শীতকাতর আবদুল করিমদের জীবন ও ধমকাধমকির রাজনীতি

আগের রাতে ১২টা পর্যন্ত রিকশা চালিয়েছেন। চেয়েছিলেন সকালে উঠে আবার বেরোতে। কিন্তু শীতের এমনই কামড় যে প্যাডেল মারা দুঃসাধ্য। অগত্যা রিকশার গদিকে বালিশ বানিয়ে কম্বল গায়ে শুয়ে আছেন রিকশাচালক আবদুল করিম (৫৫)। গতকাল সকাল সাড়ে নয়টায়, রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায়ছবি: সৈয়দ জাকির হোসেন

পত্রিকার পাতা খুললে, টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখলে প্রায় প্রতিদিনই নেতাদের হুংকার শুনি। কে কাকে কীভাবে দেখিয়ে দেবেন, সেই বয়ান চলতে থাকে। নেতারা কথা শুরু করেন ধমক দিয়ে, শেষও করেন ধমক দিয়ে। সরকারি দলের নেতাদের কথা শুনলে মনে হবে দেশে বিরোধী দল বলে কিছু নেই। আর বিরোধী দলের নেতাদের কথা শুনলে এই ধারণা হওয়াই স্বাভাবিক যে গণেশ উল্টে যেতে বেশি দিন লাগবে না। কিন্তু এই নেতারা সোমবার (৯ জানুয়ারি) প্রথম আলোর প্রথম পাতায় প্রকাশিত ছবিটি কি দেখেছেন? দেখলে তাঁদের ভেতরে কি প্রতিক্রিয়া হয়েছে, আদৌ হয়েছে কি না সেটা জানতে ইচ্ছা করে।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে সকাল সাড়ে নয়টায় ছবিটি তুলেছেন প্রথম আলোর প্রধান আলোকচিত্রী সৈয়দ জাকির হোসেন। ছবির পরিচিতিতে লেখা আছে, ‘আগের রাতে ১২টা পর্যন্ত রিকশা চালিয়েছেন। চেয়েছিলেন সকালে উঠে আবার বেরোতে। কিন্তু শীতের এমনই কামড় যে প্যাডেল মারা দুঃসাধ্য। অগত্যা রিকশার গদিকে বালিশ বানিয়ে কম্বল গায়ে শুয়ে আছেন চালক রিকশাচালক আবদুল করিম (৫৫)।’

এ রকম দৃশ্য ঢাকা শহরে এবং সারা দেশে আরও অনেক দেখা যায়। অনেক রিকশাচালক ও ভ্যানচালকের থাকার জায়গা নেই। ফুটপাতই তাদের ঘর। রিকশার প্যাডেলই জীবন। কম্বল মুড়ি দিয়ে রিকশাচালক আবদুল করিম যেখানে শুয়ে আছেন, এর পাশের দেয়ালে লেখা ‘মোদের গরব, মোদের আশা, আ-মরি বাংলা ভাষা। তোমার কোলে তোমার বোলে কত শান্তি ভালোবাসা।’

কিন্তু ৫৫ বছর বয়সী রিকশাচালকের জীবনে কোনো আশা সৃষ্টি করতে পারেনি এই রাষ্ট্র। তাঁদের জীবনে কোনো আশা নেই। ভাষা নেই। কেবলই দিনযাপনের গ্লানি বয়ে চলেন। এই ঢাকা শহরে নিরাশ্রয়ী মানুষের সংখ্যা কত, তার হিসাব কি রাখেন আমাদের রাজনীতিকেরা? রাখেন না। রাখার প্রয়োজনও নেই। তাদের কাছে এরা কেবলই সংখ্যা। সারা দিন রিকশা চালিয়ে আবদুল করিমরা যা পান, তা দিয়ে কোনোভাবে খেয়েপরে বেঁচে থাকেন। বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানদের জন্যও টাকা পাঠাতে হয়। ঢাকা শহরের এই রিকশা চালকদের আবার নির্বাচিত প্রতিনিধিরা চেনেন না। চিনতে চান না। তারা ঢাকার ভোটার নন। ভোট দিতে পারুন আর না-ই পারুন গ্রামের ঠিকানায় ভোটার হয়েছেন। ঢাকা শহর তাদের কাছে অচেনা।

জনগণের সঙ্গে ক্ষমতার রাজনীতির সংযোগ ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। আগে হয়তো পাঁচ বছর পর ভোটের দিন রাজনীতিকেরা ভোটারদের কাছে যেতেন। এখন হয়তো তারও প্রয়োজন হয় না। আমাদের রাজনীতিকদের মুখে নির্বাচন ছাড়া কোনো কথা নেই। এক দল বলছে এভাবে নির্বাচন হবে, আরেক দল বলছে ওভাবে নির্বাচন হবে। কিন্তু যাদের নিয়ে রাজনীতি ও নির্বাচন, সেই গণমানুষের কথা তাঁরা কেউ ভাবছেন না। ধমকাধমকির রাজনীতি করছেন। আর নিরাশ্রয়ী আবদুল করিমরা ফুটপাতে রাত কাটাচ্ছেন।

এই বিশাল ঢাকা শহরে আবদুল করিমের কোনো আশ্রয় নেই। ঘরভাড়া দেওয়ারও সামর্থ্য নেই। দিন শেষে হয় রিকশার গ্যারেজে অথবা ফুটপাতে ক্লান্ত শরীর বিছিয়ে দেন। অনেক রিকশাচালককে দেখেছি দড়ির একাংশ শরীরের সঙ্গে বাধা আরেক অংশ রিকশার চাকায়। রিকশাটি চুরি হলে সর্বনাশ। এভাবেই তাঁদের জীবন চলে। সরকারি দলের নেতারা যে উন্নয়নের রোল মডেলের খোয়াব দেখান, বিরোধী দলের নেতারা যে রাষ্ট্র মেরামতের আওয়াজ তোলেন, সেসব কিছুই আবদুল করিমদের কানে পৌঁছায় না। পৌঁছানোর কথাও নয়। রাষ্ট্রের কাছে তারা একটি সংখ্যা মাত্র। এর বেশি কিছু নয়।
সরকার গৃহহীনদের জন্য লাখ লাখ ঘর তৈরি করে দিয়েছে। সেই ঘর কারা পেয়েছেন? শহীদ মিনারের ফুটপাতে শুয়ে থাকা রিকশাচালক আবদুল করিমদের ভাগ্যে জোটেনি। কয়েক দিন আগে প্রথম আলোয়ই খবর বের হয়েছিল, ঢাকার নবাবগঞ্জে যাঁদের আলিশান বাড়ি আছে, তাঁরা খাসজমি পেয়েছেন। রাজশাহীতে যাঁদের দোতলা বাড়ি আছে, তাঁরাও করোনাকালের খয়রাতি সাহায্য পেয়েছেন।

আরও পড়ুন

কয়েক দিন ধরে শৈত্যপ্রবাহ চলছে। পুরো বাংলাদেশ শীতে কাতর। যাঁরা সমাজের ধনবান, তাঁরা তোরঙ্গ খুলে গরম কাপড় বের করে শীত থেকে নিজেদের রক্ষা করছেন। চাইলে বিদেশ থেকে দামি নতুন কাপড়ও কিনে আনতে পারেন। কিন্তু গরিবগোবরা মানুষের ভরসা পুরোনো কাপড়ের বাজার। সেখান থেকে সস্তায় গরম কাপড় কিনে কোনোরকমে আবদুল করিমেরা শীত নিবারণ করেন।

অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের পুরোনো গরম কাপড় থাকে। সেই কাপড় কীভাবে গরিবদের কাছে পৌঁছানো যায়, তা-ও জানা নেই। একসময় পাড়ায় পাড়ায় ক্লাব ছিল। ক্লাবের সদস্যরা এসব কাপড় সংগ্রহ করে গরিবদের পৌঁছে দিত। প্রথম আলো ট্রাস্ট, বন্ধুসভার বন্ধুরা এখনো সাধ্যমতো গরিবদের মধ্যে গরম কাপড় বিতরণ করছেন। আরও অনেক সংগঠন এগিয়ে এসেছে। কিন্তু বড় বড় রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীদের এ কাজে দেখা যায় না।

জনগণের সঙ্গে ক্ষমতার রাজনীতির সংযোগ ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। আগে হয়তো পাঁচ বছর পর ভোটের দিন রাজনীতিকেরা ভোটারদের কাছে যেতেন। এখন হয়তো তারও প্রয়োজন হয় না। আমাদের রাজনীতিকদের মুখে নির্বাচন ছাড়া কোনো কথা নেই। এক দল বলছে এভাবে নির্বাচন হবে, আরেক দল বলছে ওভাবে নির্বাচন হবে। কিন্তু যাদের নিয়ে রাজনীতি ও নির্বাচন, সেই গণমানুষের কথা তাঁরা কেউ ভাবছেন না। ধমকাধমকির রাজনীতি করছেন। আর নিরাশ্রয়ী আবদুল করিমরা ফুটপাতে রাত কাটাচ্ছেন।
এই বাংলাদেশ কি আমরা চেয়েছিলাম?

  • সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্মসম্পাদক ও কবি