হ্যাঁ, ট্রাম্প বিশ্বকে পরিত্যাগ করে চলে গেছেন

দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে বক্তব্য দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পছবি: রয়টার্স

২৭ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে নেওয়া প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে। এর কিছুদিন আগেই ৭ জানুয়ারি তিনি ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র আরও ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে বেরিয়ে যাবে। এর মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘের অধীন ৩১টি সংস্থা এবং জাতিসংঘের বাইরে থাকা ৩৫টি আন্তর্জাতিক সংস্থা। ওই সংস্থাগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মনে করছে।

এক মাসের মধ্যে কোনো দেশের নেতা এত ব্যাপকভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন, এমন দৃষ্টান্ত আগে কখনো দেখা যায়নি। শুধু তা-ই নয়, ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, ‘আমার আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজন নেই।’ কয়েক সপ্তাহ আগে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন। সেখানে তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে কখন আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য হবে, তা তিনি একাই ঠিক করবেন। তাঁর ক্ষমতার সীমা কেবল তাঁর ‘নিজস্ব নৈতিকতা’ ঠিক করবে, কোনো আইন নয়।

আরও পড়ুন

ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু এতে একটি বড় সত্য আড়ালে থেকে যাচ্ছে। বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নীতির কারণে ইতিমধ্যেই মানুষের দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। গত এক বছরে ট্রাম্প প্রশাসন বৈশ্বিক মানবিক সহায়তা ও স্বাস্থ্য কর্মসূচির অর্থ বড় আকারে কমিয়ে দিয়েছে। সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের হিসাব অনুযায়ী, এর ফলে প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হতে পারে।

বার্সেলোনা ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল হেলথ ও অন্যান্য সংস্থার করা একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ একসঙ্গে সহায়তা কমালে ২০৩০ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ২ কোটি ২৬ লাখ পর্যন্ত অতিরিক্ত মৃত্যু ঘটতে পারে। এর মধ্যে ৫৪ লাখ শিশু, যাদের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বলছে, আন্তর্জাতিক সহায়তায় আরও বড় কাটছাঁট আসছে। ফলে এ মৃত্যুর হিসাব আরও বাড়াতে হতে পারে।

আমরা আগে থেকেই জানতাম, ট্রাম্প প্রশাসন ইউনেসকো, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা, ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের ত্রাণ সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ) এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) মতো সংস্থাগুলোকে টার্গেট করবে। কিন্তু এখন আমরা জানলাম, যুক্তরাষ্ট্র জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য বৈশ্বিক চুক্তির মূল কাঠামো জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন (ইউএনএফসিসিসি) থেকেও সরে যাচ্ছে। এক বছর পর এই প্রত্যাহার কার্যকর হবে।

এই কাঠামো ছেড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র হবে বিশ্বের প্রথম দেশ। একই সঙ্গে ট্রাম্পের নতুন ঘোষিত ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বোর্ড জাতিসংঘের শান্তি স্থাপন ও শান্তিরক্ষা উদ্যোগের বিকল্প হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করবে। অথচ জাতিসংঘের এসব উদ্যোগ দীর্ঘদিন ধরেই পর্যাপ্ত অর্থায়ন পায় না। এটি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতিতে একটি বড় ও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ‘আমেরিকান জনগণের রক্ত, ঘাম ও অর্থ এসব প্রতিষ্ঠানে ঢালা আর গ্রহণযোগ্য নয়, যখন এর বদলে খুব কমই পাওয়া যায়।’ কিন্তু দরিদ্র দেশগুলোর নারী ও কিশোরীদের কষ্ট লাঘবে কাজ করা সংস্থাগুলোর কারণে নাকি আমেরিকানরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—এই দাবি সম্পূর্ণ অসৎ। এতে মনে হয়, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণায় বলা ‘জীবন, স্বাধীনতা ও সুখের অনুসন্ধান’ অধিকার এখনো শুধু পুরুষদের জন্যই প্রযোজ্য।

আরও পড়ুন

এই সংস্থাগুলো আশ্রয়কেন্দ্র চালায়, আইনি সহায়তা দেয়, মানসিক সহায়তা দেয়। তারা বাল্যবিবাহ ও জোরপূর্বক যৌনাঙ্গ বিকৃতি বন্ধে কাজ করে। বিশ্বের বহু সংঘাতপূর্ণ এলাকায় বাস্তুচ্যুত নারীরা এখন নিরাপদ জায়গা হারাতে চলেছেন। রিপোর্ট বলছে, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সংঘাত-সম্পর্কিত যৌন সহিংসতা ২৫ শতাংশ বেড়েছে।

জাতিসংঘ মনে করে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে শিশুদের সুরক্ষা খুবই জরুরি। এ কারণেই শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা রোধে কাজ করা দপ্তর এসআরএসজি-ভিএসি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করে, যাতে নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা ভালো করা যায়। একইভাবে ইউএনএফপিএ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এইচআইভি সংক্রমণ কমানোর জন্য বিভিন্ন কর্মসূচিতে অর্থ ও সহায়তা দেয়। কারণ, এই রোগ প্রজনন বয়সী নারী ও কিশোরীদের মৃত্যুর একটি বড় কারণ।

যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়ার এই আঘাত শুধু স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এতে মেয়েদের শিক্ষা সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাবে। ইতিমধ্যে বিশ্বে স্কুলের বাইরে থাকা মেয়ের সংখ্যা ১২ কোটি ২০ লাখ। এই সংখ্যা আরও বাড়বে। এর প্রভাব হবে দীর্ঘমেয়াদি ও ভয়াবহ। ট্রাম্প প্রশাসন ভুলভাবে ধরে নিচ্ছে যে আমেরিকান ও বিদেশি জনগণ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ভেঙে ফেলার পক্ষে। বাস্তবে অধিকাংশ মানুষই চায় দেশগুলো একসঙ্গে কাজ করুক।

৩৪টি দেশে পরিচালিত একটি জনমত জরিপে (যেখানে বিশ্বের সব অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত) ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ বলেছেন, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য, মানবাধিকার ও সংঘাত প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যাবশ্যক। মাত্র ৫-৬ শতাংশ মানুষ মনে করেন, এ ধরনের সহযোগিতা সময় ও অর্থের অপচয়।

আরও লক্ষণীয় বিষয় হলো অনেক দেশে মানুষ নিজের সরকারের চেয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থার ওপর বেশি আস্থা রাখে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতি বৈশ্বিক আস্থা ৬০ শতাংশ, আর সাব-সাহারান আফ্রিকায় তা ৮৫ শতাংশ। জাতিসংঘের প্রতি আস্থা ৫৮ শতাংশ। নারী ও মেয়েদের এগিয়ে নিতে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বিষয়ে মানুষকে জিজ্ঞেস করা হলে একই রকম সমর্থনই পাওয়া যেত। কারণ, নারী ও মেয়েরা সুযোগ পেলে সমাজ ও পৃথিবী দুটোই ভালো হয়। কিন্তু সংকটের সময়ে নারী ও মেয়েদের পাশে না দাঁড়ানো কোনোভাবেই টাকা বাঁচানোর সিদ্ধান্ত নয়। এর ক্ষতি বহু বছর ধরে, এমনকি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সমাজ ও অর্থনীতিকে ভোগাবে।

সবচেয়ে বড় কথা, এটা শুধু ভুল সিদ্ধান্ত নয়, এটা একটি গভীর নৈতিক ব্যর্থতা, যা আমাদের সবাইকে লজ্জিত করে।

  • গর্ডন ব্রাউন যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল হেলথ ফাইন্যান্সিংবিষয়ক রাষ্ট্রদূত

  • স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ