বিশ্লেষণ
সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কেন চুড়ান্ত সতর্কতা–ঘণ্টা
অবহেলা-ঔদাসীন্যে প্রবাস-শ্রমজীবীদের আর একটি প্রাণও যেন ক্ষয় না হয়, সেই দায় ও দায়িত্ব নেওয়ার এখনই সময় রাষ্ট্রের। এই দুটি মৃত্যুদণ্ডকে গণ্য করতে হবে রাষ্ট্রের জন্য চূড়ান্ত সতর্কতা-ঘণ্টা হিসেবে। লিখেছেন হেলাল মহিউদ্দীন
দেশজুড়ে মক্কার দুই মৃত্যুদণ্ড এবার যতটা আলোড়ন তুলেছে, আগে কখনোই তেমনটি দেখা যায়নি। পেছনে যৌক্তিক কারণ অসংখ্য। রাষ্ট্র আদৌ ঠিকঠাক চলছে কি না, প্রশ্নটি উঠেছে সবচেয়ে বেশি। কারণ, ১৬ অক্টোবর ২০২৬-এর পত্রিকাগুলো জানায় নজরুল ইসলাম বাসির ও সুইটি (সিতি) আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা ঢাকা জানতই না। সব পত্রিকার একই ভাষ্য, সৌদি প্রেস এজেন্সি খবর দেওয়ার পর ১৫ অক্টোবর জেদ্দা কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র দপ্তরকে চিঠি পাঠায়। জেদ্দা কনস্যুলেটের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিচার চলা বা দণ্ড কার্যকর নিয়ে কোনো নোটিফিকেশন বা কূটনৈতিক পত্র তাঁরা পাননি। সৌদি বিবৃতিতে শুধু দুটি নাম ছাড়া আকামা বা পাসপোর্টের তথ্যটুকুও ছিল না।
কিন্তু ১৯ অক্টোবরের ডেইলি স্টার জানাচ্ছে, সৌদি কর্তৃপক্ষ সেপ্টেম্বরেই প্রায় ২ হাজার ৫০০ বন্দীর একটি তালিকা দিয়েছিল, যাতে নজরুল ও সুইটির নামও ছিল। কিন্তু তালিকায় মৃত্যুদণ্ডের কথা লেখা ছিল না। একজনের অপরাধ লেখা ছিল ‘অ্যাডাল্টারি’ বা বিবাহ-বহির্ভূত যৌনক্রিয়া। তাহলে কনস্যুলেট কি অসত্য অজুহাত খাঁড়া করেছে? সৌদি আরব যেহেতু সেপ্টেম্বরেই বন্দীদের বিষয়ে তথ্য চেয়েছিল, কনস্যুলেট কেন সময়ের গুরুত্ব বুঝল না, তথ্যগুলো যথাসময়ে দিল না বা মামলা অনুসরণের উদ্যোগ নিল না? আশঙ্কা বেড়েছে দু-একটি পত্রিকা যখন জানিয়েছে জেদ্দার আদালতে মামলাটি কয়েক মাস ধরে চলেছিল। দুজন বাংলাদেশি নাকি দোভাষীর কাজও করেছেন। বিচার চলল মাসের পর মাস। বাংলাদেশিরাই দোভাষী। অথচ মিশন টের পেল না কিছুই। বিষয়টি অবশ্যই অস্বাভাবিক।
বাংলাদেশ ও সৌদি আরব উভয় দেশই ১৯৬৩ সালের ভিয়েনা কনস্যুলার সনদে স্বাক্ষরকারী পক্ষ। সনদের ৩৬ অনুচ্ছেদে কনস্যুলেটকে দ্রুত জানানোর বাধ্যবাধকতা আছে। তবে ক্ষেত্রবিশেষে বন্দীকে অনুরোধ করতে হয়। সাধারণ জ্ঞানেই বোঝা সম্ভব বাসির এবং সিতির জেনেভা কনভেনশন বোঝার কথা নয়। মহা শিক্ষিতদের কজনই বা জানি ৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদের কথা। সৌদি পক্ষ জানায়নি বটে, সেপ্টেম্বরে ২ হাজার ৫০০ জনের তালিকায় ‘অ্যাডাল্টারি’ শব্দ দেখেই তো দূতাবাসের দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দেওয়ার কথা। ভয়াবহ বিপদ আসন্ন, এটা বুঝতে পারার ব্যর্থতা কোনোভাবেই কি ক্ষমার যোগ্য?
২.
বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও বিদেশের দূতাবাসগুলোর কোনো সাফল্য নেই, এমন ঢালাও অভিযোগও অনুচিত। দূতাবাসগুলোর চেষ্টায় ২০১২ থেকে ২০১৬ সালে ২০টি দেশ থেকে ৪৯ হাজার ৫০৩ জন মুক্তি পান। এর মধ্যে সৌদি আরব থেকে ১৭ হাজার ৩৩৫ জন আর আমিরাত থেকে প্রায় ৫ হাজার। সৌদি আরবে বাংলাদেশ কনস্যুলেট বিভিন্ন সময় গুরুতর অপরাধে বন্দী নন এমন প্রবাসীদের জন্য রাজকীয় ক্ষমার আবেদন নিয়মিতই করেছেন এবং করে চলেছেন, সন্দেহ নেই।
কিন্তু বিশাল সংখ্যাটি দেখে অতি-উল্লসিত হওয়ারও কিছু নেই। সৌদিফেরত ১৭ হাজারের বড় অংশ আকামা বা ভিসার মেয়াদ পেরোনো শ্রমিক। অন্য দেশের অন্যান্য ফেরত আসা ব্যক্তিরাও মূলত অবৈধ অভিবাসী। তাঁদের ‘মুক্তি’ আসলে বিমানের টিকিট আর আউট-পাস জোগাড় করে দেওয়ার বেশি কিছু নয়। সন্দেহ নেই কাজটা জরুরি এবং মানবিক। একেবারে ছোট দায়িত্বও বলছি না। তবে এটি রুটিন প্রশাসনিক কাজের অংশ। পৃথিবীর ছোট-বড় সব দেশের সব দূতাবাস কাজটি সার্থকভাবেই করে।
প্রতিবছর রমজানে, দুই ঈদে, মহানবী (সা.)–এর ওফাত দিবসে সাধারণ ক্ষমায় মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশ থেকেই বন্দী ও লঘু অপরাধীদের স্বদেশে ফেরত যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। ২০১২ সালে বাদশাহ আবদুল্লাহ সাধারণ ক্ষমা এবং ক্ষতিপূরণ প্রদান ও রক্তপণের দায়ে বিপুলসংখ্যক বন্দীদের মুক্ত করেছিলেন। ২০১২ সালে বড় সংখ্যায় দণ্ডপ্রাপ্ত বাংলাদেশিদের ফেরত পাওয়ার পেছনে সেই সাধারণ ক্ষমাও একটি বড় কারণ। বাদশাহর ক্ষমার সুবিধাটি সব দেশের লঘু অপরাধীরাই পেয়েছেন। তবে ২০২১ সালে সৌদি পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের গভর্নর একজন বাংলাদেশিকে মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই দেন এবং দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের তৎকালীন সৌদি দূতাবাস বিষয়টিতে সক্রিয় ছিল অনুমান করা যায় এবং সাধুবাদও পেতে পারেন সে কারণে।
৭ অক্টোবর ২০১১ ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি কালো দিন। এক মিসরীয় প্রহরীকে হত্যার দায়ে আট বাংলাদেশি শ্রমিকের শিরশ্ছেদ হয় সেদিন। বাংলাদেশ বারবার ক্ষমা-আবেদনের কমতি রাখেনি। ক্ষতিগ্রস্তর পরিবারকে রক্তপণ দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছিল বাংলাদেশ। উল্লেখ্য, রক্তপণ শেষ উপায়। যদি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ক্ষতিপূরণের জন্য অর্থ দাবি করে এবং অর্থ পরিশোধ করা হয় এবং ক্ষতিগ্রস্তর পরিবার অপরাধীদের ক্ষমা করে দিতে রাজি হয়, তাহলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীকেও মুক্ত করে দেওয়া হয়। দুর্ভাগ্যবশত, বাংলাদেশ সরকারের সর্বাত্মক চেষ্টার পরও মিসরীয় প্রহরীটির পরিবার রক্তপণ গ্রহণে রাজি হয়নি। ফলে আটজনের শিরশ্ছেদ ঠেকানো যায়নি।
এগুলো ‘কিসাস’ মামলা। এ ধরনের মামলায় ক্ষমার চাবিটি থাকে শুধুই নিহত ব্যক্তির পরিবারের হাতে। শরিয়া কোর্ট এই বিষয়ে ক্ষমতাহীন। আটজনের মৃত্যুদণ্ড ঠেকাতে রাষ্ট্রপক্ষের আন্তরিক চেষ্টা আশাবাদী করলেও আরেকটি বিষয়ে দারুণ হতাশও করেছে সেই একই বছরেই। ২০১১ সালের অক্টোবরে অর্থাৎ একই মাসে, দাম্মাম কারাগারে আটক প্রায় ৫০০ বাংলাদেশিকে ফেরাতে সরকারের পদক্ষেপ জানতে চান দাম্মামের হাইকোর্ট। অর্থাৎ সৌদি সরকার সাধারণ ক্ষমায় লঘু অপরাধীদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে রাজি ছিল। কিন্তু দূতাবাসের ঔদাসীন্যে টিকিট আর আউট-পাস হয়নি। ঔদাসীন্য স্পষ্ট ছিল প্রশাসনিক দলিল প্রস্তুতিতে। সেগুলোতে প্রচুর ভুলভ্রান্তি ও তথ্য উপস্থাপনার অসংগতি ছিল।
চেষ্টা করলে সাফল্য কি আসলেই অধরা থাকে? উত্তর না। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আমিরাতে হাসিনাবিরোধী বিক্ষোভের দায়ে দ্রুত বিচারে ৫৭ জন দণ্ড পান। ৩ জন যাবজ্জীবন আর ৫৩ জন ১০ বছর কারাবাসের দণ্ড পান। হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়া ড. ইউনূসের সঙ্গে ফোনালাপের এক সপ্তাহের মধ্যেই আমিরাতের প্রেসিডেন্ট তাঁদের ক্ষমা করেন।
৩.
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও বাংলাদেশ দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দী হস্তান্তর চুক্তি করেছে শুধু ভারত আর আমিরাতের সঙ্গে, যথাক্রমে ২০১০ এবং ২০১৪ তে। ২০২৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারির বিডি প্রতিদিন পত্রিকার ইংরেজি সংখ্যায় লুৎফুল হক একটি প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, সৌদি রাষ্ট্রদূত ঈসা বিন ইউসুফ আল-দুহাইলান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানান, সৌদি সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে বন্দী প্রত্যাবাসন চুক্তিতে আগ্রহী। বাংলাদেশের এতে আপত্তি নেই, প্রস্তাব পেলে সরকার বিবেচনা করবে।
অর্থাৎ সৌদি আরবই আগ বাড়িয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি চুক্তির আগ্রহ দেখিয়েছিল। উদ্যোগটা এসেছে রিয়াদ থেকে, ঢাকা থেকে নয়। কিন্তু বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভাবসাব দেখালেন আমেরিকার সেক্রেটারি অব স্টেটের মতো। কোথায় প্রস্তাব লুফে নেবেন, উঠেপড়ে লাগবেন-জানালেন প্রস্তাব পেলে বিবেচনা। যেন সৌদি আরবই ঠেকায় পড়েছে। বাংলাদেশের অত দায়-দরকার নেই! অথচ সৌদি আরবের সঙ্গে ভারত ২০১০ সালেই এ চুক্তি করেছে।
৪.
অবৈধ অভিবাসীদের জেল থেকে ছাড়িয়ে আনা আর মৃত্যুদণ্ডের আসামির মামলার পেছনে প্রাণান্ত লেগে থাকার পার্থক্য আকাশ-পাতাল। প্রথমটি হিসাবের খাতার কাজ, দ্বিতীয়টি প্রাণ বাঁচানোর। এবারের দুজনের মৃত্যুদণ্ডের জনরোষ তাই অনেকাংশেই যৌক্তিক। মৃত্যুদণ্ডযোগ্য মামলায় দূতাবাসের অনিবার্য দায় গ্রেপ্তারের দিন থেকে প্রতিটি মুহূর্ত জানা: অভিযোগপত্র কেমন, আইনজীবী আছে কি না, দোভাষী নিরপেক্ষ কি না, আপিল কবে, রায় কী, পরিবার জানে কি না।
ইন্দোনেশিয়া একজন নাগরিকের প্রাণ বাঁচাতে রক্তপণের টাকা তুলে, আইনজীবী নিয়োগ করে, বছরের পর বছর পরিবারের সঙ্গে দর-কষাকষি চালিয়ে গিয়েছিল। মৃত্যুদণ্ডের প্রশ্নে দেশটির অবস্থান গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠার মতো। ২০১১ সালে না জানিয়ে রুয়াতি নামের গৃহকর্মীর শিরশ্ছেদের পর জাকার্তা সৌদিতে গৃহকর্মী পাঠানো স্থগিত করে। আবার ২০১৪ সালে সাতিনাহ নামে আরেকজনকে বাঁচাতে সরকার নিজে প্রায় ১৮-১৯ লাখ ডলার রক্তপণ দেয়। জাকার্তার চেষ্টায় সাতিনাহর ফাঁসি পাঁচবার পিছিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ইয়োধোয়োনো নিজে সৌদি কর্তৃপক্ষকে তিনটি চিঠি দিয়েছিলেন এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আরও চারজনের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন।
ফিলিপাইন ২০১১ সালে গৃহকর্মীদের ন্যূনতম মজুরি দাবি করলে সৌদি আরব নিয়োগ বন্ধ করে দেয়। ম্যানিলা কিন্তু মোটেই পিছু হটেনি। শেষে রিয়াদ মাসে ৪০০ ডলার মজুরিতে রাজি হয়। ২০১৩ সালের মে মাসে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিমতে, ১ হাজার ৫০০ রিয়াল ন্যূনতম বেতন, সাপ্তাহিক ছুটি, বেতনসহ ছুটি, পাসপোর্ট আটকে না রাখা, মুক্ত যোগাযোগ আর ২৪ ঘণ্টার সহায়তা ব্যবস্থা অত্যাবশ্যক, ঐচ্ছিক নয়।
ফিলিপাইন আবার ২০১৮ সালে কুয়েতে গৃহকর্মী জোয়ানা ডেমাফেলিসের লাশ ফ্রিজারে পাওয়ার পর শ্রমশক্তি কুয়েতে পাঠানো পুরোপুরিই বন্ধ করে দেয়। ১১ মে ২০১৮ তে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে আদায় করে নেয় শ্রমিকের নিজের ফোন রাখা, ২৪ ঘণ্টার হটলাইন আর উদ্ধারকাজে দূতাবাসকে সাহায্যের জন্য বিশেষ পুলিশ ইউনিটের সহায়তা পাওয়ার অধিকার।
রবিন রদ্রিগেজের বই মাইগ্র্যান্টস ফর এক্সপোর্ট ফিলিপাইনকে ‘শ্রম দালাল রাষ্ট্র’ উপাধি দিয়ে সমালোচনা করলেও অকপটে স্বীকার করেছে-ফিলিপাইন অবশ্য প্রমাণ করে দিয়েছে রাষ্ট্র চাইলে শ্রমিক রপ্তানিকে তার কল্যাণ দপ্তর, শ্রম অ্যাটাশে আর আইনি সহায়তা কাঠামোর মাধ্যমে বেশ কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলে বাঁধতে পারে।
শ্রম রপ্তানির আগে শ্রম কল্যাণে ভারতও পিছিয়ে থাকেনি। ২ জানুয়ারি ২০১৪ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে গৃহকর্মী নিয়োগ চুক্তিতে নিয়োগ খরচ বেতন থেকে কাটা নিষিদ্ধ হয়। শ্রমিকের নামে ব্যাংক হিসাব, ২৪ ঘণ্টার সহায়তা আর জরুরি অবস্থায় এক্সিট ভিসার ব্যবস্থা রাখা হয়। একই মাসে শ্রীলঙ্কাও প্রায় একই রকম চুক্তি করে।
অথচ ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ বাংলাদেশ যে গৃহকর্মী চুক্তি করে, তাতে মজুরি ধরা হয় মাত্র ৮০০ রিয়াল। ফিলিপাইনের প্রায় অর্ধেক। আরএমএমআরইউর (রামরু) তাসনিম সিদ্দিকী তখনই বলেছিলেন, ভারত, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া কর্মী পাঠানো বন্ধ রাখায় বাংলাদেশের দর কষার সুযোগ ছিল, আর দূতাবাস থেকে নারী কর্মীদের মাসে অন্তত একটি ফোন করার দাবিও তুলেছিলেন। বায়রা সভাপতি স্বীকার করলেন, তাঁরা বাজার খোলাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। যে মুহূর্তে আমাদের হাতে ছিল তুরুপের তাস-আমরা সুরক্ষা, সম্মান, মর্যাদা না চেয়ে বাজার বাজার করে চেঁচিয়েছি।
৫.
বাসির-সিতির মৃত্যুদণ্ডের রায়টি একেবারেই অস্বাভাবিক ও খটকা জাগানোর মতো। যুক্তিবুদ্ধিতে কুলানোর ধারেকাছেও নয়। আদালত দণ্ড দিয়েছেন শরিয়াহর ‘তাআজির’ বা বিচারকের স্বেচ্ছাধীন শাস্তির বিধানে। ইসলামি ফৌজদারি আইনে অপরাধের বিচারের ধারা তিনটি; হদ, কিসাস আর তাজির। জেনা বা ব্যভিচারের শাস্তি হদ-এর আওতাধীন। অর্থাৎ কোরআন-সুন্নাহ নির্ধারিত শাস্তি। হদ প্রমাণের শর্তও দারুণ সুকঠিন। চারজন প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষী হওয়াই যথেষ্ট নয়, তাঁদের নির্ভরযোগ্য হতে হবে, অর্থাৎ আমলনামায় কোনো কালি থাকতে পারবে না। আগে মিথ্যা বলার অপরাধে বা অন্য যেকোনো অপরাধে সাজা খেটে থাকলে বা কোনো অপরাধ বা গুরুতর অভিযোগ নথিভুক্ত থাকলে তারা সাক্ষী হওয়ার অযোগ্য।
প্রমাণে সামান্য সন্দেহ থাকলেও হদ মওকুফ হয়ে যাবে। ফিকাহ শাস্ত্রবিশারদ বা ফকিহ, যাঁরা ফতোয়া দেওয়ার পর্যায়ের জ্ঞানবান, তাঁদের দেওয়া সবচেয়ে প্রচলিত ও সর্বমহলে গৃহীত ফতোয়াটি হচ্ছে, ‘সন্দেহ থাকলেই হদ বাতিল’। হদ-এ অভিযুক্তদের অধিকারও স্বীকৃত। তাঁরা স্বেচ্ছায় বারবার ভিন্ন ভিন্ন স্বীকারোক্তি যেমন দিতে পারেন, আগের বক্তব্য প্রত্যাহারও করতে পারেন। এ রকম পদ্ধতির অন্তর্নিহিত দর্শন সম্ভবত আধুনিক বিচারব্যবস্থার মতোই, বিচারাধীন অভিযুক্তদের ভয়ভীতিসহ নানা কারণেই মানসিক সুস্থিতি সব সময় নির্ভরযোগ্য স্বীকারোক্তি দেওয়ার মতো থাকে না।
তাজির কিন্তু উল্টো। সাধারণত ছোট অপরাধের বিচার। ছিঁচকে অপরাধ, প্রতারণা, অশ্লীল গালাগালি, মারামারি-হাতাহাতি ইত্যাদির বিচার। প্রায় সব মাজহাবের ধর্মবেত্তাদের মত একই—তাজির কখনোই এ রকম মাত্রাছাড়া হতে পারবে না, যা হদ-এর কাছাকাছি শাস্তি মনে হতে পারে। সাধারণত তাজির-এ দশ বেত্রাঘাতের বেশি শাস্তিতে না যাওয়ার বিধান দিয়েছেন বহু আলেম। নিরুৎসাহিত করেছেন কঠিন শাস্তি। তবে এটা সত্যি সৌদি আরব মাদক মামলাতেও আগে দু–একজনকে তাজিরে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। সেগুলোর বিষয়ে যথেষ্ট আন্তর্জাতিক সমালোচনা রয়েছে।
বাসির-সিতির অপরাধটি ‘অনৈতিক সম্পর্ক’, এটি হতে পারে ‘জেনা’ পর্যন্ত। তাহলে হদ না হয়ে তাজির কেন? চার সাক্ষী কোথায়? অকাট্য প্রমাণ কোথায়? দুজন বাংলাদেশি দোভাষী নাকি ছিল। তারা কারা, কী পরিচয়? এটি আসলে বিচারিক হত্যাকাণ্ড নয় তো?
রুডলফ পিটার্সে তাঁর ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট ইন ইসলামিক ল বইতে হদ, কিসাস আর তাজিরের পার্থক্য ও প্রয়োগবিধি শাস্ত্রীয় বিধিবিধানের আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন এবং দেখিয়েছেন তাজিরের অধীনে কঠোর শাস্তির পেছনে মূল অপরাধের আইনানুগ বিবেচনার বাইরে অন্য কোনো গূঢ় কারণ থাকে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দপ্তর কি কারণটি অনুসন্ধানের চেষ্টা করবে। অত্যন্ত সংবেদনশীল মনে হলে জনসমক্ষে প্রচার না করে; ক্লাসিফায়েড’ রেখে নিজেদের ভবিতব্য নির্ধারণের একটি পাঠ হিসেবে হলেও তাঁদের কারণ অনুসন্ধানে নামা দরকার।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অন্তত চারটি বিষয়ে সবিশেষ মনোযোগ দিতে পারে। এক. প্রতিটি মিশনে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য মামলার একটি তালিকা ও নজরদারি সেল তৈরি করা, যেখানে প্রতি মাসে কারাগার ও আদালতের হালনাগাদ তথ্য থাকবে। দুই. ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ তহবিল থেকে আইনজীবী, স্বাধীন দোভাষী আর প্রয়োজনে রক্তপণের জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখবে, যেমনটা ইন্দোনেশিয়া করেছে। তিন. সৌদি আরব নিজেই যে বন্দী হস্তান্তর চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছিল, সেটিকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং দ্রুত চুক্তিতে পরিণত করা। চার. পরের প্রতিটি শ্রম চুক্তিতে কনস্যুলার নোটিফিকেশন ও আইনি সহায়তার ধারা আলাদা করে লেখা।
বাসির-সিতিকে আর ফেরানো যাবে না। কিন্তু অবহেলা-ঔদাসীন্যে প্রবাস শ্রমজীবীদের আর একটি প্রাণও যেন ক্ষয় না হয়, সেই দায় ও দায়িত্ব নেওয়ার এখনই সময় রাষ্ট্রের। এই দুটি মৃত্যুদণ্ডকে গণ্য করতে হবে রাষ্ট্রপক্ষের জন্য চূড়ান্ত সতর্কতা-ঘণ্টা হিসেবে।
ড. হেলাল মহিউদ্দীন শিক্ষক, লিবারেল আর্টস, ম্যেভিল স্টেট ইউনিভার্সিটি, নর্থ ডেকোটা, যুক্তরাষ্ট্র
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
