আসাদপর্ব শেষ, নতুন সিরিয়া গঠন কীভাবে হবে

এ বিজয়োল্লাস সিরীয়দের প্রাপ্য ছিলফাইল ছবি

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল–আসাদের আসাদের পতন বহু বছর ধরে দুর্বল শাসন, অর্থনৈতিক সংকট এবং সামাজিক সমস্যার ফল। এমনকি তাঁর নিজের সমর্থক আলাওয়ি সম্প্রদায়ও তাঁর পক্ষে লড়াই করতে এগিয়ে আসেনি। আসাদের পতনের আরেকটি কারণ হলো রাশিয়া ও ইরানের মতো প্রধান মিত্রদের সমর্থন হারানো। ইউক্রেন যুদ্ধ রাশিয়াকে দুর্বল করেছে। অন্যদিকে ইসরায়েলের হামাস ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযানের ফলে ইরানের অবস্থানও দুর্বল হয়ে পড়েছে। 

সিরিয়ার মানুষ আসাদের জন্য দুঃখ করবে না। কারণ, তিনি এক কঠোর শাসক ছিলেন, যিনি দেশের মানুষকে সব দিক থেকে ব্যর্থ করেছেন। এখন অনেকেই রাস্তায় নেমে আনন্দ প্রকাশ করছেন। যাঁরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে শরণার্থীশিবিরে ছিলেন, তাঁরা ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন। আসাদের পতন শুধু সিরিয়ার ভেতরেই নয়, পুরো অঞ্চলে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আসাদের শাসন ইরান থেকে হিজবুল্লাহর কাছে অস্ত্র পরিবহন সহজ করেছিল। নতুন নেতৃত্ব এই প্রভাব কমাতে এবং একটি স্থিতিশীল আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করতে পারে। 

মধ্যপ্রাচ্যে শক্তিশালী শাসকদের পতনের পর সাধারণত সহিংস অরাজকতা দেখা গেছে। শেষমেশ সেখানে স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। আসাদের শাসনকালে সংখ্যালঘু আলাওয়ি সম্প্রদায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি জনগোষ্ঠীর ওপর শাসন চালিয়েছিল। এটি প্রতিশোধের তথা খুনোখুনির আশঙ্কা তৈরি করেছে। তা ছাড়া সিরিয়ার বৈচিত্র্যময় জনসংখ্যা জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতির শিকার হতে পারে। 

গৃহযুদ্ধের কারণে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চল শত্রুতাপূর্ণ বিভিন্ন গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। এর মধ্যে সিরিয়ার কুর্দিরা পিকেকের (কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি) সঙ্গে যুক্ত। আর পিকেকে তুরস্কে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে পরিচিত। তুরস্কও সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের একটি বড় অংশ দখলে নিয়েছিল। এই বিদ্যমান বিভাজনের মধ্যে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো আসাদের পতন এবং এর ফলে সৃষ্ট অস্থিরতার সুযোগ নিতে পারে। ২০১৪ সালের মতো ইসলামিক স্টেট (আইএস) আবারও দেশটির বড় অংশ দখলে নেওয়ার চেষ্টা চালাতে পারে। এ কারণেই ইসরায়েল সিরিয়ার সীমান্তের বাইরে একটি ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ তৈরি করছে এবং সিরিয়ার অস্ত্রভান্ডার ধ্বংস করছে, যাতে সেগুলো ইসরায়েলের স্বার্থবিরোধী কোনো গোষ্ঠীর হাতে না পড়ে। 

বাশারকে হটিয়ে দেওয়া গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) প্রথমে আল-কায়েদার শাখা হিসেবে গঠিত হয়েছিল এবং এখনো যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশের কাছে এইচটিএস সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত। যদিও এইচটিএস নেতারা একটি জাতীয় সরকার গঠনের লক্ষ্যে সংযম ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তবে তাঁদের দমন-পীড়নের অতীত ইতিহাস আছে। এ ছাড়া সিরিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলো একসঙ্গে কাজ করতে রাজি না হয়ে নিজেদের মধ্যে প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা চালাতে পারে। 

অন্যদিকে সিরিয়ায় ইরানের প্রভাব অনেক কমে গেলেও ইরান এখনো তার ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করবে। বিশেষ করে ইরানের পুরোনো মিত্র আলাওয়ি সম্প্রদায় ক্ষমতা দখলের জন্য তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে লড়াই করতে পারে। এসব কারণে সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। একটি কার্যকর রাষ্ট্র পুনর্গঠন করতে হলে প্রথমে দেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ফিরিয়ে আনতে হবে। এটি তখনই সম্ভব, যখন বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের স্বায়ত্তশাসনের কিছুটা ছাড় দিয়ে জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে রাজি হবে। 

পাশাপাশি একটি নতুন সামাজিক চুক্তি তৈরি করতে হবে, যা জনগণকে যথাযথ নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সুযোগ দেবে। এই পুনর্গঠনের মূল দায়িত্ব যদিও সিরিয়ানদেরই নিতে হবে। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ইরাকের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাইরের শক্তিগুলো সিরিয়ার বিরোধী দলগুলোকে চাপ দিতে পারে। 

তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রকে সিরিয়ায় তাদের মিত্রগোষ্ঠীর ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে, যাতে তারা নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সহযোগিতা করে; নিদেনপক্ষে বিরোধিতা না করে। বাইরের শক্তিগুলো সিরিয়ার রাষ্ট্র এবং অর্থনীতিকে আরও ভেঙে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করতেও ভূমিকা রাখতে পারে। সেখানকার সংঘাত-পরবর্তী স্থায়ী সমাধান অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে, যদি জীবনযাত্রার মান আরও খারাপ হয়। এমন প্রতিকূল পরিবেশেই ইরাকে শাসন পরিবর্তনের পর উগ্রপন্থার উত্থান এবং রাষ্ট্রের ব্যর্থতা দেখা দিয়েছিল। সিরিয়ার জন্য আগামী কয়েক মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সংঘাত-পরবর্তী সমাজগুলোকে স্থিতিশীল করার প্রচেষ্টাগুলোর ইতিহাস ব্যর্থতায় ভরা। গত ১৩ বছরের সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক ও লিবিয়া তার উদাহরণ। সে কারণে সিরিয়া পুনর্গঠন সঠিকভাবে করতে হবে। সেটি করার সময় এখনই। 

 ● চার্লস এ কাপচান জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের সিনিয়র ফেলো এবং সিনান উলগেন তুরস্কের একজন সাবেক কূটনীতিক 

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট; অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ