ইসরায়েলি সমাজের ভেতরে বিপজ্জনক কিছু ঘটছে, যার পরিণতি পুরো অঞ্চলের জন্যই গুরুতর হতে পারে। গাজায় গণহত্যামূলক যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েলি সমাজ সচেতনভাবেই প্রতিশোধকেন্দ্রিক এক সহিংস বয়ানের ব্যাপক ঐকমত্য গড়ে তুলেছে—যে ভাষ্য শুধু ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে নয়, বরং এ অঞ্চলজুড়ে যুদ্ধকে উৎসাহিত করে।
প্রায় প্রতিটি জনমত জরিপেই যুদ্ধের প্রতি বিপুল সমর্থন দেখা যায়, আর গত আড়াই বছরে সংঘটিত ধারাবাহিক অপরাধগুলোর বিরুদ্ধে খুব সামান্যই সমালোচনা রয়েছে। কিন্তু প্রতিশোধ ও সহিংসতার এই সংস্কৃতি এখন ভেতরের দিকেও ফিরে এসেছে, যা ইসরায়েলি সমাজকেই প্রভাবিত করছে।
একের পর এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধের মানসিক ও সামাজিক মূল্য কতটা ভয়াবহ এবং কীভাবে সহিংসতা ইসরায়েলি সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। ১৯৬৮ সালেই, অর্থাৎ পশ্চিম তীর ও গাজা দখলের এক বছর পর ইহুদি দার্শনিক ইয়েশায়াহু লাইবোভিৎজ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি ‘দখলদারত্ব মানুষকে কলুষিত করে’—এই ধারণা তুলে ধরেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, পশ্চিম তীর ও গাজায় ইসরায়েলি রাষ্ট্র যে দখলদারত্বের চর্চা চালাচ্ছে, তা অবশ্যম্ভাবীভাবে মানুষের আত্মাকে কলুষিত করবে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ‘গ্রিন লাইনে’র ভেতরের ইসরায়েলি সমাজকেও দূষিত করবে।
অবশ্য লাইবোভিৎজ ১৯৪৮ সালের দখল ও উচ্ছেদ এবং অন্য একটি জনগোষ্ঠীকে উৎখাত করে ‘জাতীয় আবাসভূমি’ গড়ার যুক্তিকে উপেক্ষা করেছিলেন। তবু তাঁর মূল বক্তব্যটি সঠিক ছিল: অন্য একটি জাতিকে শাসন ও দখল করে রাখা শেষ পর্যন্ত দখলদার সমাজকেই নৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সামরিকায়ণের সংস্কৃতি
গাজায় গণহত্যার প্রতি ইসরায়েলি সমাজের সমর্থন তাই পশ্চিম তীরে ধীরে ধীরে সংযুক্তীকরণ, ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ, লেবানন ও সিরিয়ার কিছু অংশ দখল এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ—এসবকে সত্যিকার অর্থে বোঝা সম্ভব নয়, যদি না বোঝা যায় কীভাবে দীর্ঘদিনের দখলদারত্বের চর্চা ইসরায়েলি সমাজকে সামরিকীকৃত ও গভীরভাবে সহিংস এক সমাজে পরিণত করেছে।
লেখক এমে সেজেয়ার যথার্থভাবেই বলেছিলেন, ‘কেউ নিষ্পাপভাবে উপনিবেশ গড়ে তোলে না; আর কেউ শাস্তিহীনভাবেও উপনিবেশ স্থাপন করতে পারে না। যে জাতি উপনিবেশ স্থাপন করে, যে সভ্যতা উপনিবেশবাদকে, অর্থাৎ বলপ্রয়োগকে ন্যায্যতা দেয়, তা ইতিমধ্যেই অসুস্থ এক সভ্যতা; নৈতিকভাবে রোগাক্রান্ত এক সভ্যতা।’
গত বছর ইসরায়েলের বিচার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ৪৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রতি ৯ দিনে একজন নারী খুন হয়েছেন। একই সময়ে ইসরায়েলের এক-তৃতীয়াংশ নারী জানিয়েছেন যে তাঁরা সন্তান জন্মের পরবর্তী বিষণ্নতায় ভুগছেন, যা যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি।
আজকের ইসরায়েল এমন একটি সমাজে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রায় প্রতিটি সমস্যার সমাধান সামরিক শক্তির মাধ্যমে সম্ভব বলে বিশ্বাস করা হয়। এমনকি যাঁরা আপস বা কূটনীতির পক্ষে কথা বলেন, তাঁদের প্রায়ই বাস্তবতাবিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, এই একই সংস্কৃতি—যাকে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও অন্যরা গর্বের সঙ্গে ‘সুপার-স্পার্টান’ সহনশীলতা হিসেবে তুলে ধরেন—ধীরে ধীরে ইসরায়েলি সমাজকেই ভেতর থেকে গ্রাস করতে শুরু করেছে।
ইসরায়েল যখন নিজেদের সামাজিক মডেলকে বিশ্বের সামনে প্রশংসনীয়, এমনকি প্রয়োজনীয় কিছু হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে, যাতে তাদের ধ্বংসযজ্ঞকে ন্যায্যতা দেওয়া যায়, তখন পৃষ্ঠের নিচের বাস্তবতা অনেক বেশি উদ্বেগজনক। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইসরায়েলি সমাজের মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক কল্যাণের ওপর, বিশেষ করে পারিবারিক জীবনে এর ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে।
দীর্ঘস্থায়ী সামরিকীকরণ ও যুদ্ধের সামাজিক পরিণতির মধ্যে রয়েছে বিষণ্নতা ও আসক্তির তীব্র বৃদ্ধি। ২০২৫ সালে মানসিক সহায়তার প্রয়োজন অনুভব করছেন—এমন ইসরায়েলিদের হার প্রায় ৩২ শতাংশে পৌঁছায়, আর ২০২২ সালের তুলনায় পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (পিটিএসডি) আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যায় ৪০ শতাংশ।
গার্হস্থ্য–সহিংসতাও বেড়েছে। গত বছর ইসরায়েলের বিচার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ৪৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রতি ৯ দিনে একজন নারী খুন হয়েছেন। একই সময়ে ইসরায়েলের এক-তৃতীয়াংশ নারী জানিয়েছেন যে তাঁরা সন্তান জন্মের পরবর্তী বিষণ্নতায় ভুগছেন, যা যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। সাম্প্রতিক তথ্য আরও দেখায়, অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ফৌজদারি মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে শত শত সেনাসদস্য আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন।
এই প্রবণতাগুলো সম্মিলিতভাবে ইসরায়েলি সমাজের গভীর সামাজিক ও মানসিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়, যা বোঝায় যে যুদ্ধের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। সহিংসতা ও মানসিক ট্রমা দেশটির দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে।
স্পষ্ট রূপান্তর
ইসরায়েল যদিও জাতীয় সহনশীলতার একটি চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করছে, বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। ইসরায়েলি সমাজে যে রূপান্তর ঘটছে, তা বসতি-ঔপনিবেশিক সমাজগুলোর ঐতিহাসিক পরিণতিকেই প্রতিফলিত করে, যেখানে যুদ্ধ ও দখলদারত্বের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
চলতি বছরের শেষ দিকে ইসরায়েলে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সাধারণ বিবেচনায় মনে হতে পারে, মূল রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্র হওয়া উচিত গাজা, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে। কিন্তু বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বীরাও মূলত একই সামরিকতাবাদী কাঠামো গ্রহণ করেছেন।
মাত্র দুই সপ্তাহ আগে নিজেদের নতুন রাজনৈতিক জোট ঘোষণা করতে গিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদ ও নাফতালি বেনেট একই ধরনের কড়া অবস্থান তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, কোনো ভূখণ্ডই ছেড়ে দেওয়া হবে না—যদিও তারা স্পষ্ট করেননি, দখলকৃত কোন ভূখণ্ডের কথা তাঁরা বলছেন।
একই সঙ্গে তাঁরা ইসরায়েলের গভীর সামাজিক সংকটের জন্য শুধু নেতানিয়াহুকেই দায়ী করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাস্তবে নেতানিয়াহু কেবল আরও গভীর সমস্যার একটি উপসর্গমাত্র। প্রকৃতপক্ষে দেশটির নৈতিক অবক্ষয় ও সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণের শিকড় নিহিত রয়েছে দখলদারত্বের মধ্যেই।
ইসরায়েলের স্থায়ী যুদ্ধনীতির ফলে দেশটির সমাজে কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, তা নিয়ে এখনো প্রায় কোনো গুরুতর রাজনৈতিক আলোচনা নেই। বরং সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায় ইসরায়েলি রাজনীতিকদের প্রস্তাবিত সমাধানগুলো ক্রমেই অগণতান্ত্রিক পন্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে, যেমন বিক্ষোভ দমনে আরও কঠোর ব্যবস্থা।
বর্তমান পরিস্থিতি শুধু ৭ অক্টোবরের ঘটনার ফল নয়। এটি আরও গভীর কিছু প্রক্রিয়ার প্রতিফলন, যা কয়েক দশক আগেই শুরু হয়েছিল। সেই প্রক্রিয়াই শুধু ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ভিত্তি তৈরি করেনি, বরং ইসরায়েলি সমাজ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমবর্ধমান সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভাঙনের বীজও বপন করেছে।
আবেদ আবু শাহাদেহ রাজনৈতিক কর্মী। তিনি ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তেল আবিবের জাফায় ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের পক্ষে সিটি কাউন্সিলের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ