মার্কিন চুক্তিকে আমরা যেভাবে সুযোগে পরিণত করতে পারি

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত বহুল আলোচিত বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে লিখেছেন এম মাসরুর রিয়াজ

গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত বাণিজ্যিকচুক্তিটি স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক আগ্রহ ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে এটি বাংলাদেশের জন্য নতুন বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে। অন্যদিকে এর কিছু কঠিন শর্ত, ভারসাম্য এবং বাস্তবায়ন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক এই বাণিজ্যচুক্তিকে একটি আদর্শ সমঝোতা হিসেবে উপস্থাপন করাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং। এটি একটি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এবং প্রচলিত শুল্কভিত্তিক বাণিজ্যচুক্তির চেয়ে অনেক বেশি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে। এতে রয়েছে শুল্ক হ্রাস, আমদানি লাইসেন্সিং, মানদণ্ড, ডিজিটাল বাণিজ্য, শ্রম, পরিবেশ, বিনিয়োগ, জাতীয় নিরাপত্তা, সরকারি ক্রয় এবং নিষেধাজ্ঞা-সম্পর্কিত সহযোগিতার মতো বিষয়।

চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের একেবারে শেষ মুহূর্তে, নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে। ফলে এর সময়োপযোগিতা, রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শের পর্যাপ্ততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক। সে কারণে চুক্তিটি খতিয়ে দেখার দাবি অযৌক্তিক নয়। এ চুক্তির অধীনে বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশি মাত্রার কমপ্লায়েন্স বা নিয়মকানুন মানার দায় বর্তায়। চুক্তিটি ওয়াশিংটনকে বিভিন্ন প্রয়োগক্ষমতা দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে চুক্তি বাতিল এবং পুনরায় শুল্ক আরোপের বিধান। কিছু ক্রয়-প্রতিশ্রুতি যদি বাণিজ্যিক যৌক্তিকতার পরিবর্তে রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বৈদেশিক মুদ্রা ও আর্থিক চাপও সৃষ্টি করতে পারে।

কিন্তু সমালোচনা কোনো কৌশল নয় বা সমাধান নয়। মূল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ চাপের মুখে করা এই চুক্তিকে তার বাণিজ্য ও বিনিয়োগব্যবস্থার উন্নয়নের একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে পারে কি না এবং এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুফল আনতে পারে কি না। সেই বিচারে এবং বিশ্ব ভূরাজনীতির ধারা থেকে কৌশলগত সুযোগ গ্রহণের স্বার্থে, চুক্তিটিকে তার সম্ভাবনার দিক থেকে দেখার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

আরও পড়ুন

যে বাজার হারানোর ঝুঁকি বাংলাদেশ নিতে পারে না

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য আর পাঁচটি রপ্তানি গন্তব্যের মতো নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তরের (ইউএসটিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে আমদানি করেছে ৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য এবং বাংলাদেশে রপ্তানি করেছে ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। অন্যদিকে, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি ছিল ৮ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ১৮ শতাংশ। এর মধ্যে ছিল ৪ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলারের ওভেন পোশাক এবং ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের নিটওয়্যার।

এটি কোনো প্রান্তিক বাজার নয়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য এটি একক দেশভিত্তিক বৃহত্তম চাহিদার উৎস। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখো শ্রমিকের কর্মসংস্থান, শিপিং, ব্যাংকিং, প্যাকেজিং, অ্যাকসেসরিজ এবং ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প। এ বাজারে প্রতিযোগিতা হারানো কিংবা কোনো ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক ধাক্কা হবে না; এটি হবে একটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক এবং কর্মসংস্থান সংকট।

সে কারণেই ১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক এবং পরবর্তী সময়ে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর কার্যকর হওয়া ১০ শতাংশ শুল্ক সুখবর নয়। কিন্তু এটি এমন এক পরিস্থিতির চেয়ে ভালো, যেখানে আরও উচ্চ শুল্কের হুমকি এবং দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হতো। বাণিজ্য আলোচনায় কখনো কখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো টিকে থাকার জায়গা ধরে রাখা। সেই বাস্তবতার জায়গা থেকে বললে, এই চুক্তি অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি কমানোর একটি সুযোগ তৈরি করেছে।

আরও পড়ুন

সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে বাড়বে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা

চুক্তি-পরবর্তী প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বাংলাদেশের জন্য সামাল দেওয়ার মতো ছিল। বাংলাদেশের ওপর আরোপিত ১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক পাকিস্তান, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সমপর্যায়ে ছিল; ভিয়েতনামের ২০ শতাংশের চেয়ে কম এবং ভারতের ১৮ শতাংশের তুলনায় সামান্য বেশি (বর্তমানে সব দেশই ১০ শতাংশ শুল্কের আওতায় রয়েছে)। অর্থাৎ বাংলাদেশ কোনো বড় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পায়নি, তবে বড় কোনো অসুবিধায় পড়েনি। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো বস্ত্র ও পোশাক খাতের বিশেষ ব্যবস্থা। চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা নির্দিষ্ট কিছু পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য, যদি সেগুলোতে মার্কিন উৎসের তুলা বা কৃত্রিম তন্তু ব্যবহৃত হয়, তাহলে সেগুলো শূন্য পারস্পরিক শুল্কসুবিধা পেতে পারে। তবে তার মানে এই নয় যে সব শুল্ক উঠে যাবে। স্বাভাবিক মার্কিন এমএফএন শুল্ক তখনো প্রযোজ্য থাকতে পারে। আর এই সুবিধার আওতায় কত পণ্য আসবে, সেটিও এখনো নির্ধারিত হয়নি।

বাংলাদেশ যদি দ্রুত, স্বচ্ছ এবং যথাযথ নথিভিত্তিক মার্কিন তুলা ও ফাইবার সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তুলতে পারে, তবে নির্দিষ্ট চালানে শুল্ক-ঝুঁকি কমানো এবং ক্রেতাদের জন্য আরও গ্রহণযোগ্য কমপ্লায়েন্স কাঠামো উপস্থাপন করা সম্ভব হবে। ২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩৪৬ মিলিয়ন ডলারের তুলা আমদানি করেছে, যা মোট তুলা আমদানির মাত্র ১০ শতাংশ। ফ্রি ট্রেড জোন, বন্ডেড ওয়্যারহাউস, কার্যকর রুলস অব অরিজিন ব্যবস্থাপনা, দ্রুত কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং ক্রেতা পর্যায়ের ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করা গেলে এই তুলা-সংক্রান্ত ধারাটি বাস্তব প্রতিযোগিতামূলক সুবিধায় রূপ নিতে পারে।

বর্তমান বিশ্বে কমপ্লায়েন্সই নতুন বিনিয়োগ নীতি

এই চুক্তির সবচেয়ে বড় সুযোগ শুল্কে নয়; বরং বিনিয়োগ ও বাণিজ্য পরিবেশের সংস্কারে। চুক্তিতে আইন ও নীতিগত স্বচ্ছতা, অনলাইনে বিধি প্রকাশ, জনপরামর্শ, রেগুলেটরি ইমপ্যাক্ট অ্যানালাইসিস, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক মান-সনদের গ্রহণযোগ্যতা, ডিজিটাল কাস্টমস, কাগজবিহীন বাণিজ্য এবং ২০৩০ সালের মধ্যে প্রি-অ্যারাইভাল প্রসেসিং চালুর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রম খাতে সংগঠন করার স্বাধীনতা, ইপিজেডে শ্রমিক অধিকার, নিয়মিত মজুরি পুনর্বিবেচনা, শ্রম পরিদর্শন শক্তিশালীকরণ এবং অন্যায্য শ্রমচর্চার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এগুলোকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের চাপ হিসেবে বিবেচনা করে দেখা যেতে পারে; আবার তেমনি বাস্তবে এগুলো বাংলাদেশের বহুদিনের অসমাপ্ত সংস্কার এজেন্ডারই অংশ।

আজকের বিনিয়োগকারীরা শুধু মজুরি খরচ দেখে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন না। সময়মতো পণ্য সরবরাহ, লজিস্টিক সক্ষমতা, শ্রম পরিবেশ ও
শ্রম–অসন্তোষের ঝুঁকি, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের দক্ষতা, চুক্তি বাস্তবায়নের সক্ষমতা, ডেটা নীতি, দুর্নীতির ঝুঁকি এবং নিয়ন্ত্রক পূর্বানুমান যোগ্যতা—এসব বিষয় বিবেচনা করেই বিনিয়োগকারীরা, বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা, তাঁদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে থাকেন।

বাংলাদেশ যদি এই চুক্তিকে কেবল দ্বিপক্ষীয় চেকলিস্ট’ হিসেবে নয়, বরং জাতীয় কমপ্লায়েন্স প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, তাহলে এর সুফল যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের অনেক বাইরে পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি কার্যকর প্রণোদনা ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে। এটাই এই বাণিজ্যচুক্তির অদৃশ্য লভ্যাংশ। তাই শুধু কমপ্লায়েন্স আর ঝুঁকি কমানো নয়; উচ্চ মূল্যের বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ঢুকতে হলে নিয়ম মেনে চলাই এখন মূল শর্ত।

আরও পড়ুন

বিদেশি বিনিয়োগে বৃদ্ধি আরেকটি বড় সম্ভাবনা

বাংলাদেশের পরবর্তী প্রবৃদ্ধির ধাপ কেবল স্বল্পমূল্যের উৎপাদনের ওপর নির্ভর করতে পারে না, প্রয়োজন আরও বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্বালানি, অবকাঠামো এবং সেবা খাতের গভীরতা। আঙ্কটাডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে ১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু ২০২১ সাল থেকে মোট এফডিআই স্টক প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের আশপাশেই স্থির রয়েছে।

মার্কিন বিনিয়োগের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে মার্কিন নিট এফডিআই ছিল ঋণাত্মক ১৩২ মিলিয়ন ডলার। এটা বিনিয়োগকারীদের আস্থার ভঙ্গুরতার একটি সতর্কবার্তা। এই জায়গাতেই চুক্তিটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। এতে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, জ্বালানি এবং নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ, এভিয়েশন সাপ্লাই চেইন, টেলিযোগাযোগ, পরিবহন এবং লজিস্টিকস অবকাঠামো খাতে মার্কিন বিনিয়োগ সহজতর করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন এক্সিম ব্যাংক এবং ডিএফসির সম্ভাব্য সহায়তার কথাও উল্লেখ আছে। উল্লেখ্য, ডিএফসি যখন কোনো দেশে বিনিয়োগ করে, তখন তা মার্কিন বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগ ঝুঁকি কমার একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে কাজ করে।

কিন্তু এসব সুবিধা শুধু মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। যদি বাংলাদেশ এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করে, তবে একই স্বচ্ছতা ও সুবিধা সব দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীর জন্য প্রযোজ্য হওয়া উচিত। সেখানেই একটি দ্বিপক্ষীয় অঙ্গীকার পরিণত হতে পারে সামগ্রিক বিনিয়োগ সংস্কারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্যচুক্তি বাতিলের দাবিতে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে গণপ্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়
ছবি: সাজিদ হোসেন

ব্যয়ের দিকটিও বাস্তবভাবে দেখতে হবে

গ্লাস ‘অর্ধেক পূর্ণ’ বলার অর্থ এই নয় যে বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে হবে। চুক্তির আওতায় বিমান, এলএনজি, গম, সয়াবিন, তুলা এবং সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের বড় প্রতিশ্রুতি রয়েছে। যদি মার্কিন সরবরাহকারীরা প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, মান এবং সরবরাহ নিশ্চয়তা দিতে পারে, তাহলে কেনা উচিত। কিন্তু রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণের জন্য গোপন ভর্তুকি বা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা উচিত নয়।

ডিজিটাল বাণিজ্য, বাজারভিত্তিক নয় এমন অর্থনীতি, উৎস-নিয়ম, নিষেধাজ্ঞা, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং পারমাণবিক ক্রয়–সংক্রান্ত কিছু ধারা রয়েছে, যেগুলোর অনেকগুলো বাস্তবে চুক্তির আগেও কোনো না কোনোভাবে কার্যকর ছিল। তবু এগুলোর জন্য সতর্ক আইনি পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও পুনঃ আলোচনার সুযোগ রাখা জরুরি।

আরও পড়ুন

ওয়াশিংটনে শুল্ক-অনিশ্চয়তা, তবু চুক্তির গুরুত্ব বহাল

যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক শুল্কব্যবস্থার আইনি ভিত্তি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন যে আইইইপিএএর আওতায় চ্যালেঞ্জকরা শুল্ক আরোপ করা যায় না। এরপর মার্কিন প্রশাসন ট্রেড অ্যাক্ট অব ১৯৭৪–এর ১২২ ধারার আওতায় অস্থায়ী ১০ শতাংশ শুল্ক এবং ভবিষ্যতে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা বলেছে। এ ছাড়া জোর করে শ্রম প্রতিরোধে ব্যর্থ দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সম্ভাবনার কথাও ইউএসটিআর ইঙ্গিত দিয়েছে।

এসবের বাস্তবায়ন ও পরিধি এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু এগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করে—মার্কিন বাণিজ্যনীতি এখনো অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবু এই চুক্তির গুরুত্ব কেবল শুল্কে সীমাবদ্ধ নয়। বিনিয়োগ সহজীকরণ, কাস্টমস আধুনিকীকরণ, শ্রমমান, ডিজিটাল বাণিজ্য এবং নিয়ন্ত্রক স্বচ্ছতার মতো বিষয়গুলো দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে পারে।

চাপকে সক্ষমতায় রূপান্তর

বাংলাদেশ হয়তো সহজ পরিস্থিতিতে এই চুক্তি করেনি। চুক্তি স্বাক্ষরের সময় ও পটভূমি নিঃসন্দেহে সমালোচনার দাবি রাখে; একই সঙ্গে এ নিয়ে যে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোর অনেকগুলোই যৌক্তিক। তবে বাস্তবতা হলো, বর্তমান বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও কূটনৈতিক পটভূমিতে এই চুক্তি থেকে সরে আসা বাংলাদেশের জন্য সহজ নয় এবং সম্ভবত কৌশলগতভাবেও তা কাম্য নয়। সে কারণে একদিকে চুক্তির সম্ভাব্য অসুবিধাজনক দিকগুলো আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা এবং প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও পুনঃসমঝোতার সুযোগ রাখা জরুরি।

অন্যদিকে, এর সম্ভাবনাময় দিকগুলোকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে কীভাবে কাজে লাগানো যায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক থেকে কী ধরনের কৌশলগত সুবিধা অর্জন করা সম্ভব, সেটিও সমানভাবে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সংস্কার কঠিন পরিস্থিতি থেকেই শুরু হয়। আসল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি বাইরের শর্তের নিষ্ক্রিয় গ্রহণকারী হয়ে থাকবে, নাকি এ সুযোগকে নিজের সংস্কার এজেন্ডা এগিয়ে নেওয়ার কাজে ব্যবহার করবে।

আরও পড়ুন

যদি কৌশল ছাড়া চুক্তিটি বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে তা শেষ পর্যন্ত একতরফা বাজার উন্মুক্ত করার ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে। কিন্তু কৌশলগতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এটি বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন, কাস্টমস ও বাণিজ্যব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, শ্রমমানের বিশ্বাসযোগ্যতা, উন্নত নথিপত্র ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ শৃঙ্খলে আরও স্বচ্ছতা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি এবং উচ্চ মূল্যের বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে গভীর সংযুক্তির সুযোগ তৈরি করতে পারে।

চুক্তিটি নিখুঁত নয়, আবার একেবারে মূল্যহীনও নয়। এতে ঝুঁকি আছে, সুযোগও আছে। বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ হলো, এটি যেন কেবল চাপের মুখে পাওয়া একটি শুল্কছাড় হিসেবেই না থেকে যায়; বরং বিনিয়োগ, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়।

  • এম মাসরুর রিয়াজ পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান

  • মতামত লেখকের নিজস্ব