দেশে এখন দুটি বড় সংকট একসঙ্গে চলমান, যেগুলো শুনতে পরস্পরবিরোধী মনে হলেও আসলে একই সুতোয় গাঁথা। একদিকে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো ফল নিয়ে বের হওয়া হাজারো গ্র্যাজুয়েট বছরের পর বছর বেকার থাকছেন, অন্যদিকে বড় বড় কোম্পানি অভিযোগ করছে, তারা দক্ষ জনবল পাচ্ছে না; বাধ্য হয়ে ভারত বা শ্রীলঙ্কা থেকে মোটা বেতনে কর্মী আনতে হচ্ছে। ফলাফল দাঁড়াচ্ছে এমন এক অদ্ভুত বাস্তবতা—লাখো শিক্ষিত তরুণ বেকার, অথচ ভালো চাকরিগুলো যাচ্ছে বিদেশিদের হাতে। এই বৈপরীত্যের মূল কারণ একটাই—বইয়ের জ্ঞান আর বাস্তব কাজের দক্ষতার মধ্যে বিশাল ফারাক।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এ সংকট আগামী দিনে আরও গভীর হবে। নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করাই রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নয়; আসল চ্যালেঞ্জ হবে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। সাম্প্রতিক কোটা সংস্কার আন্দোলন যে শেষ পর্যন্ত একটি বড় গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছে, তার পেছনেও ছিল দীর্ঘদিনের বেকারত্ব, অনিশ্চয়তা এবং তরুণসমাজের জমে থাকা হতাশা। প্রায় চার কোটি তরুণের কর্মসংস্থানের প্রশ্ন এখন আর কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, এটি জাতীয় স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ অস্তিত্বের প্রশ্ন।
এ সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় চালু থাকা ‘কো-অপারেটিভ এডুকেশন’ বা সংক্ষেপে ‘কো-অপ’ মডেল একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। এ পদ্ধতিতে একজন শিক্ষার্থী এক সেমিস্টার বা এক বছর ক্লাসরুমে পড়েন, এরপর পরবর্তী সেমিস্টারে কোনো প্রতিষ্ঠানে ফুলটাইম কর্মী হিসেবে কাজ করেন। কাজের বিনিময়ে তিনি সম্মানজনক বেতন পান, যা পড়াশোনার খরচে সহায়তা করে। একই সঙ্গে এই কাজের অভিজ্ঞতা সরাসরি একাডেমিক ক্রেডিটের অংশ হয়। এ প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন বিশ্ববিদ্যালয় ও নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে করে।
উন্নত দেশগুলোয় এই মডেলের সাফল্য চোখে পড়ার মতো। কানাডার ওয়াটারলু ইউনিভার্সিটির কো-অপ গ্র্যাজুয়েটদের ৯৬ শতাংশ ৬ মাসের মধ্যেই চাকরি পান। তাঁরা সাধারণ গ্র্যাজুয়েটদের তুলনায় বছরে গড়ে দুই থেকে চার হাজার কানাডিয়ান ডলার বেশি আয় করেন। গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যাপলসহ সাড়ে সাত হাজারের বেশি কোম্পানি নিয়মিত কো-অপ স্টুডেন্ট নিয়োগ দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ইস্টার্ন ও ড্রেক্সেল ইউনিভার্সিটিতে কো-অপ শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তি। জার্মানির ‘ডুয়েল স্টাডি’ সিস্টেমে তিন মাস থিওরি পড়ে তিন মাস মার্সিডিজ বা সিমেন্সে কাজ করার সুযোগ থাকে; এখানে ড্রপআউট রেট মাত্র ৬ থেকে ৭ শতাংশ এবং ৯৭ শতাংশ শিক্ষার্থী গ্র্যাজুয়েশনের পরপরই চাকরি পান। জাপান, যুক্তরাজ্য, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়াতেও ইউনিভার্সিটি-ইন্ডাস্ট্রি সমন্বয়ের মাধ্যমে বেকারত্ব কার্যত নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে।
তরুণেরা দেশেই থাকতে চান, কিন্তু চান মেধার সঠিক ব্যবহার ও ন্যায্য মূল্য। কো-অপ হতে পারে কর্মসংস্থান, করপোরেট মুনাফা, শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়ন এবং ব্রেইন-ড্রেইন মোকাবিলার একটি সমন্বিত সমাধান। সবার জন্য লাভজনক এই মডেল চালু করার সময় এখনই।
এর বিপরীতে বাংলাদেশে প্রচলিত কারিকুলাম এখনো অনেকাংশে ইন্ডাস্ট্রিবিমুখ। চার বছর পড়াশোনা করে একজন শিক্ষার্থী কর্মক্ষেত্রে গিয়ে আবিষ্কার করেন, তাঁর শেখা জ্ঞানের বাস্তব প্রয়োগ খুবই সীমিত। কো-অপ ব্যবস্থা চালু হলে এই চিত্র বদলাতে পারে। কারণ, ইন্ডাস্ট্রি সরাসরি জানাবে, তাদের কী ধরনের দক্ষ কর্মী দরকার। ফলে সিলেবাস হবে যুগোপযোগী। দেশীয় গ্র্যাজুয়েটরাই যখন কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে বের হবেন, তখন বিদেশি কর্মীর ওপর নির্ভরতা কমবে এবং দেশের অর্থ দেশেই থাকবে।
বর্তমানে বাংলাদেশে যে ইন্টার্নশিপ সংস্কৃতি চালু আছে, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যর্থ। এক থেকে তিন মাসের এই প্রোগ্রামগুলোয় শিক্ষার্থীরা প্রায়ই ফাইল গুছানো, ফটোকপি বা ডেটা এন্ট্রির মতো রুটিন কাজে সীমাবদ্ধ থাকে। শেখার বদলে সনদ সংগ্রহই হয়ে ওঠে মূল লক্ষ্য। কোম্পানিগুলোরও কোনো দীর্ঘমেয়াদি দায়বদ্ধতা থাকে না। এই পারস্পরিক অনীহা ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে ইন্টার্নশিপ দক্ষ জনবল তৈরিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
কো-অপ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন করপোরেট মানসিকতার পরিবর্তন, শিক্ষকদের সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রির নিয়মিত সংযোগ এবং বাজার সম্পর্কে শিক্ষকদের আপডেট থাকা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পুরোনো সিলেবাস, সেশনজট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে এটি বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জিং হলেও অসম্ভব নয়।
শিক্ষা ও শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কো-অপ চালু করতে হলে লিখিত চুক্তি অপরিহার্য—কতজন শিক্ষার্থী নেবে, কী কাজ করাবে, বেতন কত, মূল্যায়ন কীভাবে হবে, সব স্পষ্ট থাকতে হবে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সহজেই এমন ক্রেডিট সিস্টেম চালু করতে পারে, যেখানে শিক্ষার্থী মাসে ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় করবেন এবং সেই কাজ ডিগ্রির অংশ হিসেবে স্বীকৃত হবে। মূল্যায়ন করবে তিন পক্ষ—বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কোম্পানির সুপারভাইজার এবং শিক্ষার্থী নিজে।
এটি কোম্পানিগুলোর জন্যও একটি বড় সুযোগ। তারা একজন ফুলটাইম কর্মীর এক-চতুর্থাংশ বেতনে একজন উদ্যমী তরুণ পায়, যাঁকে সঠিকভাবে গড়ে তুললে ভবিষ্যতে তিনি প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে দক্ষ ও বিশ্বস্ত সম্পদে পরিণত হতে পারেন। সরকার চাইলে এই উদ্যোগে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে করছাড়সহ বিভিন্ন প্রণোদনা দিতে পারে।
ইতিমধ্যে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। গ্রামীণফোন ‘ফিউচার নেশন’ ও ‘জিপি একাডেমি’র মাধ্যমে তরুণদের ডিজিটাল স্কিল শেখাচ্ছে। ওয়ালটন আইইউটি, কুয়েট ও রুয়েটে যৌথভাবে রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ল্যাব স্থাপন করেছে। এগুলো প্রমাণ করে, সঠিক নীতিগত সহায়তা পেলে ইউনিভার্সিটি-ইন্ডাস্ট্রি সমন্বয় সম্ভব।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের ইশতেহারে কর্মসংস্থানের কথা বলছে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য দরকার দ্রুত ফলদায়ক একটি কাঠামো। কো-অপ প্রোগ্রাম এখানে একটি ‘গেম চেঞ্জার’ হতে পারে। এতে সরকারকে সরাসরি লাখ লাখ চাকরি তৈরি করতে হবে না; বরং তাদের ভূমিকা হবে নীতিনির্ধারক ও ফ্যাসিলিটেটরের। সরকার মনিটরিং করবে এবং যেসব প্রতিষ্ঠান কো-অপ সুযোগ দেবে, তাদের প্রণোদনা দেবে।
শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়ছে, মেধাবীরা দেশ ছাড়ছেন। এ দুই সমস্যার মূলেই রয়েছে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের ফারাক। কো-অপ এডুকেশন এই ফারাক কমাতে পারে। তরুণেরা দেশেই থাকতে চান, কিন্তু চান মেধার সঠিক ব্যবহার ও ন্যায্য মূল্য। কো-অপ হতে পারে কর্মসংস্থান, করপোরেট মুনাফা, শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়ন এবং ব্রেইন-ড্রেইন মোকাবিলার একটি সমন্বিত সমাধান। সবার জন্য লাভজনক এই মডেল চালু করার সময় এখনই।
ইমতিয়াজ মির্জা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট
*মতামত লেখকের নিজস্ব