‘স্পিড মেন্টরিং’ শব্দটির সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না। ২০১৮ সালের অক্টোবরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত শোয়ার্জম্যান-রোডস সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণের সময় আয়োজকেরা যখন আমাকে কয়েকজন তরুণ স্কলারকে মেন্টরিং করার অনুরোধ করেন, তখনই প্রথম এ ধারণার সঙ্গে পরিচিত হই।
এক ঘণ্টার মধ্যে চারজন স্কলারের সঙ্গে ১৫ মিনিট করে আলাপ ছিল একটি অর্থবহ অভিজ্ঞতা। তাঁদের মধ্যে তিনজন তখন শিক্ষার্থী এবং একজন সদ্য কর্মজীবনে প্রবেশ করেছেন। এই স্পিড মেন্টরিং কার্যক্রমে আমরা যারা মেন্টরের ভূমিকায় ছিলাম, তাদের সবার বয়সই শিক্ষার্থীদের তুলনায় বেশি ছিল।
পেশাগত জীবনের বেশির ভাগ সময় জেনে এসেছি, মেন্টর হবেন বয়স ও অভিজ্ঞতায় বড় কেউ। ফলে আমার চেয়ে সিনিয়র দু-একজন আমার মেন্টর হয়েছেন আবার আমিও আমার জুনিয়র সহকর্মীদের মেন্টরিং করেছি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সম্পর্কটি নিয়ে নতুন করে ভাবছি।
বর্তমানে কর্মক্ষেত্রে একসঙ্গে পাঁচটি প্রজন্ম কাজ করছে—এমন বাস্তবতা ইতিহাসে আগে কখনো দেখা যায়নি। গবেষণা বলছে, বয়সগত বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ দল বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় ঘটাতে সক্ষম হয়। ফলে তারা বেশি উদ্ভাবনী ও উৎপাদনশীল হয় এবং তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানও উন্নত হয়।
একই সঙ্গে এ ধরনের পরিবেশকর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি করে।
বয়সে ও অভিজ্ঞতায় ছোটরা শিক্ষানবিশ হবে আর বড়রা মেন্টর—এ প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেই যেন নির্মিত হয়েছে ‘দ্য ইন্টার্ন’ চলচ্চিত্রটি। সেখানে অবসরপ্রাপ্ত প্রায় ৭০ বছর বয়সী বেন হুইটেকার একজন ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করেন তরুণ প্রধান নির্বাহী জুল অস্টিনের সঙ্গে, যার বয়স পঁচিশের কাছাকাছি। চলচ্চিত্রটি কর্মক্ষেত্রের এক নতুন বাস্তবতাও তুলে ধরে, যেখানে অনেককেই নিজের চেয়ে কম বয়সী সুপারভাইজারের সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে।
আমরা সাধারণত বৈচিত্র্য বলতে জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ, ধর্ম, ভাষা কিংবা জাতিগোষ্ঠীগত পরিচয়কে বুঝি। কিন্তু বয়সও বৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা। অবশ্য একটি প্রজন্মের সব মানুষ কখনোই এক রকম নন; প্রতিটি প্রজন্মের মধ্যেও রয়েছে ব্যাপক বৈচিত্র্য।
তারপরও নির্দিষ্ট সময়ের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার প্রভাবে কিছু প্রজন্মগত বৈশিষ্ট্য গড়ে ওঠে। ফলে এক প্রজন্মের সঙ্গে অন্য প্রজন্মের কিছু পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই পার্থক্য বিরোধ বা বিভাজনের কারণ হওয়া উচিত নয়।
বর্তমানে বাংলাদেশের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, এক প্রজন্ম অন্য প্রজন্মের দক্ষতা, জীবনাচরণ কিংবা দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে যথেষ্ট না জেনেই ঢালাও ও নেতিবাচক মন্তব্য করে। অনেক সময় প্রবীণেরা তরুণদের দায়িত্ববোধ, কর্মনৈতিকতা বা জীবনযাপন নিয়ে সমালোচনা করেন আবার তরুণেরাও প্রবীণদের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারা বা প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিদ্রূপ করেন। ফলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার জায়গায় তৈরি হয় দূরত্ব।
প্রজন্মগত বৈচিত্র্যকে আমরা প্রায়ই একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখি। অথচ বাস্তবে এটি একটি বড় সুযোগও হতে পারে। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিই তুলে ধরেছেন হোটেল খাতের উদ্যোক্তা ও লেখক চিপ কনলি টেডে দেওয়া এক বক্তৃতায় (‘হোয়াট বেবি বুমারস ক্যান লার্ন ফ্রম মিলেনিয়ালস অ্যান্ড ভাইস ভার্সা’)।
পারস্পরিক শেখার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই স্বীকার করতে হবে যে প্রতিটি প্রজন্মেরই নিজস্ব শক্তি রয়েছে। তরুণেরা নিয়ে আসেন প্রযুক্তিগত দক্ষতা, উদ্ভাবনী চিন্তা ও সমস্যা সমাধানে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। অন্যদিকে প্রবীণদের রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান, কৌশলগত বিচক্ষণতা, সম্পর্ক গড়ে তোলার দক্ষতা এবং জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলার অভিজ্ঞতা।
কনলি যখন এয়ারবিএনবিতে উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেন, তখন তাঁর বয়স ছিল ৫২ বছর। তিনি শুরুতে ভাবতেন, তরুণদের নেতৃত্বাধীন দ্রুতগতির প্রযুক্তিনির্ভর পরিবেশে তাঁর অবদান রাখার মতো আদৌ কিছু আছে কি না। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি উপলব্ধি করেন যে প্রথাগত হোটেল ব্যবসা সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান প্রযুক্তি খাতের জন্য খুব বেশি প্রাসঙ্গিক না হলেও নেতৃত্ব, কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং আবেগগত বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অত্যন্ত মূল্যবান।
অন্যদিকে কনলিও তাঁর তরুণ সহকর্মীদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছেন। ২৭ বছর বয়সী সহকর্মী লরা হিউজ তাঁর জন্য একধরনের ‘প্রযুক্তি অনুবাদক’-এর ভূমিকা পালন করেন। তিনি কনলিকে প্রযুক্তি খাতের ভাষা, সংস্কৃতি এবং ডিজিটাল কাজের পদ্ধতি বুঝতে সাহায্য করেন। বিনিময়ে কনলি তাঁকে শেখান কীভাবে কেবল পরিসংখ্যান ও সূচকের ওপর নির্ভর না করে মানবিক নেতৃত্বের মাধ্যমে অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে হয়।
এয়ারবিএনবির অনেক তরুণ কর্মীও কনলির কাছ থেকে শিখতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এই পারস্পরিক শিক্ষার মাধ্যমেই তাঁরা সেবার মান ও ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে সক্ষম হন। কনলি ‘মডার্ন এল্ডার’ বা আধুনিক প্রবীণের একটি ধারণা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, আজকের বিশ্বে একজন মানুষ একই সঙ্গে মেন্টর ও ইন্টার্ন—উভয় ভূমিকাতেই থাকতে পারেন।
পারস্পরিক শেখার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই স্বীকার করতে হবে যে প্রতিটি প্রজন্মেরই নিজস্ব শক্তি রয়েছে। তরুণেরা নিয়ে আসেন প্রযুক্তিগত দক্ষতা, উদ্ভাবনী চিন্তা ও সমস্যা সমাধানে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। অন্যদিকে প্রবীণদের রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান, কৌশলগত বিচক্ষণতা, সম্পর্ক গড়ে তোলার দক্ষতা এবং জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলার অভিজ্ঞতা।
কর্মক্ষেত্রে যখন প্রতিযোগিতার পরিবর্তে পারস্পরিক শেখার পরিবেশ তৈরি হয়, তখন প্রত্যেকেই উপকৃত হন এবং আরও কার্যকরভাবে কাজ করা সম্ভব হয়।
এ ধরনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে প্রয়োজন সচেতন উদ্যোগ। মিশ্র বয়সের দল গঠন, মেন্টরিং ও রিভার্স মেন্টরিং কর্মসূচি, সহকর্মীদের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময় সেশন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া পারস্পরিক শেখাকে উৎসাহিত করতে পারে।
একই সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট প্রজন্ম সম্পর্কে প্রচলিত ধ্যানধারণা ও স্টেরিওটাইপকে চ্যালেঞ্জ করা জরুরি। কারণ, প্রত্যেক মানুষের কাজের ধরন, যোগাযোগের পদ্ধতি ও জীবন-অভিজ্ঞতা আলাদা। এই বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং প্রত্যেককে সম্মান করা প্রয়োজন।
সমাজেও এমন পরিসর তৈরি করা দরকার, যেখানে বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষ একে অপরের সঙ্গে মতবিনিময় করতে পারে এবং পরস্পরকে জানার সুযোগ পায়। পূর্বনির্ধারিত ধারণার বশবর্তী না হয়ে খোলামনে অন্যের চিন্তাভাবনা শোনার ও বোঝার চর্চা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
সবচেয়ে সফল কর্মক্ষেত্র কিংবা সমাজ সেটি নয়, যেখানে একটি প্রজন্ম নেতৃত্ব দেয় আর অন্য প্রজন্ম কেবল অনুসরণ করে; বরং সফলতা আসে তখনই, যখন সবাই একই সঙ্গে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী হওয়ার মানসিকতা ধারণ করে।
দ্রুত পরিবর্তনশীল এই বিশ্বে কোনো একক প্রজন্মের কাছে সব উত্তর নেই। প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা ও প্রজ্ঞার সমন্বয়ই আমাদের এগিয়ে নিতে পারে। তাই প্রজন্মের পার্থক্যকে বিভাজনের কারণ হিসেবে না দেখে সেটিকে শেখা ও সহযোগিতার সুযোগ হিসেবে দেখতে শিখতে হবে। এটাই হতে পারে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, উদ্ভাবনী ও মানবিক সমাজ গঠনের ভিত্তি।
লায়লা খন্দকার উন্নয়নকর্মী
