ফরজ হজ পালন না করার পরিণতি ভয়ানক
ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম ফরজ ইবাদত হজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ইসলাম পাঁচটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত—এই সাক্ষ্য দেওয়া যে আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং নিশ্চয়ই হজরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল, নামাজ কায়েম করা, জাকাত প্রদান করা, হজ সম্পাদন করা ও রমজানে রোজা পালন করা।’ (বুখারি: ৭)। কোরআন মাজিদে রয়েছে, ‘আল্লাহর তরফ থেকে সেসব মানুষের জন্য হজ ফরজ করে দেওয়া হয়েছে, যারা তা আদায়ের সামর্থ্য রাখে।’ (সুরা আলে–ইমরান, আয়াত: ৯৭)
কাবাঘর পুনর্নির্মাণের পর হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে আল্লাহ–তাআলা বললেন, ‘আর তুমি মানুষের মধ্যে হজের ঘোষণা দাও; তারা তোমার কাছে আসবে পদব্রজে ও সর্বপ্রকার ক্ষীণকায় উষ্ট্রপৃষ্ঠে; তারা আসবে দূরপাল্লার পথ অতিক্রম করে।’ (সুরা হজ, আয়াত: ২৭)
হজের ফজিলত সম্পর্কে প্রিয় নবীজি (সা.) বলেন, ‘হজ অতীতের সকল পাপ মুছে দেয়।’ (মুসলিম)। ‘হজ মানুষকে নিষ্পাপ করে, যেভাবে লোহার ওপর থেকে মরিচা দূর করা হয়।’ (তিরমিজি)। ‘যে ব্যক্তি যথাযথভাবে হজ পালন করে, সে পূর্বেকার পাপ থেকে এরূপ নিষ্পাপ হয়ে যায়, যেরূপ সে মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার দিন নিষ্পাপ ছিল।’ (বুখারি)
হজের অন্যতম অনুষঙ্গ হলো তাকওয়া। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘হজ হয় সুনির্দিষ্ট মাসগুলোতে; অতঃপর যে কেউ এই মাসগুলোতে হজের জন্য মনস্থির করে, তার জন্য হজের সময় স্ত্রীসম্ভোগ, অন্যায় আচরণ ও কলহ-বিবাদ বিধেয় নয়। তোমরা উত্তম কাজের যা কিছু করো, আল্লাহ তা জানেন। আর তোমরা (হজের জন্য) পাথেয় ব্যবস্থা করো—তাকওয়া বা আত্মসংযমই শ্রেষ্ঠ পাথেয়। হে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ! তোমরা আমাকে ভয় করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৭)
জীবিত বা মৃত যেকোনো ব্যক্তির বদলি হজ করানো যায়। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব অথবা পরিচিত-অপরিচিত যেকোনো ব্যক্তি যেকোনো ব্যক্তির বদলি হজ করতে বা করাতে পারেন
যাঁদের ওপর হজ ফরজ হয়েছে, তাঁরা যদি হজ পালন না করেন, তাঁদের বিষয়ে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি হজের সামর্থ্য লাভ করার পরও হজ সম্পাদন না করে মৃত্যুবরণ করল, সে ইহুদি বা খ্রিষ্টান অবস্থায় (ইমানহারা হয়ে) মৃত্যুবরণ করলেও তার প্রতি আমার কোনো দায়দায়িত্ব নেই।’ (মুসলিম ও তিরমিজি: ৮১০-৮১২)
জ্ঞানসম্পন্ন, সাবালক ও মুমিন—যাঁরা হজের সফরের ব্যয়ের সামর্থ্য রাখেন এবং সফরকালীন পরিবারের ব্যয় নির্বাহের সংগতিও থাকে, তাঁদের ওপর হজ ফরজ হয়। ফরজ হজ পালন না করে মারা গেলে তা ইমানের পরিপন্থী, কবিরা গুনাহ ও কবরে আজাবের কারণ এবং তা অস্বীকার করা কুফরি। হজ ফরজ হলে তা পালনে কোনো অজুহাতে বিলম্ব করা উচিত নয়।
হজ সম্পাদনে শারীরিকভাবে অক্ষম হলে অন্য কাউকে দিয়ে বদলি হজ করানো জরুরি। যাঁরা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ আদায় করতে পারেননি, তাঁদের কর্তব্য হলো বদলি হজ করানো বা বদলি হজের জন্য অসিয়ত করে যাওয়া। অসিয়তকৃত বদলি হজ অসিয়তকারীর সম্পদ বণ্টনের আগে সম্পাদন করা বা এর জন্য অর্থ আলাদাভাবে রাখা ওয়ারিশদের জন্য ওয়াজিব।
অসিয়ত না করে গেলেও সব ওয়ারিশ সম্মিলিতভাবে অথবা কোনো ওয়ারিশ নিজ উদ্যোগে বা ব্যক্তিগতভাবে তা আদায় করতে বা করাতে পারবেন। এতেও মৃত ব্যক্তি দায়মুক্ত হবেন এবং বদলি হজ করনেওয়ালা ও করানেওয়ালা উভয়েই সওয়াবের অধিকারী হবেন। বদলি হজ যিনি সম্পাদন করেন, যিনি অর্থায়ন করেন এবং যাঁর জন্য হজ করা হয়, সবাই পূর্ণ হজের সওয়াব পাবেন।
জীবিত বা মৃত যেকোনো ব্যক্তির বদলি হজ করানো যায়। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব অথবা পরিচিত-অপরিচিত যেকোনো ব্যক্তি যেকোনো ব্যক্তির বদলি হজ করতে বা করাতে পারেন। বদলি হজ আদায় করতে বা করাতে, যার জন্য বদলি হজ করা হবে বা করানো হবে, তাঁর অনুমতি বা অবগতি জরুরি নয়; তবে সম্ভব হলে তা জানানো উত্তম। নারীর বদলি হজ পুরুষ এবং পুরুষের বদলি হজ নারী পালন করতে পারবেন। যাঁর নিজের হজ ফরজ হয়ে অনাদায়ি রয়েছে, তাঁকে দিয়ে বদলি হজ করানো যাবে না। বদলি হজ আত্মীয়-অনাত্মীয়, নারী-পুরুষ যে কেউ করতে পারেন; তবে বিজ্ঞ ও পরহেজগার লোক দ্বারা করানো উত্তম।
অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম