আম চাষ যেভাবে নওগাঁর নারীদের ‘ফিনিশ’ করে দিচ্ছে

আম নিয়ে বাড়ি ফিরছেন দুই নারীপ্রথম আলো

একটা বহুতল ভবনের অতি ঠান্ডা ঘরে ‘জেন্ডার’ নিয়ে ভাবগম্ভীর আলোচনা চলছিল। বলা বাহুল্য, এসব আলোচনায় প্রধানত নারীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। তবে আজকাল অন্য জেন্ডারের মানুষদের ডাকার রেওয়াজ চালু হয়েছে। দাতারা চাইছেন তাঁদের অংশগ্রহণটা ‘দৃশ্যমান’ হোক। ক্যামেরাকে সেটা মনে রাখতে হয়। দু–একজন পুরুষও ঢুকে পড়েন নানা কোটায়।

কথা হচ্ছিল, অনেক সতর্ক পদক্ষেপের পরও নারীর ক্ষমতায়ন সেভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না; বরং যত দিন যাচ্ছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়নের প্রক্রিয়া ততই বিঘ্নিত হচ্ছে।

বিয়ের বয়স কমানো, বিজ্ঞানশিক্ষায় নারীদের নিরুৎসাহিত করা, কম বয়সে শিক্ষার্থী মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেলে তাদের আর স্কুলে ঢুকতে না দেওয়া প্রভৃতি নানা বিষয়ে তপ্ত আলোচনা চলছিল। মনে হচ্ছিল, এখনই সবাই ‘শাহবাগ অবরোধ’ করে বসবে। নওগাঁর ধামইরহাট থেকে আসা এক গৃহবধূ অনেকক্ষণ বসে বসে সব শুনছিলেন। নৈশকোচে রাতভোর ভ্রমণের ধকল তাঁর চোখেমুখে। আজই ফিরতে হবে, সেই তাগিদও আছে।

তবে এর কোনোটিই তাঁর ধৈর্যচ্যুতির কারণ নয়। তিনি আসলে আলোচনার মধ্যে তাঁকে দেখতে পাচ্ছিলেন না। তাঁর কিস্তি (ঋণের সপ্তাহ/মাসভিত্তিক অর্থ ফেরত) যে চলছে না, সেটা কীভাবে চালু করা যায়, সেটা নিয়ে কোনো রা নেই, কেউ সে কথা বলছে না বা তাঁর কাছে কেউ শুনতেও চাইছে না।

তাঁদের সমস্যা নিয়ে কথা হবে—এমন ধারণা দিয়ে তাঁকে রাহা খরচ দিয়ে আনা হয়েছে। আগের দিন থাকলে, আঁচলে ট্যাকা থাকলে এসব ‘আকামের বাহাস’ ফেলে তিনি অনেক অগেই ধামইরহাটের পথ ধরতেন। নওগাঁ অঞ্চলে আম চাষের রমরমা শুরু হওয়ার পর থেকেই সে অঞ্চলের নারীদের আঁচল খালি হওয়া শুরু হয়েছে।

প্রচলিত ধানভিত্তিক কৃষি ছিল ‘ইন্টিগ্রেটেড লাইভলিহুড সাপোর্ট’। ধান চাষ শুধু একটি ফসল নয়; বরং একটি সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্র (অ্যাগ্রো-ইকোসিস্টেম): ধানের উপজাত বা বাইপ্রোডাক্ট অনেক। যেমন খড়/বিচালি থেকে গবাদিখাদ্য, ঘরের ছাউনি বা তুষ থেকে জ্বালানি বা হাঁস–মুরগির খাবার, খুদ থেকে হাঁস-মুরগির খাবার, ধানের জমি থেকে হাঁস পালনের ক্ষেত্র। এই পুরো ব্যবস্থা নারীর নিয়ন্ত্রণে থাকত (হাউসহোল্ড ডোমেইন)।

গৃহবধূ আমিরজান (ছদ্মনাম) অনেক কষ্টে তাঁর মতো করেই বললেন, ‘আম চাষ আমাদের ফিনিশ করে দিচ্ছে।’ জেন্ডার বিশেষজ্ঞরা ‘ভদ্র ঘরানার’, তাই অট্টহাসি চেপে রেখে শুনতে চাইলেন তাঁর কথা। সময় দুই মিনিট। আমিরজানদের ‘বিষাদ সিন্ধু’ দুই মিনিটে শেষ হওয়ার নয়। তবু তিনি চেষ্টা করেন।

নওগাঁ অঞ্চলে আমের বাণিজ্যিক চাষ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর সামাজিক প্রভাব, বিশেষ করে নারীদের ওপর, সত্যিই লক্ষ করার মতো। আগে যেখানে ধান, সবজি বা মিশ্র ফসল হতো—যেগুলোতে নারীদের শ্রম বেশি লাগত—সেখানে এখন বড় আকারে আমের বাগান হচ্ছে। নারীদের কাজের সুযোগ কমে যাচ্ছে, তাঁরা কৃষি উৎপাদনের সিদ্ধান্ত থেকেও দূরে চলে যাচ্ছেন।

পুরুষের নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর আর নিরঙ্কুশ হচ্ছে। ধানখেতে কাজ করতেন প্রান্তিক আদিবাসী নারীরা। তাঁরা কর্মহীন হয়েছেন/হচ্ছেন, তাঁদের আমবাগানের কাজে নেওয়া হয় না। বলা হয়, ‘ফুলের খেতে বেটিসাওয়াল ঢুইকলে সেই খেতে ফুল ফুটবে না।’ আদিবাসীদের জমিও ‘সিস্টেম’ করে আমবাগানের পেটে ঢুকে যাচ্ছে। এগুলো কোনো নতুন কথা নয়, কিন্তু আমিরজানদের মতো গৃহবধূরা ‘ফিনিশ’ হচ্ছেন কীভাবে? বিষয়টা একটু খোলাসা করা যাক।

কৃষি এখনও বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠীর জীবিকার প্রধান উপায়
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

প্রচলিত ধানভিত্তিক কৃষি ছিল ‘ইন্টিগ্রেটেড লাইভলিহুড সাপোর্ট’। ধান চাষ শুধু একটি ফসল নয়; বরং একটি সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্র (অ্যাগ্রো-ইকোসিস্টেম): ধানের উপজাত বা বাইপ্রোডাক্ট অনেক। যেমন খড়/বিচালি থেকে গবাদিখাদ্য, ঘরের ছাউনি বা তুষ থেকে জ্বালানি বা হাঁস–মুরগির খাবার, খুদ থেকে হাঁস-মুরগির খাবার, ধানের জমি থেকে হাঁস পালনের ক্ষেত্র। এই পুরো ব্যবস্থা নারীর নিয়ন্ত্রণে থাকত (হাউসহোল্ড ডোমেইন)।

এটি একধরনের সাবসিস্ট্যান্স অ্যাগ্রিকালচার (এমন কৃষি ব্যবস্থা যেখানে কৃষক মূলত নিজের ও পরিবারের খাওয়ার জন্য ফসল উৎপাদন করে, বাজারে বিক্রির জন্য নয়)। যেখানে বাজারের বাইরে উৎপাদন, পরিবারের ভেতরে ব্যবহৃত সম্পদ নারীর ‘বাস্তব ক্ষমতা’ তৈরি করত। গৃহবন্দী নারীদের অর্থনৈতিক ভিত্তি এখান থেকেই তৈরি হতো।

নিজস্ব আয়ের একটা বড় জোগান আসত হাঁস-মুরগি ও এগুলোর ডিম থেকে। গরু–ছাগল থেকে অ্যাসেট অ্যাকিউমুলেশন বা গৃহসম্পদ গড়ে উঠত। পরিবারের পুষ্টি আসত ডিম–দুধ থেকে। এই খাত হচ্ছে গ্রামীণ নারীদের ‘লো-এন্ট্রি, হাই-কন্ট্রোল’ খাত। নারীবাদী রাজনৈতিক অর্থনীতিতে এগুলো যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। নারীর ক্ষমতা শুধু নগদ আয়ে নয়; বরং সম্পদ নিয়ন্ত্রণে নিহিত।

অনিয়ন্ত্রিত আম চাষের জন্য নওগাঁ অঞ্চলে কোনো বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়াই ধান চাষের বাস্তুতন্ত্র (অ্যাগ্রো-ইকোসিস্টেম) চক্রটিকে ভেঙে দিচ্ছে।

আরও পড়ুন

আমবাগান হওয়ার ফলে উপজাত বা উপপণ্যের (বাইপ্রোডাক্টস) খড়, তুষ, খুদের অভাবে গবাদিপশু পালনের ‘ইনপুট’ আর নেই। ফলে গ্রামগুলো ক্রমে গৃহপালিত পশুহীন সুনসান গ্রামে পরিণত হচ্ছে। নারীর ক্ষমতা ছিল ঘরের খাবার উৎপাদনে। এটা ছিল ছোট আয়ের উৎস, এগুলোর ওপর ভিত্তি করে তিনি পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় দৈনন্দিন সিদ্ধান্তগুলো নিতে পারতেন।

জোগান দিতে পারতেন স্কুলের টিফিন, কিস্তির খরচ, শিশুর শখের খেলনা, টিউশন ফি, মেলার খরচ, হাঁড়িপাতিলের দাম ইত্যাদি। নারীর এই অবস্থান জিডিপি বা বাজারে দেখা যায় না। কিন্তু বাস্তবে খুব শক্তিশালী ব্যাপক বাণিজ্যিক আম চাষের ফলে নারীর এই অদৃশ্য ক্ষমতা ভেঙে যাচ্ছে, নারী সামান্য সিদ্ধান্তের জন্যও অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাচ্ছেন।

আমিরজানের ঠিকানা নিয়ে তাঁদের গ্রামে না গেলে, নারী–কিশোর–কিশোরীদের সঙ্গে কথা না বললে পরিস্থিতির ভয়াবহতার সিকি ভাগও বোঝা যাবে না। ধান কাটার পর পরবর্তী ফসল বোনার আগপর্যন্ত মাঠগুলো শিশু–কিশোরদের খেলার মাঠ হয়ে যেত। আমবাগানে সে সুযোগ আর নেই। ডিম, দুধ—সবই এখন ‘পাস্তুরিত’ কিনতে হয় নগদে। আগে ডিম, দুধ, মাঝেমধ্যে মাংস পরিবারে সহজলভ্য ছিল। এখন সবই কিনতে হয়, অনেক পরিবার কিনতে পারে না, ফলে শিশু ও নারীর পুষ্টিঝুঁকি বাড়ছে।

এমন গ্রাম কি আমরা চেয়েছিলাম, যেখানে শিশুদের খেলার জায়গা নেই, খড় নেই, তুষ নেই, খুদ নেই, হাঁস–মুরগি–গরু–ছাগল নেই। শুধু নারীরা যে ‘ফিনিশ’ হচ্ছেন তা–ই নয়, প্রান্তিক ভূমিহীন খেতমজুর, বিশেষ করে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীদের অবস্থাও কাহিল।

পোরশার আমনারায়ণপুর গ্রামের খেতমজুর ইব্রাম ওঁরাও জানালেন, ‘হামাগের তো নিজের জমিন নাই। অন্যের জমিত মজুর করি চলি। জমির মালিকেরা খ্যাত-খামার বাদ দিয়ে আমবাগান করে ফ্যালায় মজুরি দিয়ে কাম করার দিন ফুরায় গেছি।’ আগে যেখানে ধান কাটার কাজ চলত মাস ধরে, এখন ‘য্যাকনা ধান আবাদ হছিল, এক হপ্তার মধ্যেই কাটা হই গিছি’।

উপায় কী

সীমান্তের ওপারেও ধানের বদলে আম চাষের ধুম পড়েছে। বলরামপুর, মহিষবাথানি, কালুয়ারি, মোরগ্রাম, পাটকীবাড়ির কয়েকজনের সঙ্গে মালদহ, মুর্শিদাবাদের হালহকিকত জানতে চাইলে তাঁরা বললেন, তাঁরা আমবাগানে সাথি ফসলের আবাদে মন দিয়েছেন। আদা–হলুদ করছেন।

আমবাগানের মধ্যে সহজেই সবজি, ডাল ইত্যাদি চাষ করা সম্ভব। সে দেশে জেন্ডার সংবেদনশীল কৃষিনীতি গ্রহণ করা হয়েছে। যার আওতায় কৃষি সম্প্রসারণের সেবায় নারীদের অগ্রাধিকার এবং সব কৃষি প্রকল্পে জেন্ডার ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট অবধারিত করা হয়েছে।

কৃষি উপজাত কমে যাওয়ায় নারীকেন্দ্রিক বিকল্প প্রাণী পালন কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। যেখানে প্রশিক্ষণ এবং টিকা ও ভেটেরিনারি সাপোর্টের নিশ্চয়তা থাকবে। প্রাণিখাদ্যের সরবরাহ ও মান ঠিক রাখার জন্য সাইলেজ ও কমিউনিটি ফিড ব্যাংক স্থাপন করা হচ্ছে। আমকেন্দ্রিক কুটিরশিল্পের (আচার, জুস, আম শুঁটকি) কথাও শোনালেন কেউ কেউ।

ইচ্ছা থাকলে উপায় আছে। আমের সঙ্গে সঙ্গে নারী আমজনতাকে বাঁচাতে হবে। গৃহের পুষ্টি আর শিশুর বিকাশের পথ রুদ্ধ করে নারীদের কপর্দকশূন্য করে আমরা কি কিছু অর্জন করতে পারব?

  • গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক

    ই-মেইল: [email protected]

    *মতামত লেখকের নিজস্ব