কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এ বছরের শুরুতে বলেছিলেন, বিশ্ব এখন ‘একটি রূপান্তরের মধ্যে নয়, বরং একধরনের ভাঙনের মধ্যে রয়েছে।’ তাঁর এই মন্তব্য এমন এক বাস্তবতাকে তুলে ধরে, যা অধিকাংশ সরকার এখনো পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেনি। ১৯৪৪ সাল থেকে যে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিশ্বকে পরিচালিত করেছে, তা কার্যত শেষ হয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন একটাই—এরপর কী আসছে?
এর সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তবে নতুন যে বৈশ্বিক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে, তার কয়েকটি বৈশিষ্ট্য ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই বৈশিষ্ট্যগুলোই ইউরোপ এবং বিশ্বের মধ্যম শক্তিগুলোর সামনে পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করবে।
প্রথমত, ব্রেটন উডস ব্যবস্থা (১৯৪৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ব্রেটন উডসে ৪৪টি দেশের প্রতিনিধিরা এক সম্মেলনে মিলিত হয়ে একটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করেন, যার মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব অর্থনীতি স্থিতিশীল ও সংগঠিত করার চেষ্টা করা হয়) আর কার্যকর কোনো ভিত্তি হিসেবে টিকে নেই।
২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটেই এর ভঙ্গুরতা প্রকাশ পায়। কোভিড-১৯ মহামারির সময় এর অসম প্রভাব মোকাবিলায় ব্যর্থতা এ ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতাকে আরও দুর্বল করে দেয়। তবে সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে ভেতর থেকেই। যে যুক্তরাষ্ট্র এ ব্যবস্থার প্রধান স্থপতি ও কেন্দ্র ছিল, সে নিজেই এখন এটি থেকে সরে যাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক বাণিজ্য আর আগের মতো উন্মুক্ত অবস্থায় ফিরে যাবে না। এর পেছনে রয়েছে গভীর কাঠামোগত কারণ। ২০২৫ সালে চীনের বাণিজ্য–উদ্বৃত্ত এক ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যার প্রধান চালিকা শক্তি উৎপাদন খাত। বর্তমানে বিশ্ব উৎপাদনের প্রায় ৩৫ শতাংশই চীনের হাতে এবং প্রায় সব ধরনের শিল্পপণ্য সরবরাহ করার সক্ষমতা দেশটির রয়েছে।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কহার বাড়িয়ে ১৯৩০-এর দশকের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। আগামী দশকে এই শুল্ক থেকে দুই থেকে তিন ট্রিলিয়ন ডলার রাজস্ব আসার সম্ভাবনা ধরা হয়েছে। এই অর্থ গৃহস্থালি কর কমাতে ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতের কোনো প্রশাসনের জন্য এই শুল্কনীতি থেকে সরে আসা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
তৃতীয়ত, বৈশ্বিক ব্যবস্থার এই ভাঙন শুধু অর্থনৈতিক নয়, নীতিগত দিক থেকেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে সরিয়ে নিয়েছেন এবং ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সীমারেখা মুছে দিয়েছেন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি অসম্ভব হয়ে গেছে। বরং এটিকে নতুনভাবে, আরও বাস্তববাদীভাবে কল্পনা করতে হবে। একক কোনো মডেল, যেখানে উন্মুক্ত বাজার, আইনের শাসন, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাছাতা একসঙ্গে কাজ করবে—এমন কাঠামো আর বাস্তবসম্মত নয়। এর পরিবর্তে একধরনের ‘সমন্বিত ব্যবস্থার’ ধারণা সামনে আসছে, যেখানে বিভিন্ন দেশের নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দকে জায়গা দেওয়া হবে, তবে এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাবে না, যা অন্য দেশের ক্ষতি করে বা বৈশ্বিক সম্পদের ওপর আঘাত হানে।
এই নতুন কাঠামোর একটি কার্যকর সূচনা হতে পারে হার্ভার্ডের অর্থনীতিবিদ দানি রডরিকের প্রস্তাবিত কাঠামো থেকে। তাঁর ধারণা অনুযায়ী, এমন নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যা ‘নিজে বাঁচো, অন্যকে ঠকাও’ ধরনের। একই সঙ্গে বৈশ্বিক যৌথ সম্পদকে রক্ষা করতে হবে, তবে জাতীয় বৈচিত্র্যের জন্য জায়গা রাখতে হবে।
এ কাঠামো কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা গেলে ট্রাম্প প্রশাসনের অনেক নীতিই এর বাইরে পড়ে যাবে। এমন শুল্কনীতি টিকে যেতে পারে, যা মূলত নিজ দেশেরই ক্ষতি করে, কিন্তু বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে বা জলবায়ু সহযোগিতা দুর্বল করে—এমন নীতি গ্রহণযোগ্য হবে না।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই নিয়মগুলো কার্যকর করা। যখন যুক্তরাষ্ট্র হয় অনুপস্থিত, নয়তো সরাসরি বিরোধিতায় রয়েছে, তখন কে এই নিয়ম তৈরি করবে এবং তা বাস্তবায়ন করবে? এখানেই মধ্যম শক্তি ও ইউরোপের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রাব্যবস্থা এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ১৯৭১ সালে স্থির বিনিময় হারভিত্তিক ব্রেটন উডস ব্যবস্থার পতন, ইউরোর উত্থান এবং একাধিক সংকটের পরও ডলারের প্রাধান্য টিকে ছিল। কিন্তু এখন যখন চাপটি আসছে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর থেকেই, তখন ডলারের এই অবস্থান আর নিশ্চিত নয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি বহুমুখী মুদ্রাব্যবস্থার সম্ভাবনাই বেশি, যেখানে ডলারের জায়গা সরাসরি চীনা মুদ্রা রেনমিনবিতে চলে যাবে—এমনটা নয়। কারণ, চীনের মুদ্রা এখনো মূলধন নিয়ন্ত্রণ এবং বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রার দায়িত্ব নিতে অনীহার কারণে সীমাবদ্ধ। তবু উৎপাদন খাতে চীনের আধিপত্য রেনমিনবির আঞ্চলিক গুরুত্ব বাড়াবে—এটি প্রায় নিশ্চিত।
যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প মানেই বিশৃঙ্খলা নয়। মার্ক কার্নি আসলে যা বলছিলেন, সেটিই এখন প্রয়োজন—এমন একটি জোট, যারা নতুন বিশ্বে এজেন্ডা নির্ধারণ করবে এবং নিয়ম রক্ষার দায়িত্ব নেবে।
● জর্জ পাপাকনস্টান্টিনু গ্রিসের সাবেক অর্থমন্ত্রী ও
● জঁ পিসানি-ফেরি ব্রাসেলসভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক ব্রুগেলের সিনিয়র ফেলো
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনূদিত