বিমান বাংলাদেশ: ঢাকা-টরন্টোর অভিজ্ঞতা ও ঢাকা-নিউইয়র্কের সম্ভাবনা

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজছবি: বিমানের ফেসবুক পেজ

এ বছর আগস্ট মাসের শেষের দিকে আমেরিকান দূতাবাসের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য দেশে গিয়ে বিমান বাংলাদেশে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা হয়। বাংলাদেশে যাওয়ার আগে অনেকেই আমাকে বিমান বাংলাদেশ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। বিশেষ করে, কিছুদিন আগে টরন্টো থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে ইতালির রোমে যাত্রাবিরতির আগে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় যাত্রীদের দীর্ঘ সময় ভোগান্তি পোহাতে হয়েছিল। তাই আমার পরিচিতজনেরা আমাকে এই বলে সতর্ক করেছিলেন যে যান্ত্রিক ত্রুটি, মাঝ আকাশে নানা সমস্যা এবং নিম্নমানের যাত্রীসেবা বিমান বাংলাদেশের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

এসব কথা শুনে আমার মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকলেও ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা এড়িয়ে বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য আমার কাছে বিমান বাংলাদেশই ছিল সবচেয়ে সুবিধাজনক পছন্দ। তা ছাড়া নিউইয়র্ক সিটির তুলনায় টরন্টো আমার বাড়ির অনেক কাছে হওয়ায় বিমান বাংলাদেশকে বেছে নেওয়াই ছিল সবচেয়ে সাশ্রয়ী সিদ্ধান্ত।

আরও পড়ুন

আমি প্রথমেই ধাক্কা খেলাম বিমান বাংলাদেশের টরন্টো অফিসের ফোনভিত্তিক যাত্রীসেবার ধরন দেখে। অতিরিক্ত একটি ব্যাগ নিতে পারব কি না, পারলে কত খরচ পড়বে—এসব জানতে বিমানের টরন্টো অফিসে একাধিকবার ফোন করেও কাউকে পাইনি। যতবারই ফোন করেছি, ততবারই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় স্টেশন ম্যানেজার, কান্ট্রি ম্যানেজারসহ বিভিন্ন পদে থাকা কর্মকর্তাদের কাছে কল স্থানান্তর করা হয়েছে।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা এভাবে ঘোরানোর পরও ফোন রিসিভ করার মতো কাউকে পাইনি। এর মানে কী? পদ আছে, লোক আছে কিন্তু যাত্রীসেবা দেওয়ার মতো কেউ নেই। আমি দুপুরবেলায় ফোন করেছিলাম অর্থাৎ কর্মব্যস্ত অফিস সময়ে।

ব্যবসা সম্পর্কে যাঁদের ন্যূনতম জ্ঞান আছে, তাঁরা জানেন, কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অনলাইন উপস্থিতি থাকলেও যদি তারা গ্রাহকদের বার্তার উত্তর না দেয়, তবে এর চেয়ে খারাপ গ্রাহকসেবা বা ব্যবসায়িক নীতি আর কিছু হতে পারে না। পরে টরন্টো বিমানবন্দরে বিমানের কাউন্টারে লাগেজের ওজন নিয়ে বড় ধরনের ঝামেলায় পড়তে হয়েছিল। এক পাউন্ড ওজন বেশি হলেও কয়েক শ ডলার অতিরিক্ত পরিশোধ করতে বলা হয়েছিল।

বিমানের ঢাকা-টরন্টো রুটের মতো ঢাকা-নিউইয়র্ক রুটও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের কাছে জনপ্রিয় হতে পারে। যথাযথভাবে পরিচালনা করতে পারলে এই রুটটিও লাভজনক হয়ে উঠতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, বিমানের ঢাকা-নিউইয়র্ক রুট হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী লাখ লাখ বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধার প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তাঁদের ন্যূনতম সেবা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস।

ফেরার সময় বাংলাদেশেও একই অবস্থা দেখেছি। মাত্র এক পাউন্ড ওজন বেশি হওয়ার জন্য কানাডায় পড়তে আসা ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে ২০-২৫ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছিল। প্রায় দুই দশক ধরে আমেরিকায় থাকা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের সুবাদে আমি অনেক নামীদামি এয়ারলাইনসের যাত্রীসেবা দেখেছি। কিন্তু এ রকম জগাখিচুড়ি ধরনের যাত্রীসেবা এবং বিমানের কর্মকর্তাদের যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের প্রবণতা অন্য কোথাও দেখিনি।

মজার ব্যাপার হলো, বিমানের ভেতরের সেবা, কারিগরি পরিচালনা এবং যথাসময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর মতো বিষয়ে অন্য দেশের এয়ারলাইনসের সঙ্গে বিমানের সেবার বড় কোনো তফাত আমার চোখে পড়েনি।

তবে আমার মনে হয়েছে, বিমানের ভেতরে যাত্রীসেবার জন্য প্রয়োজনের তুলনায় লোকবল কম। বিশেষ করে ঢাকা-টরন্টো ফ্লাইটে যাত্রীদের ধরন ও চাহিদার ভিন্নতার কারণে ইন-ফ্লাইট সেবার জন্য লোকবল বাড়ানো দরকার। যেমন অনেক যাত্রী আছেন, যাঁরা জীবনে প্রথমবার বিমানে উঠেছেন; ২০ ঘণ্টা একটানা বসে থেকে ভ্রমণের কষ্টও তাঁদের কাছে একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা।

আরও পড়ুন

অনেক যাত্রীই বয়স্ক নারী-পুরুষ, যাঁদের বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা রয়েছে। তাঁদের অনেকেই বিমানের টয়লেট ব্যবহার করতে অভ্যস্ত নন। ফলে টয়লেট অপরিষ্কার হয়ে যেতে পারে। সময়মতো পরিষ্কার করার জন্য পর্যাপ্ত কর্মী না থাকলে অন্য যাত্রীদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হয়। তা ছাড়া খাবার পরিবেশন এবং যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী অন্যান্য সেবা ও পরিচর্যার জন্যও প্রয়োজনীয় লোকবল দরকার। ঢাকা-টরন্টো ফ্লাইটে কেবিন ক্রুদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। তাঁরাও আমার সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন এবং বিষয়টি উপলব্ধি করার জন্য আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

সাধারণত, বিভিন্ন এয়ারলাইনসে যাত্রী ও কেবিন ক্রুর অনুপাত ভিন্ন হতে পারে—কোথাও প্রতি ১৭ জন যাত্রীর জন্য একজন কেবিন ক্রু (যেমন সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস), আবার কোনো বাজেট এয়ারলাইনসে প্রতি ৫০ জন যাত্রীর জন্য একজন কেবিন ক্রুও থাকতে পারেন। বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা অনেক।

সরকারি কর্মকর্তাদের একটি অংশের দুর্নীতি ও অর্থ লুটপাটের বিষয়টিও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। তাই বিমান বাংলাদেশের ফ্লাইটে প্রয়োজন অনুযায়ী বেশি কেবিন ক্রু নিয়োগ করা হলে যেমন কর্মসংস্থান বাড়বে, তেমনি দেশের জন্য রেমিট্যান্স পাঠানো প্রবাসীদের কাছ থেকেও সরকার দোয়া পাবে।

আমার দেখামতে, বিমানের ঢাকা-টরন্টো ফ্লাইট যাত্রীতে কানায় কানায় পূর্ণ ছিল; কোনো আসনই খালি ছিল না। নিউইয়র্ক রাজ্যের বাংলাদেশি-অধ্যুষিত শহর, যেমন বাফেলো, আলবানি ও রচেস্টার—টরন্টো থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার গাড়ি চালানোর দূরত্বে। এ কারণে এসব শহরে বসবাসকারী বহু বাংলাদেশি বিমানের ঢাকা-টরন্টো ফ্লাইট ব্যবহার করেন।

বিমানের কেবিন ক্রুরা আমাকে জানান, এই রুটের প্রায় ৮০ শতাংশ আয় কার্গো পরিবহন থেকে আসে। ইতালির রোমে যাত্রাবিরতির কারণে বাংলাদেশ থেকে প্রচুর তাজা পণ্য এই রুটে ইতালি ও কানাডা—উভয় দেশেই পৌঁছাতে পারে; ইতালি ও কানাডায় বসবাসকারী বাংলাদেশিদের কাছে এসব পণ্য খুবই জনপ্রিয়।

বিমানের ঢাকা-টরন্টো রুটের মতো ঢাকা-নিউইয়র্ক রুটও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের কাছে জনপ্রিয় হতে পারে। যথাযথভাবে পরিচালনা করতে পারলে এই রুটটিও লাভজনক হয়ে উঠতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, বিমানের ঢাকা-নিউইয়র্ক রুট হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী লাখ লাখ বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধার প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তাঁদের ন্যূনতম সেবা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস। দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানো এসব প্রবাসীর প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এ বিষয়ে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অচিরেই ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে বলে আশা করি।

  • ড. দিলওয়ার আরিফ যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ক্যানিসিয়াস ইউনিভার্সিটির মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও পরিচালক

    [email protected]

    মতামত লেখকের নিজস্ব