দুদক কর্মকর্তাদের মুখে ‘রাঘববোয়াল’ এবং ‘চুনোপুঁটি’—এই শব্দ দুটো এতবার আমরা শুনেছি যে দুদককে মাঝেমধ্যে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থার বদলে ‘ফিশিং বোট’ ভাবতে মন চায়। মনে হয়, এই কর্মকর্তারা বিরাট বিরাট খ্যাপলা জাল বা ঝাঁকি জাল হাতে নিয়ে মাছ মেরে যাচ্ছেন।

সাবেক জরুরি অবস্থাকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তৎকালীন দুদক প্রধান হাসান মশহুদ চৌধূরী বলেছিলেন, ‘চুনোপুঁটি ধরতে আসিনি, রাঘববোয়াল ধরতে এসেছি।’ সম্ভবত তখন থেকেই দুদকের মধ্যে এই ‘মাছ মারা’ শব্দবন্ধ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তখন একের পর এক বড় বড় ব্যবসায়ী ও আমলার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য ডাকা হচ্ছিল। কাউকে ধরা হচ্ছিল। কাউকে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সবাই ছাড়া পেয়ে গেছেন এবং দুদক ডাকার কারণে তাঁরা ধনী হিসেবে একটা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেয়েছেন। এই স্বীকৃতি লজ্জার নয়, গর্বের।

সাধারণত রাঘববোয়াল ধরার জন্য যে জাল ফেলা হয়, তার ‘ফাঁক’ থাকে বড়। সেই জালে বড় বড় মাছ ধরা পড়ে। ছোট ছোট চ্যালাপুঁটি ফাঁকা দিয়ে সরল মনে বেরিয়ে যায়। জেলেরা তাতে কিছু মনে করে না। এক হাজার পুঁটির বদলে যদি একটা রাঘববোয়াল ধরা যায়, তাহলে তা দিয়েই সব পুঁটি ছুটে যাওয়ার কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। ধরা পড়া রাঘববোয়াল কিনে খেতে না পারলেও তার ছবি দেখে, এমনকি গল্প শুনেও লোকে শান্তি পায়।

কিন্তু কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ কোন রাঘববোয়াল ধরার গল্প শোনালেন তা ঠিক বোঝা গেল না। তিনি পুকুরের চাষের বোয়ালকে রাঘববোয়াল বলে চালালেন কি না, তা ঠিক বুঝে আসছে না।

সম্প্রতি তিনি সাংবাদিকদের সামনে মহা বিক্রমে বলেছেন, ‘অর্থ পাচার হচ্ছে, এটা সত্যি। আমরা চেষ্টা করছি, কিন্তু অর্থ পাচারের ব্যাপারে আমাদের (দুদক) তফসিল থেকে সব নিয়ে গেছে আইন করে।... কিন্তু সব খবর আপনাদের কাছে যায় না, অথবা সব খবর আপনারা প্রচারও করেন না।

সব সময় অভিযোগ করেন, দুদক চুনোপুঁটি ধরে। কিন্তু কতগুলো রাঘববোয়াল ধরছে, তা আপনারা দেখছেন কখনো? এবং সেগুলো বিশ্ব রেকর্ড করার মতো।’

তবে প্রকাশিত খবরে যেসব তথ্য পাওয়া যায়, তাতে যে কারও মনে হতে পারে, দুদকের কাজ আসলে রাঘববোয়াল ধরা না; ছেড়ে দেওয়া। গত বছর আমরা তাদের এই রকম একটি বোয়াল ছেড়ে দিতে দেখেছি। বহুল আলোচিত প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদার সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন—এমন খবরে যখন সবাই ক্ষুব্ধ, সবাই যখন দ্রুত তাঁকে গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছিল, ঠিক তখন দুদকের ‘চিঠি-নাটক’ তাঁকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল।

পি কে হালদার যাতে দেশ ত্যাগ করতে না পারেন, সে জন্য সেগুনবাগিচার দুদক চিঠি পাঠিয়েছিল মালিবাগে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) কার্যালয়ে। এটুকু পথ পাড়ি দিতে চিঠিটির সময় লেগেছিল ১৩ ঘণ্টা। ততক্ষণে পি কে হালদার পগার পার। ওই ঘটনার পর আদালত দুদক আইনজীবীর উদ্দেশে বলেছেন, এখন এমন একটা সময়, যখন ই-মেইলের মাধ্যমে মুহূর্তেই একটি ডকুমেন্ট অন্যকে পাঠানো যায়। অথচ এ সময়ে সেগুনবাগিচা থেকে মালিবাগে চিঠি যেতে ১৩ ঘণ্টা লেগে গেল!

হলমার্ক গ্রুপের রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক থেকে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর দশক পার হলো, কিন্তু সেই কেলেঙ্কারি উন্মোচনে আজও দুদকের ভূমিকা রহস্যময় থেকে গেল।

বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি বলতেই যাঁর নাম প্রথম আসে, সেই আবদুল হাই বাচ্চু দুদকের চোখে রাঘববোয়াল নাকি চুনোপুঁটি, তা–ও আমরা বুঝলাম না। যেটা বুঝলাম, তা হলো রাঘববোয়াল ধরতে গিয়ে দুদকের ‘অতি উত্তম’ কর্মকর্তা শরীফ উদ্দিনকে চাকরি হারিয়ে মুদিদোকানের কর্মচারী হতে হয়েছে।

পি কে হালদারের মতো রাঘববোয়ালদের পালানোয় দুদক বাধা দেয় না কেন, এ প্রশ্নের জবাব দিতে বেশি মেধার প্রয়োজন হয় না। সহজেই বোঝা যায়, অনেক মহাশক্তিমানের আশীর্বাদের হাত তাঁদের মাথায় আছে। আমাদের রাঘববোয়ালতন্ত্র কোন কায়দায় চলে, তার উদাহরণ ভূরি ভূরি।

এরপরও দুদক যখন রাঘববোয়াল ধরার বিশ্ব রেকর্ড গড়ার গল্প শোনায়, তখন দুদকের ঝুলিকে ‘ঠাকুর মার ঝুলি’ বলে মনে হয়। যাদের সামনে এই গল্প বলা হচ্ছে, তারা জানে বাংলাদেশ নামক এই পুকুরে এখন রাঘববোয়ালসহ হাজারো রাক্ষুসে মাছ দাপাদাপি করছে এবং সব খেয়ে ফেলছে। সেই বোয়াল ধরার ছিপ দুদকের হাতে নেই।

  • সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক

[email protected]