আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা: শুধু প্রাপ্তি নয়, শিক্ষার্থীদের পথচলাটাও দেখতে হবে

চতুর্থ ওপেন ওয়ার্ল্ড অ্যাস্ট্রোনমি অলিম্পিয়াড ২০২৫–এ অংশ নেওয়া বাংলাদেশের শিক্ষার্থী দলছবি: সংগৃহীত

আমাদের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে নানা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে দেখেছি, এত প্রতিকূলতার মাঝেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তারা দেশের মুখ উজ্জ্বল করছে। বিশেষ করে অলিম্পিয়াডগুলোতে এখন আর কাউকে বুঝিয়ে বলতে হয় না বাংলাদেশ দেশটা কোথায় অবস্থিত।

দু–এক দশক আগেও যাঁরা নাম উচ্চারণ করতেন ‘বেংলাদেশ’, তাঁদেরও এখন আর ‘বাংলাদেশ’ বলতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। মেধার এসব প্রতিযোগিতায় আমাদের শিক্ষার্থীরা বিশ্বমঞ্চকে বুঝিয়ে দিয়েছে, আমরা সগর্বে নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়ার জন্যই সে মঞ্চে উপস্থিত হয়েছি।

এবার আসি পর্দার আড়ালের গল্পে। পত্রিকার পাতায় ছাপা হয় শুধু মেডেল প্রাপ্তির অংশটুকু, টেলিভিশনের পর্দায় দেখানো হয় দেশের পতাকা। কিন্তু কী পরিমাণ দুর্ভোগ পার করে আমাদের অন্য দেশে যেতে হয়, সেটি কখনো খবরে আসে না।

অন্য সব দেশ যখন ভেন্যুতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, প্রতিযোগিতার জন্য নিজেদের তৈরি করছে, তখন আমাদের অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয় ভিসা পাব কি না। সবার জন্য যখন অনলাইনে ভিসা আবেদন, আমাদের জন্য হয়তো সে সুযোগ নেই। সরাসরি উপস্থিত হতে হবে দূতাবাসে। তা–ও সে দূতাবাস বাংলাদেশে নেই। অন্য এক দেশের ভিসা পাওয়ার জন্য যেতে হবে অন্য আরেক দেশে।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

কিছুদিন আগেই, একটি অলিম্পিয়াডের জন্য দলনেতা হিসেবে আমাকে ভিসা দিলেও দলের একজন শিক্ষার্থী প্রতিযোগীকে ভিসা দেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে আপিল করার পরও ভিসা দেয়নি। সেই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আমরা অংশগ্রহণ করতে পারিনি। অথচ ঠিক আগের বছরেই, সেই প্রতিযোগিতায় আমরা অর্জন করেছিলাম দুটি রৌপ্য ও দুটি ব্রোঞ্জপদক। 

তবে দলনেতা হিসেবে আমাকে সবচেয়ে বেশি বেগ পেতে হয় ফেইলিউর ম্যানেজমেন্ট বা ব্যর্থতা ব্যবস্থাপনায়। দলের কেউ হয়তো ফলাফল খারাপ করল, দেখা গেল তাকে আর আশপাশে পাওয়া যাচ্ছে না। হয়তো পুরো দল বলছে, সমাপনী অনুষ্ঠানে যাবে না। কেউ বলছে ডিনার করার ইচ্ছা চলে গেছে। ফলাফল খারাপ হলে কোমলমতি এই শিক্ষার্থীদের মন খারাপ থাকবে, হতাশা কাজ করবে।

কিন্তু আমাদের চেয়ে খারাপ ফলাফল করেও, অন্য অনেক দেশের শিক্ষার্থীদের কিন্তু এ অবস্থা হয় না। তারা তাদের খারাপ ফলাফলের কারণ বিশ্লেষণ করছে, ভালোদের কাছে গিয়ে জানতে চাইছে কীভাবে প্রস্তুতি নিয়েছে, পরিকল্পনা করছে কীভাবে ভবিষ্যতে আরও ভালো করা যায়।

আমাদের সুবিধা ও সামর্থ্য যতটুকু আছে, সেটি দিয়ে যতটুকু অর্জন তা আমরা উদ্‌যাপন করব, কিন্তু পথ চলতে গিয়ে কোথাও হোঁচট খেলে, সেটি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য আমরা যেন আমাদের শিক্ষার্থীদের, আমাদের সন্তানদের পাশে থাকতে পারি। তারা যেন বুঝতে পারে, একটি পরীক্ষা বা প্রতিযোগিতাই জীবনের সবকিছু নয়।

এই পরিস্থিতি শুধু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নয়, বরং এটি আমাদের সংস্কৃতি হয়ে গেছে। আমাদের যে প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা হয়, সেটির ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ ধরনের মনোভাব দেখা যায়।

প্রশ্ন হলো, দিনের পর দিন যে প্রত্যাশার ঝাঁপি খুলে আমরা বসে থাকি, সে প্রত্যাশার চাপই কি এর জন্য দায়ী? আমরা কি আমাদের সন্তানদের পর্যাপ্ত ইনপুট বা প্রয়োজনীয় সুযোগ–সুবিধা দিয়ে, তারপর যথার্থ আউটপুট বা ফলাফলের স্বপ্ন দেখছি? নাকি ইনপুট দেওয়ার সময় আমরা বিভিন্ন কারণ দেখাব, কিন্তু আউটপুট কেন আমাদের মনমতো হলো না, সেটি নিয়ে কৈফিয়ত তলব করব? 

একটা শিশু যে সারা দিন স্কুলে কাটাচ্ছে, বিকেলে তার খেলার জন্য কি আমরা মাঠ দিয়েছি? রাতে যে খাবার দিচ্ছি, সেখানে যে ভেজাল নেই, সেটি কি আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি? দশটি খাতা, বই, টিফিন বক্স, ছাতা, পানির বোতল বাচ্চার ব্যাগের মধ্যে ঠুসে যে পিঠে চড়িয়ে দিয়েছি, আমরা কখনো কি চিন্তা করেছি এই ভারী ব্যাগ বয়ে কী করে এই শিশু হেঁটে চলছে? একটা নিরাপদ বাহনে কি শিশুর স্কুলে যাওয়ার ব্যবস্থাটুকু করতে করেছি? 

যুগের সঙ্গে তাল মেলানোর জন্য স্কুলে–কলেজে আমরা আইসিটি শিক্ষা যুক্ত করেছি। কিন্তু আইসিটির শিক্ষক কি নিয়োগ দিয়েছি? নাকি বাংলা বিষয়ের স্যার কোনো রকমে জোড়াতালি দিয়ে আইসিটি কোর্স শেষ করতে বাধ্য হচ্ছেন? যে গণিত বিষয়টি প্রকৌশল ও প্রযুক্তির ভিত্তি, সে গণিত শেখানোর শিক্ষক কয়টি স্কুল–কলেজে আছে? শুধু ঢাকা শহরের স্কুল–কলেজে জরিপ করে দেখেন, কয়টা জায়গায় গণিতের ভালো শিক্ষক আছেন? কয়জন আছেন? 

যে যৌক্তিক কারণে আমরা খেলার মাঠ দিতে পারি না, ভেজালমুক্ত পুষ্টিকর খাবার দিতে পারি না, চিকিৎসা দিতে পারি না, পরিবহন দিতে পারি না, যে যৌক্তিক কারণে আমরা শিক্ষক দিতে পারি না, শিক্ষা উপকরণ দিতে পারি না, যথার্থ ইনপুট দিতে পারি না; সেই একই যৌক্তিক কারণে আমরা আমাদের শিশুদের কাছ থেকে অযৌক্তিকভাবে প্রকৃষ্ট ফলাফল আশা করতে পারি না।

এত প্রতিকূলতা, প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও আমাদের শিক্ষার্থীরা আশাজাগানিয়া ফলাফল করছে, সেটির জন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। কিন্তু ফলাফল আশানুরূপ না হলে, তাদের প্রতি নির্দয় হবার, অতিরিক্ত পরিমাণ চাপ প্রয়োগ করার আগে যেন বিষয়গুলো বিবেচনায় নিই। 

এই কারণগুলোকে অজুহাত হিসেবে দেখাতে চাই না। এই সীমিত সুবিধা নিয়েও ভালো কিছু করার উদাহরণ বিভিন্ন দেশে বা আমাদের এখানেই আছে। কিন্তু প্রতিটি শিশুই আলাদা। তার সহপাঠী কিছু বিষয়ে ভালো করছে মানে এই নয় যে সেই একই বিষয়ে তাকেও একই পরিমাণ ভালো ফলাফল করতে হবে।

আমাদের সুবিধা ও সামর্থ্য যতটুকু আছে, সেটি দিয়ে যতটুকু অর্জন তা আমরা উদ্‌যাপন করব, কিন্তু পথ চলতে গিয়ে কোথাও হোঁচট খেলে, সেটি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য আমরা যেন আমাদের শিক্ষার্থীদের, আমাদের সন্তানদের পাশে থাকতে পারি। তারা যেন বুঝতে পারে, একটি পরীক্ষা বা প্রতিযোগিতাই জীবনের সবকিছু নয়।

ড. বি এম মইনুল হোসেন অধ্যাপক ও পরিচালক, তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]