যুদ্ধ ছাড়াই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যেভাবে জয়ী হতে পারে তুরস্ক

রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুছবি: এএফপি ও রয়টার্স

দুর্বলতা বলে মনে হলেও কখনো কখনো ধৈর্য ও সংযমই সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। ১৮ আগস্ট সিরিয়ার আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলের হামলা এবং তার পরপরই ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যকার সরাসরি সতর্কবার্তা একটি বিপজ্জনক প্রশ্ন নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে: তুরস্ক ও ইসরায়েল কি সিরিয়ায় যুদ্ধের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে?

ইসরায়েলের সামরিক শক্তি যেখানে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী, আঙ্কারার উচিত সেই ময়দানটি এড়িয়ে চলা। ইসরায়েলে কোনো হামলা না চালিয়েও তুরস্ক কিন্তু আঞ্চলিক সুবিধাজনক অবস্থান সুসংহত করছে: তারা দামেস্কে একটি বন্ধুভাবাপন্ন সরকার গঠনে সাহায্য করছে, লেবানন ও লোহিত সাগর এলাকায় প্রভাব বাড়াচ্ছে, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গভীর করছে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নতি ঘটাচ্ছে। একটি যুদ্ধ তুরস্কের এই সব অর্জনকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

এখানে ‘জয়ী হওয়া’ বলতে ইসরায়েলকে পরাজিত বা ঘেরাও করা বোঝায় না। তুরস্ক অনেক কম খরচে এবং ঝুঁকি না নিয়ে সুবিধাজনক কৌশলগত অবস্থান তৈরি করছে।

সিরিয়া: যেখানে দুটি কৌশল মুখোমুখি দাঁড়িয়ে

সিরিয়াকে ঘিরে দুটি দেশের দ্বন্দ্ব একেবারেই স্পষ্ট, কারণ তাদের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ বিপরীত। তুরস্ক চায় একটি ভূখণ্ডগতভাবে ঐক্যবদ্ধ সিরিয়া, যা নিজের সীমানা রক্ষা করতে পারবে, আইএস ও পিকেকে-সংলগ্ন হুমকি দমন করবে এবং শরণার্থীদের নিজ দেশে ফিরে আসার পরিবেশ তৈরি করবে।

অন্যদিকে, ইসরায়েল চায় একটি দুর্বল ও সীমাবদ্ধ সিরিয়া: যেখানে থাকবে দুর্বল বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সীমিত ভারী অস্ত্র, গোলান মালভূমির কাছে কোনো শত্রুভাবাপন্ন বাহিনী না থাকা এবং ইসরায়েলের জন্য অবাধ সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার স্বাধীনতা।

এই মতবিরোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে ২০২৫ সালের এপ্রিলে। তুরস্কের একটি প্রতিনিধিদল যখন টি-ফোর, পালমিরা এবং হামার বিমানঘাঁটিগুলোতে গভীর প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়ে পর্যবেক্ষণ করছিল, ঠিক তখনই ইসরায়েল ওই স্থানগুলোতে ভারী বোমা হামলা চালায়।

আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটির হামলাও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। সিরিয়ার কর্মকর্তারা দাবি করেন, হামলার ঠিক আগেই সেখানে তুর্কি প্রতিনিধিদলের সফর ছিল, যদিও আঙ্কারা হামলার সময় বা ঠিক আগে কোনো প্রতিনিধিদলের উপস্থিতির কথা অস্বীকার করে। ইসরায়েল দাবি করে সেখানে তুর্কি বাহিনী মোতায়েনের প্রস্তুতি চলছিল; কিন্তু সিরিয়া ও তুরস্ক তা অস্বীকার করে।

দামেস্ক সরকার যত তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে, নিজেদের সশস্ত্র বাহিনীকে পুনর্গঠিত করবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুদ্ধার করবে, সিরিয়াকে একটি দুর্বল ও নিরাপত্তাহীন রাষ্ট্র হিসেবে ফেলে রাখা ইসরায়েলের জন্য ততটাই কঠিন হয়ে পড়বে।

এটি তুরস্কের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তবে যুদ্ধের কোনো কারণ হতে পারে না। ইসরায়েল রানওয়ে ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু তারা একটি স্থিতিশীল সিরিয়া রাষ্ট্র তৈরি করতে পারবে না। বাণিজ্য, জ্বালানি ও প্রশিক্ষণের জন্য তুরস্কের ওপর দামেস্কের নির্ভরতা মুছে ফেলতে পারবে না। সিরিয়াকে কেন্দ্র করে তুরস্ক-ইসরায়েল যুদ্ধক্ষেত্রে রূপ না নিলে শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি আঙ্কারার পক্ষেই থাকবে।

আরও পড়ুন

ঘেরাও না করে নিয়ন্ত্রণ

তুরস্কের কৌশল হলো সম্পর্কের জাল বিছিয়ে ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক, প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি এবং প্রতিরক্ষামূলক জোট গঠনের মাধ্যমে ইসরায়েলের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করা, যা কোনো বোমা হামলা দিয়ে ধ্বংস করা সম্ভব নয়।

সোমালিয়ায় গঠিত ‘ক্যাম্প টার্কসম’-এর মাধ্যমে তুর্কি বাহিনী সোমালি সেনাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। আঙ্কারা এডেন উপসাগরে তাদের উপস্থিতি শক্তিশালী করেছে। এর ফলে ইসরায়েল ও বৈশ্বিক নৌ- চলাচলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালির ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও তুরস্কের একটি পরোক্ষ প্রভাব তৈরি হয়েছে।

লোহিত সাগরের পশ্চিম তটে অবস্থিত ‘পোর্ট সুদান’ এতে আরেকটি কৌশলগত মাত্রা যোগ করেছে। সেখানে তুরস্কের কোনো সামরিক ঘাঁটি নেই; কিন্তু সেনাসমর্থিত সুদান সরকারের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। সোমালিয়া এবং বহুজাতিক নৌ-নিরাপত্তা জোটের মাধ্যমে তুরস্ক কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল দখল না করেও রসদ সরবরাহ ও অংশীদারত্বের মাধ্যমে বড় কৌশলগত সুবিধা পাচ্ছে।

আরও পড়ুন

তবে সিরিয়া এখনো সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বাধীন দামেস্ক সরকারের সঙ্গে আঙ্কারার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সামরিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।

দামেস্ক সরকার যত তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে, নিজেদের সশস্ত্র বাহিনীকে পুনর্গঠিত করবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুদ্ধার করবে, সিরিয়াকে একটি দুর্বল ও নিরাপত্তাহীন রাষ্ট্র হিসেবে ফেলে রাখা ইসরায়েলের জন্য ততটাই কঠিন হয়ে পড়বে।

লেবানন এতে অতিরিক্ত কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। আঙ্কারা একটি নতুন প্রস্তাব নিয়ে ভাবছে, যেখানে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েল তাদের সেনা প্রত্যাহার করবে এবং লেবানন সরকার সব অস্ত্রের ওপর নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে।

ইসরায়েলের সামরিক শক্তি কোনো নতুন আঞ্চলিক পরাশক্তি তৈরি করতে পারেনি

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধও প্রমাণ করে যে সামরিক সাফল্য আর রাজনৈতিক সাফল্য এক নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং শীর্ষ নেতাদের মৃত্যু হলেও ইরানি রাষ্ট্র ধ্বংস হয়ে যায়নি। তেহরান তাদের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নতুন করে প্রভাব তৈরি করেছে, যার ফলে এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলো এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

আঙ্কারার উচিত হবে না কোনো সাময়িক উসকানিতে পা দিয়ে নিজেদের এত দিনের সফল কৌশলকে ধ্বংস করা। ইসরায়েল যে যুদ্ধটিতে বেশি পারদর্শী, সেই যুদ্ধে না জড়িয়ে বরং রাজনৈতিক ময়দানে জিতে যাওয়ার বর্তমান কৌশল ধরে রাখাই তুরস্কের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

ইসরায়েল সেখানে কৌশলগতভাবে পরাজিত হয়নি ঠিকই, কিন্তু তাদের এই সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে একটি স্থিতিশীল বা ইসরায়েলবান্ধব রাজনীতিতে রূপান্তর করতেও ব্যর্থ হয়েছে।

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ককে নিয়ে গঠিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ এই নতুন ভাবনারই প্রতিফলন, যেখানে কোনো এক দেশের ওপর আক্রমণকে সবার ওপর আক্রমণ বলে গণ্য করার বিধান রয়েছে, যদিও এর বাধ্যবাধকতা এখনো কিছুটা অস্পষ্ট। আঙ্কারার উচিত একে ইসরায়েল বা ইরান—কারও বিরুদ্ধেই সরাসরি ব্যবহার না করা; এর মূল শক্তি হলো প্রতিরোধে, কোনো আক্রমণাত্মক জোটে নয়।

তুরস্ক যদি নিজে থেকে কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তবে তাদের এই অর্জন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তুরস্ককে সমর্থন করা নাকি ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করা—এই দ্বন্দ্বে পড়লে উভয় দেশই নিষ্ক্রিয় থাকবে; ফলে তুরস্ক অনেক বন্ধু নিয়ে শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত একা পড়ে যাবে।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

আমেরিকার বর্তমান মনোভাব তুরস্কের ধৈর্যের পক্ষে

ওয়াশিংটনের সঙ্গে তুরস্ক বর্তমানে বিগত বহু বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক উপভোগ করছে। উভয় দেশই সিরিয়ার আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং একটি কার্যকর কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে। আবু আল-দুহুর ঘটনার পর, মার্কিন প্রতিনিধি এই হামলাকে ‘অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা’ বলে আখ্যা দেন এবং তুরস্ক-সিরিয়া-ইসরায়েল তিনপক্ষীয় উত্তেজনা প্রশমনব্যবস্থা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন। এই কৌশলগত পারস্পরিক বোঝাপড়া যেকোনো প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।

যুদ্ধ পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে মোড় ঘুরিয়ে দেবে

একটি সীমিত যুদ্ধও সিরিয়াকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেবে। যে সরকারকে রক্ষা করতে তুরস্ক যুদ্ধে নামবে, শেষ পর্যন্ত সেই সরকারকেই তারা দুর্বল করে ফেলবে। যুদ্ধের প্রভাব তুরস্কের ভেতরেও ছড়িয়ে পড়বে—আকাশ ও সমুদ্রপথে নতুন ঝুঁকি তৈরি হবে, সামরিক খরচ বহু গুণে বাড়বে, পর্যটন খাত লোকসানে পড়বে, জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হবে এবং অর্থনৈতিক বাজার চরম চাপের মুখে পড়বে। এর পাশাপাশি যুদ্ধ এমন এক ময়দানে গড়াবে, যেখানে ইসরায়েলের স্পষ্ট সুবিধা রয়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর তুরস্কের তৈরি ড্রোন বায়রাকতার টিবি ২ বিশেষ পরিচিত পেয়েছে
ছবি: এএফপি

তবে সংযম মানেই হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। যদি তুর্কি সেনা বা তাদের নিজেদের ভূখণ্ড আক্রান্ত হয়, তবে আঙ্কারাকে অবশ্যই নিজেদের রক্ষা করতে হবে এবং আনুপাতিক হারে কড়া জবাব দিতে হবে। তবে সেই সীমিত আত্মরক্ষার অধিকারকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না।

তুরস্কের সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশলগত অবস্থান তখনই তৈরি হবে, যখন তারা যুদ্ধে না গিয়েও ইসরায়েলকে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে, সিরিয়াকে কোনো বাধ্যগত রাষ্ট্র না বানিয়েই শক্তিশালী করবে এবং কোনো উগ্র বিরোধী জোট গঠন না করেই নতুন নতুন অংশীদার তৈরি করতে পারবে। এটি কোনো আত্মসমর্পণ নয়, এটি হলো শক্তির ওপর ভর করে রাখা কৌশলগত ধৈর্য।

আঙ্কারার উচিত হবে না কোনো সাময়িক উসকানিতে পা দিয়ে নিজেদের এত দিনের সফল কৌশলকে ধ্বংস করা। ইসরায়েল যে যুদ্ধটিতে বেশি পারদর্শী, সেই যুদ্ধে না জড়িয়ে বরং রাজনৈতিক ময়দানে জিতে যাওয়ার বর্তমান কৌশল ধরে রাখাই তুরস্কের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

  • বুগরা সারে তুরস্কের মারসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক। মিডল ইস্ট মনিটর থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।