‘তরুণ’ শহরের বৃদ্ধরা 'অদৃশ্য' কেন

প্রতীকী ছবিছবি: প্রথম আলো

শহরের ঝলমলে রাস্তায় তাকালে মূলত ব্যস্ত নগরের তরুণ মুখগুলোই আমাদের চোখে পড়ে। ক্যাফে, শপিং মল, অফিসপাড়া আর ডিজিটাল স্ক্রিনের নীল আলোয় যে প্রাণচঞ্চল জীবন, সেটিকেই আমরা জীবনের মূলস্রোত বলে ধরে নিই।

কর্মব্যস্ত সকাল, দ্রুত হাঁটা পা, কানে হেডফোন, চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন—সবখানেই উদ্দীপনা, নতুন উচ্চতা ছোঁয়ার প্রচেষ্টা; কিন্তু এই একমুখী গন্তব্যের কোলাহল আর চাকচিক্যের আড়ালে চার দেয়ালের ভেতর তীব্র শীতে জবুথবু হয়ে পড়ে আছেন অগণিত অসহায় প্রবীণ মানুষ।

এসব মানুষের আলোহীন, আশাহীন, আনন্দহীন ঘরগুলো যেন শহরের মানচিত্রেই নেই। ছোট ছোট সেই ঘরে দিন-রাতের পার্থক্য মুছে যায়। সূর্যের আলো ঢুকলেও সেখানে যেন পুরোটাই রাত।

বিশ্ব প্রেক্ষাপট: এক নীরব মহামারি

একাকিত্ব বা ‘লোনলিনেস’ এখন উন্নত বিশ্বে এক নীরব মহামারি হিসেবে স্বীকৃত। ‘সিলভার ইকোনমি’ নিয়ে আলোচনা হলেও প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি এখনো যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।

বিশ্বজুড়ে জনসংখ্যা দ্রুত বার্ধক্যের দিকে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রতি ছয়জন মানুষের একজনের বয়স হবে ৬৫ বছরের বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবীণদের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকলেও পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা সেখানে একটি বড় সংকট। অনেক প্রবীণ ‘নার্সিং হোম’ বা ‘অ্যাসিস্টেড লিভিং’-এ থাকলেও প্রিয়জনদের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত থাকেন।

তরুণেরা তাঁদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান দিয়ে প্রবীণদের বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত করতে পারেন। পাড়া বা মহল্লায় প্রবীণদের জন্য নির্দিষ্ট মিলনস্থল কিংবা ‘বুক রিডিং ক্লাব’ গড়ে তোলা যেতে পারে, যেখানে তাঁরা আবার নিজেদের সক্রিয় অনুভব করবেন। সমবয়সীদের সঙ্গে সামনাসামনি যোগাযোগ ও স্মৃতিচারণার সুযোগ তৈরি হবে।

প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, আয়ু ও হাতে হাতে মুঠোফোন বাড়লেও একাকিত্ব কমেনি; বরং বেড়েছে। মার্কিন সার্জন জেনারেলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির প্রায় অর্ধেক প্রবীণ মানুষ একাকিত্বে ভোগেন, যা তাঁদের হৃদ্‌রোগ ও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

একাকিত্ব প্রবীণদের মধ্যে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ায়, হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ায় ২৯ শতাংশ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায় ৩২ শতাংশ। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা একজন প্রবীণ মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর দিনে ১৫টি সিগারেট খাওয়ার সমান ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশ: শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার গল্প

বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়, আমরা এখনো নিজেদের ‘তরুণ জনসংখ্যার দেশ’ বলে গর্ব করি; কিন্তু বাস্তবতা হলো—আগামী কয়েক দশকে এখানেও প্রবীণ মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়বে। সময়ের চাকা আজ যাঁদের হাতে গতি পাচ্ছে, তাঁরাও একদিন এই স্থবিরতার মুখোমুখি হবেন। আজকের তরুণই আগামী দিনের সেই ঘরবন্দী মানুষ।

গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন, যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারের বিস্তার, বিদেশগামী সন্তান—সব মিলিয়ে বহু বৃদ্ধ মা-বাবা আজ মানসিকভাবে ঘরবন্দী। ছাদ আছে, খাবার আছে, কিন্তু কথা বলার মানুষ নেই। আলো আছে; কিন্তু উষ্ণতা নেই।

বাংলাদেশে প্রবীণদের একটি বড় অংশ স্বাস্থ্যসেবা, আয়, চলাচল ও সামাজিক সহায়তার ঘাটতিতে ভোগেন। সামাজিক সংযোগ কমে যাওয়া, পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তাঁদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যকে আরও দুর্বল করে তুলছে। বয়স্ক ভাতা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থাকলেও এর আওতা ও সেবার গুণগত মান বাড়ানো জরুরি—বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবহন ব্যবস্থায় প্রবীণবান্ধব কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে।

এ ছাড়া বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশে বার্ধক্য নিয়ে সামাজিক আলোচনা এখনো সীমিত। পরিবারকেন্দ্রিক যত্নব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ায় ভবিষ্যতে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে।

বাংলাদেশে একসময় যৌথ পরিবারের সংস্কৃতিই ছিল প্রবীণ বয়সের প্রধান ভরসা; কিন্তু নগরায়ণ ও জীবিকার প্রয়োজনে ছোট পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে। প্রবীণেরা শুধু শারীরিক অসুস্থতায় নয়, বরং ‘অপ্রয়োজনীয়’, ‘অপ্রাসঙ্গিক’, ‘অগুরুত্বপূর্ণ’ কিংবা ‘অতিরিক্ত’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার মানসিক যন্ত্রণায় ভোগেন।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সন্তানেরা প্রবাসে বা অন্য শহরে ব্যস্ত, আর মা-বাবা অন্ধকার ঘরে সূর্যের আলোর চেয়েও বেশি অপেক্ষা করেন একটুখানি আপন মানুষের সঙ্গে কথা বলার জন্য। তাঁদের জীবন থেকে সঙ্গ ও প্রসঙ্গ—দুটিই যেন হঠাৎ হারিয়ে গেছে। ‘তাঁদের’ বলছি কেন? আমি, আপনি, আমরা সবাইই সেই অবধারিত গন্তব্যের যাত্রী।

জীবনের দর্শন: আলো ও গতির খেলা

এই পৃথিবী মূলত একটি মৃত, অন্ধকার গ্রহ—তার নিজের কোনো আলো নেই। সূর্য কোটি কোটি বছর ধরে আলো বিকিরণ করে এই পৃথিবীতে প্রাণ সঞ্চার করছে। কোটি বছর ধরে প্রাণ টিকে আছে কেবল এই আলোর কারণেই। মহাজাগতিক দৃষ্টিতে আমরা সবাই এই অন্ধকার গ্রহেরই বাসিন্দা। আলো কেবল ধার করা, আর সেই আলোও চিরস্থায়ী নয়। এক দিন তা নিভে যাবে, থেমে যাবে কোলাহল।

বৃদ্ধ বয়সে অনেকেই ধীরে ধীরে নিজের কক্ষের চার দেয়ালের ভেতর বন্দী হয়ে পড়েন। শহরের আলো তাঁদের ছুঁতে পারে না; বাইরের কোলাহল ও ভিড় থেকেও তাঁরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। জীবনের শেষ অধ্যায় যেন পরিণত হয় এক দীর্ঘ, নীরব রাতে।

আরও পড়ুন

মানুষ সামাজিক প্রাণী—নাম, পরিচয়, সম্পর্ক ও সঙ্গই জীবনের অর্থ তৈরি করে। সামান্য একটি ফুটবলের সংস্পর্শে এসেও অনেক মানুষ বড় খেলোয়াড় হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেন। তেমনি মানুষের জীবনও অর্থ পায় সংযোগের স্ফুলিঙ্গে, সম্পর্কের আলোয়। প্রবীণরা যখন এই আলো থেকে বিচ্ছিন্ন হন, তখন তাঁদের জীবন থমকে যায়।

অনেক কিছুর সমাবেশে যেমন নতুন কিছু তৈরি হয়, তেমনি সমাজও গড়ে ওঠে সম্পর্কের সমাবেশে; কিন্তু যখন সেই সম্পর্কগুলো নড়ে না, তখন সময় যেন মৃত হয়ে যায়—স্থির ছবির মতো। সম্পর্কহীন জীবনে অনুভূতিও হয়ে পড়ে মৃত। তাই আমাদের প্রবীণ মানুষদের আলোতে, আনন্দে ফিরিয়ে আনতে হবে; আর তা সম্ভব তরুণদের হাত ধরেই।

যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রবীণ ও তরুণ প্রজন্মকে যুক্ত করতে ‘ইন্টারজেনারেশনাল কানেকশন’ অর্থাৎ তরুণ ও প্রবীণদের মধ্যে পরিকল্পিত সংযোগ বা একত্রে থাকার নতুন মডেল নিয়ে কাজ হচ্ছে। সেখানে কলেজ শিক্ষার্থীরা স্বল্প ভাড়ায় প্রবীণদের সঙ্গে থাকছেন এবং বিনিময়ে সময় দিচ্ছে। জাপানে তরুণেরা প্রযুক্তি শেখাচ্ছেন আর প্রবীণেরা শেখাচ্ছেন জীবনের গল্প ও অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশেও এমন উদ্যোগ প্রয়োজন—পাড়ায় পাড়ায়, স্কুলে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ও সামাজিক সংগঠনে।

তরুণদের ভূমিকা: আলোর মশাল

শহরের এই তরুণ মুখগুলোই পারে অন্ধকার ঘরগুলোর জানালা খুলে দিতে। এটি কেবল করুণা নয়; বরং একটি নৈতিক বিনিয়োগ। ডিজিটাল যুগের ব্যস্ততার মধে৵ও দিনে অন্তত কিছু সময় ডিভাইস থেকে দূরে রেখে পরিবার বা সমাজের প্রবীণদের সঙ্গে গল্প করতে হবে।

তরুণেরা তাঁদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান দিয়ে প্রবীণদের বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত করতে পারেন। পাড়া বা মহল্লায় প্রবীণদের জন্য নির্দিষ্ট মিলনস্থল কিংবা ‘বুক রিডিং ক্লাব’ গড়ে তোলা যেতে পারে, যেখানে তাঁরা আবার নিজেদের সক্রিয় অনুভব করবেন। সমবয়সীদের সঙ্গে সামনাসামনি যোগাযোগ ও স্মৃতিচারণার সুযোগ তৈরি হবে।

প্রয়োজন মহল্লাভিত্তিক প্রবীণ-তরুণ মেলবন্ধন কর্মসূচি, কমিউনিটি সেন্টার ও ডে-কেয়ারে সামাজিকীকরণ বৃদ্ধি, প্রবীণবান্ধব গণপরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রযুক্তি সহায়তা গড়ে তোলা। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগে একাকী প্রবীণদের নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া এবং প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

আজকের তরুণেরাই আগামী দিনের প্রবীণ। তাই এখনই উদ্যোগ নিতে হবে—যাতে শহরের অদেখা রাতগুলোও আবার আলোয় ভরে ওঠে। যে গাছটি আজ ছায়া দিচ্ছে, একদিন সেটিও ছিল একটি চারা। আজকের তরুণেরা যদি প্রবীণদের হাত ধরে আলোতে নিয়ে না আসেন, তবে ভবিষ্যতে তাঁদের জন্যও কোনো আলো অপেক্ষা করবে না।

আসুন, নিভে যাওয়ার আগেই আমরা একে অপরের বাতি হয়ে উঠি। কারণ, কোলাহল থেমে গেলে কেবল অন্ধকারই পড়ে থাকে—আর সেই অন্ধকারে কেউই একা থাকতে চায় না। প্রবীণরা আমাদের অতীত, তরুণেরা আমাদের ভবিষ্যৎ; কিন্তু বর্তমান তৈরি হয় তখনই, যখন দুই পক্ষ একে অপরের হাত ধরে। শহরের তরুণ চেহারার আড়ালে থাকা অদৃশ্য বৃদ্ধদের আলোতে আনাই আজ আমাদের বিস্মৃতপ্রায়, অথচ অতীব জরুরি সামাজিক দায়বদ্ধতা।

  • আরিফ মাহমুদ যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী লেখক

    *মতামত লেখকের নিজস্ব