চাঁদরাতের আমল ও ঈদের দিনের প্রস্তুতি

রমজান মাস পূর্ণ হওয়ার পর পয়লা শাওয়াল হলো ঈদুল ফিতর বা রমজানের ঈদ। শাওয়াল মাসের চাঁদরাতই হলো ঈদের রাত। ঈদের রাত ইবাদতের ফজিলতপূর্ণ রাতগুলোর অন্যতম। চাঁদরাতের প্রথম সুন্নত ও ফরজে কিফায়া আমল হলো সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে চাঁদ দেখা। চাঁদ দেখলে বা চাঁদ দেখার সংবাদ পেলে বিশেষ দোয়া পড়া সুন্নত। (মুসনাদে আহমাদ: ১৪০০, রিয়াদুস সালেহীন: ১২৩৬)

নতুন মাসের চাঁদ দেখার পর যে দোয়া পড়তে হয়, তা হলো, ‘আল্লাহু আকবার! আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল আমনি ওয়াল ইমান, ওয়াস সালামাতি ওয়াল ইসলাম; ওয়া রিদওয়ানিম মিনার রহমান; ওয়া জাওয়ারিম মিনাশ শাইতান; ওয়াত তাওফিকি লিমা তুহিব্বু ওয়া তারদা। রব্বি ওয়া রব্বুকাল্লাহ; হিলালু রুশদিন ওয়া খায়র।’ অর্থাৎ ‘আল্লাহ মহান! হে আল্লাহ! আপনি এই মাসকে আমাদের জন্য নিরাপত্তা, ইমান, শান্তি, ইসলামসহ আগমন করান; পরম দয়াময় আল্লাহর সন্তুষ্টি দান করুন, শয়তান থেকে দূরে রাখুন এবং আপনি যা ভালোবাসেন ও যাতে আপনি সন্তুষ্ট হন, সে আমল করার তৌফিক দিন। আমার ও তোমার প্রভু আল্লাহ। এই চাঁদ হেদায়েত ও কল্যাণের প্রতীক।’ (তিরমিজি: ৩৪৫১)

রমজানের পর পয়লা শাওয়ালের চাঁদরাত তথা ঈদের রাতের আমল হলো: মাগরিব, এশা ও ফজরের নামাজ নারীদের যথাসময়ে এবং পুরুষদের জামাতের সঙ্গে আদায় করা। রাতের ইবাদতের জন্য বিশেষভাবে পবিত্রতা অর্জন করা; সম্ভব হলে গোসল করা। ইবাদতের উপযোগী ভালো পোশাক পরিধান করা এবং সুগন্ধি ব্যবহার করা। মাগরিবের পর আউওয়াবিন নামাজ পড়া এবং শেষ রাতে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করা। রাত জেগে নফল ইবাদতে মশগুল থাকা, নফল নামাজ আদায় করা।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন ঈদের দিন তথা ঈদুল ফিতরের দিন আসে, তখন আল্লাহ বান্দাদের বিষয়ে ফেরেশতাদের সঙ্গে গর্ব করে বলেন, “হে আমার ফেরেশতারা! যে শ্রমিক তার কাজ সম্পন্ন করেছে, তার বিনিময় কী?” তারা বলবে, “তাদের বিনিময় হলো তাদের পারিশ্রমিক পূর্ণভাবে প্রদান করা।” আল্লাহ বলবেন, “হে আমার ফেরেশতারা! আমার বান্দা-বান্দীরা তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করেছে, তারপর সালাত ও দোয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়েছে। আমার সম্মান, মহত্ত্ব, করুণা, মাহাত্ম্য ও উচ্চ মর্যাদার শপথ! আমি তাদের প্রার্থনা কবুল করব।” এরপর আল্লাহ–তাআলা বলবেন, “তোমরা ফিরে যাও, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিলাম এবং তোমাদের মন্দ আমলগুলো নেকিতে পরিবর্তন করে দিলাম।’ নবীজি (সা.) বলেন, ‘তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে ফিরে যাবে।’ (খুতবাতুল আহকাম, পৃষ্ঠা: ১৬২-১৬৬)

ঈদের প্রস্তুতি ও ঈদের দিনের আমল: আগে থেকেই শারীরিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা; হাত-পায়ের নখ কাটা, ক্ষৌরকর্ম করা। ঈদের রাতে ঘুমানোর আগে চোখে সুরমা ব্যবহার করা। ঈদের দিন খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠা; ফজরের নামাজ পুরুষেরা মসজিদে জামাতে আদায় করা এবং নারীরা নিজ গৃহে নির্জনে প্রথম ওয়াক্তে আদায় করা। প্রভাতে মিসওয়াক করা ও গোসল করা। সকালে খেজুর বা মিষ্টান্ন দ্বারা প্রাতরাশ গ্রহণ করা। সামর্থ্য অনুযায়ী সুন্দর ও উত্তম সুন্নতি পোশাক এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জামাকাপড় পরিধান করা। টুপি ও পাগড়ি পরিধান করা এবং আতর বা সুগন্ধি ব্যবহার করা। সদকাতুল ফিতর আদায় করা।

পুরুষ ও ছেলেরা ঈদের মাঠে গিয়ে ঈদের জামাতে অংশগ্রহণ করা এবং খুতবা শোনা—উভয়ই ওয়াজিব। সম্ভব হলে ঈদগাহে এক পথে যাওয়া এবং অন্য পথে ফিরে আসা। ঈদের মাঠে যাওয়া-আসার পথে নিম্নস্বরে তাকবির (‘আল্লাহু আকবার’, অর্থাৎ ‘আল্লাহ সবচেয়ে মহান’) পাঠ করা। সম্ভব হলে ঈদগাহে বা খোলা মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করা। সুযোগ থাকলে স্থানীয় কবরস্থান ও আত্মীয়স্বজনের কবর জিয়ারত করা। আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া, সাক্ষাৎ করা ও খোঁজখবর নেওয়া এবং একে অন্যকে আপ্যায়ন করা। দূরে অবস্থানকারী আত্মীয়স্বজন ও প্রিয়জনদের সঙ্গে ফোনে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগ করে খোঁজখবর নেওয়া ও শুভেচ্ছা বিনিময় করা।

  • অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী

  • সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম

  • [email protected]