বাংলাদেশ বাঘ সংরক্ষণ কর্মপরিকল্পনাতেও পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঘের আবাস ও পপুলেশন নিশ্চিত করার কথা বলা আছে।

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার উত্তর-পূর্ব এলাকার কাসালং সংরক্ষিত বন তুলনামূলকভাবে এখনো অক্ষত। নানা প্রজাতির গাছপালা, পাহাড়-নদী-ছড়াসমৃদ্ধ ভূমির কারণে এ এলাকায় এখনো বিরল প্রজাতির নানা বুনো প্রাণী টিকে আছে। আছে স্থলভাগের সবচেয়ে বড় প্রাণী এশীয় হাতি, দুই প্রজাতির ভালুক, তিন প্রজাতির হরিণ, চিতা, লামচিতা, সোনালি বিড়াল, বুনো শুয়োর, বনগরু, বনছাগলসহ বৃহদাকার নানা স্তন্যপায়ী প্রাণী। প্রাথমিক কিছু গবেষণা থেকে কাসালং বনে বাঘ থাকার উপযোগী পরিবেশ আছে—এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়। চিরসবুজ নিবিড় বনাঞ্চল ছাড়াও কাসালং সংরক্ষিত বনের চারপাশে রয়েছে খণ্ড খণ্ড পাহাড়ি বন। ক্রমবর্ধমান মানুষের বসতবাড়ি ও চাষাবাদের থাবা থেকে কাসালং এখনো মুক্ত। বাঘের উপস্থিতিও অসম্ভব নয়।

কাসালং সংরক্ষিত বনের আয়তন আনুমানিক ১ হাজার ৬৪৫ বর্গকিলোমিটার। ভারতের ৫১টি টাইগার রিজার্ভের মধ্যে অনেক রক্ষিত এলাকা কাসালং বনের চেয়ে আয়তনে ছোট। সে বিবেচনায় এখনো কাসালং বনের পরিধি বেশ ভালো, বিশেষত বাঘের জন্য। ভারতীয় উপমহাদেশে পুরুষ ও স্ত্রী বাঘের বিচরণ এলাকা (হোমরেঞ্জ) বিবেচনায় নিলে কাসালং বনে ১৫ থেকে ২০টি বাঘ থাকতে পারবে বলে ধারণা করি। যদিও বাঘের এই সংখ্যা নির্ভর করবে প্রধানত বনে কী পরিমাণ বাঘের শিকার-প্রাণী আছে তার ওপর।

পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য আজ চরম হুমকির মুখে। বুনো প্রাণীর শিকার ও বনাঞ্চলের বিনাশ ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে। সম্প্রতি এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ক্রমবর্ধমান ফলবাগান। পার্বত্য এলাকায় অনুপ্রবেশকারী পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের ফলবাগান থেকে কাসালং বনটি রক্ষা পাবে—এমন প্রত্যাশা অনেকের। প্রাকৃতিক বনাঞ্চল রক্ষা করতে না পারলে পাহাড়ি ছড়ার যেমন অপমৃত্যু ঘটবে, হাজার বছরে গড়ে ওঠা প্রতিবেশ ব্যবস্থা বিনষ্ট হবে, তেমনি বসবাসকারী মানুষের জীবন নেমে আসবে দীর্ঘমেয়াদি নানা বিপর্যয়।

কাসালং বনে বাঘের আবাস নিশ্চিত করতে আমাদের পদক্ষেপ কী হবে? কাসালং বনে বাঘ ফিরিয়ে আনতে হলে বা পুনঃপ্রবর্তন করতে হলে বাঘের শিকার-প্রাণী ও আবাসের উপযুক্ততার ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা করতে হবে দ্রুততার সঙ্গে। এর মাধ্যমে বনটিতে কোন কোন প্রজাতির কী পরিমাণ বাঘের শিকার-প্রাণী আছে, সেটি জানা যাবে; একই সঙ্গে বাঘের উপস্থিতি-অনুপস্থিতির ওপর একটি পরিষ্কার ধারণাও আমরা পাব। কাসালং বনটি ভারতের ডামপা টাইগার রিজার্ভ থেকে খুব বেশি দূরে নয়। তা ছাড়া সীমান্তবর্তী হওয়ায় এলাকাটি বেশ দুর্গম। বর্তমানে কাসালং বনে বাঘ না থাকলেও বাঘের শিকার-প্রাণী রক্ষা করতে পারলে ডামপা থেকে বাঘ এখানে এসে উপযুক্ত আবাস পেয়ে স্থায়ী হবে—এমনটি ধারণা করি। তাই আমাদের প্রথম কাজ হবে বনে টিকে থাকা বুনো প্রাণীর চোরা শিকার বন্ধ করা। দ্বিতীয়ত, চারপাশ থেকে ক্রমে এগিয়ে আসা স্থানীয় মানুষের চাষাবাদ ও বনজ সম্পদ আহরণ নিয়ন্ত্রণ করা। স্থানীয় সব অংশীজনকে নিয়ে দ্রুততার সঙ্গে কাসালং বনের সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রয়োগযোগ্য একটি কৌশলপত্র প্রণয়ন জরুরি। প্রয়োজনে স্থানীয় সব পক্ষকে নিয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে।

  • ড. এম এ আজিজ বাঘ গবেষক এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক।

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন