আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানবাধিকারকর্মী আইরিন খানকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিয়ে এবং তাঁকে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা দিয়ে সরকার বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন ভাষা, নতুন আত্মবিশ্বাস ও নতুন রাজনৈতিক বার্তার ঘোষণা দিয়েছে।
এ সিদ্ধান্তের তাৎপর্য বোঝার জন্য এটিকে কেবল প্রশাসনিক নিয়োগ হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি বাংলাদেশের কূটনীতিতে নৈতিক পুঁজি, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তার পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি প্রচেষ্টা।
কোনো রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি শুধু দূতাবাস, বৈঠক, প্রস্তাব, ভোটাভুটি বা কূটনৈতিক ভাষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পররাষ্ট্রনীতি আসলে একটি দেশের আত্মপরিচয়ের প্রকাশ। বাংলাদেশ বিশ্বকে কী বলতে চায়? বাংলাদেশ নিজেকে কীভাবে দেখতে চায়? বাংলাদেশ কি কেবল উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি ও ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের ভাষায় কথা বলবে, নাকি মানবাধিকার, মর্যাদা, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভাষাও নিজের কূটনীতির কেন্দ্রে আনবে? আইরিন খানের নিয়োগ এ প্রশ্নগুলোর একটি সাহসী উত্তর।
আইরিন খান এমন একজন মানুষ, যাঁর নামের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আন্দোলন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নারীর নেতৃত্ব, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং বৈশ্বিক নৈতিক অবস্থানের ইতিহাস জড়িয়ে আছে।
তিনি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রথম নারী মহাসচিব ছিলেন এবং পরে জাতিসংঘের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর পেশাগত জীবন কেবল পদবির তালিকা নয়; বরং ক্ষমতার সামনে সত্য বলার, ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানোর এবং রাষ্ট্রকে নাগরিকের মর্যাদার কাছে জবাবদিহিমূলক করার এক দীর্ঘ অভিজ্ঞতা।
এ জায়গাতেই আইরিন খানের নিয়োগ বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি পদটি সাধারণ কোনো কূটনৈতিক পদ নয়। এটি এমন এক মঞ্চ, যেখানে প্রতিদিন রাষ্ট্রের পরিচয়, অবস্থান, বিশ্বাসযোগ্যতা ও কৌশল পরীক্ষা হয়। সেখানে রোহিঙ্গা সংকট আছে, জলবায়ু ন্যায়বিচার আছে, শান্তিরক্ষা মিশন আছে, অভিবাসন আছে, শ্রম অধিকার আছে, মানবাধিকার পরিষদ আছে, উন্নয়ন অর্থায়ন আছে, ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের মর্যাদা আছে এবং আছে বড় শক্তিগুলোর চাপের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কঠিন বাস্তবতা।
সরকার কেন এ নিয়োগের মাধ্যমে শক্ত বার্তা দিল? কারণ, আইরিন খানকে নিয়োগ দেওয়া মানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বলা, বাংলাদেশ আত্মরক্ষামূলক কূটনীতির বাইরে যেতে চায়। বাংলাদেশ শুধু সমালোচনার জবাব দিতে চায় না; বরং আলোচনার ভাষা বদলাতে চায়।
এমন জায়গায় একজন পেশাদার কূটনীতিকের দক্ষতা অবশ্যই দরকার, কিন্তু তার সঙ্গে দরকার এমন একজন কণ্ঠ, যাঁকে বিশ্ব শুনতে চায়, বিশ্বাস করতে চায় এবং যার নৈতিক অবস্থানকে সহজে উপেক্ষা করতে পারে না।
সরকার কেন এ নিয়োগের মাধ্যমে শক্ত বার্তা দিল? কারণ, আইরিন খানকে নিয়োগ দেওয়া মানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বলা, বাংলাদেশ আত্মরক্ষামূলক কূটনীতির বাইরে যেতে চায়। বাংলাদেশ শুধু সমালোচনার জবাব দিতে চায় না; বরং আলোচনার ভাষা বদলাতে চায়।
যে রাষ্ট্র একসময় মানবাধিকার, গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও জবাবদিহির প্রশ্নে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ছিল, সেই রাষ্ট্র যদি আজ এমন একজন ব্যক্তিকে জাতিসংঘে পাঠায়, যিনি এসব বিষয়ের বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত কণ্ঠ, তাহলে সেটি কেবল ইমেজ মেরামতের কৌশল নয়; বরং নিজেকে পুনর্গঠনের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিও হতে পারে।
তবে এ সিদ্ধান্ত সাহসী বলেই এটি সহজ নয়; বরং সরকারের জন্য এটি একধরনের দুঃসাহসিক পরীক্ষা। কারণ, আইরিন খান এমন কেউ নন, যাঁকে কেবল রাষ্ট্রীয় বক্তব্য পাঠ করে শোনানোর জন্য নিয়োগ করা যায়। তাঁর পরিচয়, তাঁর ইতিহাস, তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা—সবকিছুই তাঁকে নৈতিকভাবে স্বাধীন ও দৃঢ় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। তাঁকে নিয়োগ দেওয়ার অর্থ হলো সরকার এমন একজনকে সামনে আনছে, যিনি আন্তর্জাতিক পরিসরে বিশ্বাসযোগ্য, কিন্তু একই সঙ্গে তিনি অধিকার, জবাবদিহি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে আপসকামী নন। ফলে এ নিয়োগ সরকারকে যেমন আন্তর্জাতিক আস্থা এনে দিতে পারে, তেমনি সরকারকেও নিজের ভেতরে সংস্কারের দায়বদ্ধতায় রাখবে।
এই দিক থেকে নিয়োগটি সরকারের জন্য সুবিধা যেমন, পরীক্ষা তেমন। শুধু নিউইয়র্কে শক্তিশালী বক্তব্য দিলেই হবে না, ঢাকায়ও সেই ভাষার প্রতিফলন থাকতে হবে। জাতিসংঘে যদি বাংলাদেশ মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলে, কিন্তু দেশে যদি মতপ্রকাশ, নাগরিক স্বাধীনতা, বিচারপ্রক্রিয়া, সংবাদমাধ্যম বা রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রশ্নে দুর্বলতা থাকে, তাহলে সেই কূটনীতি টেকসই হবে না।
আইরিন খানের মতো ব্যক্তিত্বকে নিয়োগ দেওয়ার পর সরকারকে আরও সতর্ক হতে হবে; কারণ, তাঁর উপস্থিতি প্রত্যাশা বাড়াবে। বিশ্ব বলবে—বাংলাদেশ কি সত্যিই বদলাচ্ছে, নাকি শুধু ভালো মুখপাত্র নিয়োগ করছে?
এ প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে সরকার তাঁকে কতটা স্বাধীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ও নীতিগত স্পেস দেয়, তার ওপর। আইরিন খান যদি শুধু আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধি হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর নিয়োগের সম্ভাবনা সীমিত হয়ে যাবে। কিন্তু যদি তাঁকে রাষ্ট্রীয় কূটনীতির নীতিনির্ধারণী আলোচনার অংশ করা হয়, যদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান, অভিবাসন, জলবায়ু, শ্রম ও রোহিঙ্গা-সংক্রান্ত সংস্থাগুলোর সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়ের সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে তিনি বাংলাদেশের জন্য অসাধারণ কূটনৈতিক সম্পদে পরিণত হতে পারেন।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক নৈতিক প্রশ্নগুলোর একটি রোহিঙ্গা সংকট। বহু বছর ধরে বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানবিকতার এক বিরল উদাহরণ তৈরি করেছে।
কিন্তু কূটনৈতিক বাস্তবতা হলো, রোহিঙ্গা প্রশ্নে আন্তর্জাতিক মনোযোগ কমছে, অর্থায়ন সংকুচিত হচ্ছে, প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত জটিল এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর স্বার্থ একরৈখিক নয়। এখানে বাংলাদেশের দরকার শুধু সহানুভূতির ভাষা নয়; দরকার ন্যায়বিচার, দায়বদ্ধতা, নিরাপদ প্রত্যাবাসন, আন্তর্জাতিক চাপ এবং মানবিক অর্থায়নের নতুন কাঠামো। আইরিন খান এ প্রশ্নে বাংলাদেশের কণ্ঠকে আরও নৈতিক, আইনি ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করতে পারেন।
জলবায়ু ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রেও আইরিন খানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি, কিন্তু বাংলাদেশের দাবি শুধু ক্ষতিপূরণ পাওয়ার দাবি নয়; এটি উন্নয়ন, ন্যায়বিচার, বৈশ্বিক দায় ও মানবিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। জলবায়ু উদ্বাস্তু, অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি, উপকূলীয় বিপর্যয়, কৃষি সংকট, নগরমুখী চাপ—এসব প্রশ্ন জাতিসংঘে আরও মানবিক ভাষায় তোলা দরকার। আইরিন খান উন্নয়ন ও অধিকারের ভাষাকে এক করতে পারেন। এটাই তাঁর বিশেষ শক্তি।
অভিবাসন ও প্রবাসী শ্রমিকের প্রশ্নেও বাংলাদেশ নতুন ভাষা চায়। বাংলাদেশি শ্রমিকেরা বিদেশে শুধু রেমিট্যান্স পাঠান না; তাঁরা বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবার, সমাজ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অদৃশ্য স্তম্ভ। অথচ তাঁদের ভিসাবৈষম্য, শ্রম শোষণ, মজুরিবঞ্চনা, পাসপোর্টের দুর্বলতা, কনস্যুলার সেবার সীমাবদ্ধতা ও মর্যাদাহীনতার অভিজ্ঞতা গভীর। জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব যদি অভিবাসী শ্রমিকের অধিকার, নিরাপদ অভিবাসন, নিয়োগব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারে ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে আরও শক্তভাবে তোলে, তাহলে তা সরাসরি কোটি মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত হবে।
এ নিয়োগ নারীর নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও শক্ত বার্তা। বাংলাদেশ বহুদিন ধরে নারীর অগ্রগতি নিয়ে কথা বলে, কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নৈতিক-রাজনৈতিক নেতৃত্বে একজন বাংলাদেশি নারীকে এত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আনা একধরনের প্রতীকী ও বাস্তব অগ্রগতি। আইরিন খান প্রমাণ করেন, নারী নেতৃত্ব মানে শুধু প্রতিনিধিত্ব নয়; নেতৃত্ব মানে নীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, সাহস, বৈশ্বিক মর্যাদা এবং কঠিন প্রশ্নে অবস্থান নেওয়ার সক্ষমতা।
তবে আইরিন খানকে সফল করতে হলে সরকারকে তিনটি কাজ করতে হবে। প্রথমত, তাঁকে কেবল বার্তাবাহক নয়, নীতিগত উপদেষ্টা হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জাতিসংঘে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারগুলোকে নতুনভাবে সাজাতে হবে—রোহিঙ্গা, জলবায়ু, অভিবাসন, মানবাধিকার, শান্তিরক্ষা, উন্নয়ন অর্থায়ন ও ডিজিটাল অধিকারের প্রশ্নকে এক বিস্তৃত নৈতিক কূটনীতির অংশ করতে হবে। তৃতীয়ত, দেশের ভেতরে সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে হবে। কারণ, আধুনিক কূটনীতিতে অভ্যন্তরীণ শাসন ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি আলাদা করে রাখা যায় না।
আইরিন খানের নিয়োগ তাই সরকারের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও দায়। সুযোগ; কারণ, তাঁর মতো একজন ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশের কূটনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিতে পারেন। দায়; কারণ, তাঁর নামের সঙ্গে যে মূল্যবোধ যুক্ত, তা কেবল জাতিসংঘের বক্তৃতায় নয়, রাষ্ট্রের আচরণেও প্রতিফলিত হতে হবে। তিনি বাংলাদেশের জন্য দরজা খুলতে পারেন, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে হাঁটার রাজনৈতিক সাহস দেখাতে হবে সরকারকেই।
বাংলাদেশকে বিশ্ব নতুনভাবে দেখছে, আবার সন্দেহও করছে। এ মুহূর্তে আইরিন খানকে জাতিসংঘে পাঠানো মানে বিশ্বকে বলা—বাংলাদেশ নিজের ভবিষ্যৎকে শুধু ক্ষমতার ভাষায় নয়, মর্যাদা ও অধিকারের ভাষায়ও লিখতে চায়। এটি যদি আন্তরিক হয়, তবে সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী, দূরদর্শী ও সাহসী। কারণ, কোনো দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তার অর্থনীতি, সেনাবাহিনী বা ভূরাজনৈতিক অবস্থান নয়, তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা। আইরিন খান সে বিশ্বাসযোগ্যতারই এক বিরল বাহক।
তাই এ নিয়োগকে শুধু একজন রাষ্ট্রদূতের নিয়োগ হিসেবে দেখা ভুল হবে। এটি বাংলাদেশের কূটনীতির চরিত্র নিয়ে এক নতুন ঘোষণা। এটি বলছে, বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চায়—শুধু উন্নয়নের গল্প নিয়ে নয়, অধিকার, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও মর্যাদার ভাষা নিয়েও। এখন দেখার বিষয়, এই শক্তিশালী বার্তাকে সরকার কতটা বাস্তব নীতিতে রূপ দিতে পারে। যদি পারে, তবে আইরিন খানের নিয়োগ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে থাকবে।
ড. এ কে এম আহসান উল্লাহ অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক, নিরাপত্তা ও অভিবাসন। ইউনিভার্সিটি অব ব্রুনেই দারুস সালাম, ব্রুনেই
[email protected], [email protected]
মতামত লেখকের নিজস্ব
