এপস্টিন ফাইলে দালাই লামার নাম যেভাবে কাজে লাগাচ্ছে চীন

দালাই লামাফাইল ছবি

চীনের প্রোপাগান্ডা ওয়ার বা তথ্যযুদ্ধ এখন আর কেবল প্রচলিত প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি রূপ নিয়েছে সুসংগঠিত, প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক বয়ান নিয়ন্ত্রণের কৌশলে। ডিজিটাল নজরদারি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি কনটেন্ট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৌশলী হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বেইজিং আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে পরিশীলিত তথ্যযুদ্ধের একটি গড়ে তুলেছে। বিপুল রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রচেষ্টা এখন চীনের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। লক্ষ্য একটাই—কর্তৃত্ববাদী শাসনকে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং ধীরে ধীরে বাস্তবতাকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা।

এই অভিযানের একটি প্রধান লক্ষ্য তিব্বত এবং বিশেষ করে দালাই লামা। চীনের তথ্য অভিযান তিব্বতি সাংস্কৃতিক পরিচয় মুছে দিতে চায় এবং জোরপূর্বক একীভূতকরণকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে তুলে ধরতে চায়।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ তাদের ২০২৪ সালের এশিয়া–প্যাসিফিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা মূল্যায়নে এসব উদ্যোগকে একটি পরিকল্পিত ‘কূটকৌশল’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এই কৌশলের উদ্দেশ্য সমাজের ভেতরের বিভাজনকে কাজে লাগানো, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা দুর্বল করা এবং প্রকাশ্য ও গোপন নানা পদ্ধতিতে চীনের ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য এগিয়ে নেওয়া।

আরও পড়ুন

এই প্রেক্ষাপটে জেফরি এপস্টিন–সংক্রান্ত আদালতের নথিতে দালাই লামার নাম ৬৯ থেকে ১৬৯ বার আছে বলে যে দাবি সম্প্রতি ভাইরাল হিসেবে, তা আধুনিক তথ্যযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এই সংখ্যা কোনো যাচাইকৃত আইনি বিশ্লেষণ থেকে আসেনি। এটি মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট থেকে ছড়িয়েছে। তবু স্বাধীন তথ্য যাচাইকারী ও আইন বিশ্লেষকেরা নথি পর্যালোচনা করে বারবার ভুয়া প্রমাণ করার পরও দাবিটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

নথিগুলোর বিস্তারিত পর্যালোচনায় দেখা যায়, এপস্টিন দালাই লামার সঙ্গে যোগাযোগ করতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু সেই আগ্রহ বাস্তবে পূরণ হয়েছিল এমন কোনো প্রমাণ নেই। দালাই লামার নাম যেসব জায়গায় এসেছে, সেগুলো মূলত গণহারে পাঠানো নিউজলেটার, প্রশাসনিক যোগাযোগ তালিকা বা তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে আলাপচারিতার প্রসঙ্গে। কোথাও ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ, আর্থিক সম্পর্ক বা এপস্টিনের অপরাধ সম্পর্কে দালাই লামার কোনো সম্পৃক্ততা থাকার প্রমাণ নেই। তথাকথিত ১৬৯টি উল্লেখের বড় একটি অংশ আসলে একই তথ্যের পুনরাবৃত্তি।

তবু অভিযোগটি ছড়িয়েছে। এর কারণ ডিজিটাল তথ্যপরিবেশের একটি বড় দুর্বলতা। নির্দিষ্ট সংখ্যা ব্যবহার করলে তা বিশ্বাসযোগ্যতার ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করে, যদিও প্রেক্ষাপট অনুপস্থিত থাকে। এমন পরিবেশে যাচাইয়ের জায়গা নেয় বারবার পুনরাবৃত্তি।

এপস্টিন নথির ঘটনা কোনো জবাবদিহির চেষ্টা নয়। এটি ছিল বয়ান নিয়ন্ত্রণের একটি উদাহরণ, যেখানে তুচ্ছ ও প্রসঙ্গবহির্ভূত উল্লেখকে ইচ্ছাকৃতভাবে বড় করে দেখিয়ে সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা হিসেবে।

সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই বিতর্ক নতুন করে সামনে আসে, যখন দালাই লামা তাঁর স্পোকেন ওয়ার্ড অ্যালবামের জন্য গ্র্যামি পুরস্কার পান। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুরস্কারটিকে ‘চীনবিরোধী রাজনৈতিক অপচেষ্টা’ বলে নিন্দা জানায়। তিব্বতি পরিচয় বা নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলে অতীতেও এমন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

এর আগেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৩ সালে একটি তিব্বতি সাংস্কৃতিক অভিবাদন ভঙ্গিকে তার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে অনলাইনে অশোভন আচরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এতে বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ ছড়ায়। পরে তিব্বতি বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতি গবেষকেরা এই ব্যাখ্যাকে বিকৃত বলে স্বীকার করেন।

এপস্টিন–সংক্রান্ত বয়ানটির বিশেষত্ব হলো এর বিস্তার ও সমন্বয়। ডিজিটাল ভুয়া তথ্য গবেষক ও ওপেন সোর্স অনুসন্ধানকারীরা দেখেছেন, এতে অস্বাভাবিক আচরণের স্পষ্ট ছক রয়েছে। হঠাৎ তৈরি হওয়া নতুন অ্যাকাউন্ট, দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা প্রোফাইলের একসঙ্গে সক্রিয় হওয়া এবং একেবারে একই বা প্রায় একই বার্তা একাধিক প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দেওয়া হিসেবে। অনেক অ্যাকাউন্ট নিজেদের পশ্চিমা ব্যবহারকারী হিসেবে তুলে ধরেছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি প্রোফাইল ছবি বা চুরি করা পরিচয় ব্যবহার করেছে। এসব কৌশল আগে থেকেই চীন-সম্পর্কিত প্রভাব বিস্তার অভিযানে নথিভুক্ত।

আরও পড়ুন

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও এতে ভূমিকা রেখেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যম সিজিটিএন প্রথম দিকেই বিভ্রান্তিকর ‘১৬৯ বার’ সংখ্যাটি তুলে ধরে। এতে দাবিটি একধরনের সাংবাদিক বৈধতা পায় এবং পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া যেন স্বতঃস্ফূর্ত বলে মনে হয়।

তথ্যযুদ্ধ নিয়ে গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, এই পদ্ধতিতে প্রথমে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বয়ানের ভিত্তি তৈরি করে, পরে সমন্বিত অনলাইন নেটওয়ার্ক সেটিকে দৃশ্যমান করে তোলে।

এই ঘটনাগুলো তিব্বত নিয়ে চীনের বহির্মুখী বয়ান ব্যবস্থাপনার প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তারের সঙ্গেই মিলে যায়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লাসায় তিব্বত ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিকেশন সেন্টার চালু করে বেইজিং। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, এর কাজ হলো তিব্বত নিয়ে বিদেশি বয়ান ও গল্প বলার একটি নিজস্ব কাঠামো গড়ে তোলা। এটি প্রতিক্রিয়াশীল প্রচার থেকে সক্রিয় বয়ান প্রকৌশলের দিকে স্পষ্ট সরে আসার ইঙ্গিত দেয়।

এই ধরনের অভিযানের লক্ষ্য একক কোনো তথ্য বিশ্বাস করানো নয়। বরং বিতর্কের সঙ্গে নাম জুড়ে দিয়ে নৈতিক কর্তৃত্ব ক্ষয় করা। তথ্যের ভিড়ে কাছাকাছি থাকাই সন্দেহ হয়ে ওঠে এবং পুনরাবৃত্তিই স্মৃতিতে রূপ নেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সন্দেহই হয়ে ওঠে ফলাফল। তিব্বতি জনগোষ্ঠীর জন্য এটি কেবল রাজনৈতিক দমন নয়। এটি আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের গল্প বলার সক্ষমতা এবং মানবাধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক টিকে থাকার প্রশ্নে নৈতিক অবস্থান বজায় রাখার ওপর সরাসরি আঘাত।

গণতান্ত্রিক সমাজগুলোর জন্যও ঝুঁকি কম নয়। উন্মুক্ত তথ্যব্যবস্থা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বাধ্যবাধকতা না থাকা শক্তিগুলোর কাছে বিশেষভাবে দুর্বল। যখন কৃত্রিমভাবে তৈরি প্রচার বাস্তব জনমতের মতো দেখাতে পারে, তখন প্রকৃত উদ্বেগ আর সংগঠিত হস্তক্ষেপ আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অনলাইন প্রভাব বিস্তার নিয়ে গবেষকেরা বারবার এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

দালাই লামার বিরুদ্ধে চীনের এই অভিযান দেখায়, ঘরোয়া বয়ান নিয়ন্ত্রণ থেকে সরে এসে এখন বৈশ্বিক ডিজিটাল পরিসরে বৈধতা নিয়েই লড়াই চলছে।

এপস্টিন নথির ঘটনা কোনো জবাবদিহির চেষ্টা নয়। এটি ছিল বয়ান নিয়ন্ত্রণের একটি উদাহরণ, যেখানে তুচ্ছ ও প্রসঙ্গবহির্ভূত উল্লেখকে ইচ্ছাকৃতভাবে বড় করে দেখিয়ে সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা হিসেবে। গুরুত্ব নথিতে কী আছে, তা নয়। গুরুত্ব হলো কীভাবে কর্তৃত্ববাদী শক্তি গণতান্ত্রিক তথ্যব্যবস্থার খোলা দরজা ব্যবহার করে সামান্য সংযোগকে স্থায়ী সন্দেহে রূপ দেয়। এ ধরনের অভিযান যদি চিহ্নিত না হয়, তবে প্রমাণ নয়, বরং তৈরি করা বিতর্কই ভবিষ্যতে মানবাধিকার, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও রাজনৈতিক বৈধতা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক ধারণা গড়ে দেবে।

  • তেনজিন ডালহা চীনের সাইবার নিরাপত্তা নীতি, নজরদারি ব্যবস্থা এবং তিব্বতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গতিবিধি গবেষক

দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত